writwick das
ঋত্বিক দাস

ইংরেজ সরকারের হাতে ভারত তখন বন্দি৷ শুধু শাসন করাই নয়, এই দেশের সম্পত্তি বিদেশে রফতানি করে কী ভাবে ফুলেফেঁপে উঠতে হয় তা ব্রিটিশকর্তারা তখন ভালোই জেনে গিয়েছেন৷ ব্রিটিশ সরকার খোঁজ পেল ছোটোনাগপুর অঞ্চলের খনিজ সম্পদ আর দামোদরের উপত্যকায় ছড়িয়ে থাকা কয়লা-সহ বিভিন্ন খনিজ দ্রব্যের ভাণ্ডার৷ সেই সম্পদ বিদেশের মাটিতে পৌঁছে দিতে পারলেই পকেট আরও ফুলেফেঁপে উঠবে৷

কিন্তু বাধ সাধল ছোটোনাগপুরের গভীর জঙ্গল৷ এত সম্পদ এই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পরিবহণ করে কলকাতা বন্দরে আনা কী ভাবে সম্ভব? পরিকল্পনা হল, জঙ্গল কেটে রেলপথ তৈরি করার৷ কলকাতা-দিল্লি রেলপথের গোমো স্টেশন৷ সেখান থেকে ডালটনগঞ্জ দিয়ে লাইন নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু হল৷ রেললাইনের স্লিপার করতে বহু গাছ কাটা পড়ল৷ স্লিপার তৈরির বরাত দেওয়া হল কলকাতার কিছু ঠিকাদারকে৷

evening coming in maccluskieganj
শেষ বিকেলে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ।

এক বার এমনই রেলের কাজের দায়িত্ব নিয়ে এলেন আর্নেস্ট টিমোথি ম্যাকলুস্কি নামে এক কলকাতাবাসী এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী৷ ম্যাকলুস্কি সাহেবের জায়গাটা বেশ ভালো লেগে গেল৷ তখন ওই অঞ্চলে লাপড়া, কঙ্কা ও হেসাল, এই তিনটি জঙ্গলময় বসতি ছিল৷ পরিবেশটা পুরো বিলেতের মতো৷ সারা বছরই ঠান্ডা আবহাওয়া৷ পাহাড়ে ঘেরা, অরণ্যে মোড়া এক মনোরম জায়গা, গোটা পরিবেশটাই যেন বিলেতের একটা ছোটো সংস্করণ৷

ম্যাকলুস্কি সাহেব জায়গাটির প্রেমে পড়ে গেলেন এবং এখানেই স্থায়ী ভাবে বসতি গড়লেন৷ পাশাপাশি বন্ধু আত্মীয়পরিজনকে এখানে এসে থাকার আহ্বান জানালেন৷ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বেশ কিছু পরিবার এখানে এসে বসতি স্থাপন করলেন৷

আরও পড়ুন ‘লাল কাঁকড়ার দেশ’- তাজপুর

ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইংল্যান্ডকে কোণঠাসা করে ফেলল। ইংল্যান্ডের অর্থনীতি ক্রমশ ভেঙে পড়তে লাগল। তার প্রভাব এসে পড়ল এ দেশে অ্যাংলো সাহেবদের ওপর৷ ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো এ দেশে একের পর এক অ্যাংলো সাহেবকে কর্মচ্যুত করতে লাগল তুচ্ছ অজুহাতে৷ এই সময় বহু অ্যাংলো কাজ হারালেন৷ তাঁরা ঠিক করলেন এই ঘটনা তাঁরা ব্রিটেনে গিয়ে মহারানিকে সরাসরি জানাবেন৷ এতে ঘোরতর বিপদ বুঝে ব্রিটিশ সরকার অ্যাংলোদের ব্রিটেনে যাওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করল৷

another view from watchtower
ওয়াচটাওয়ার থেকে আরও দৃশ্য।

এমনিতেই অ্যাংলোদের কোনো স্থায়ী জায়গা ছিল না ভারতে, তার ওপর কর্মচ্যুত হওয়ার পর তাদের প্রতিবাদ ভাবিত করে তুলল ব্রিটিশ সরকারকে৷ সরকার প্রমাদ গনল। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে সমঝোতা করতে রাজি হল৷ ডেকে পাঠানো হল  ম্যাকলুস্কি সাহেবকে৷ তিনি এসে এই জায়গার (আজকের ম্যাকলুস্কিগঞ্জ) কথা সবাইকে বলেন৷ তিনি অ্যাংলোদের বোঝালেন, “চলো, কাছেই আমাদের বিলেতের মতো একটি গ্রাম আছে। সেখানে আমরা সবাই মিলে বসতি স্থাপন করে তাকে ইংল্যান্ডের রূপের পরিপূর্ণতা দিই।”

১৯৩৩-এ তৈরি হল কলোনাইজেশন সোসাইটি অব ইন্ডিয়া। ঠিক হল, এই সমবায়ে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা শেয়ার কিনলে তাদের এক টুকরো করে জমি দেওয়া হবে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় দু’ লক্ষ অ্যাংলো ইন্ডিয়ানকে এই অঞ্চলে বসতি গড়ার জন্য আহ্বান জানালেন ম্যাকলুস্কি।

আরও পড়ুন কুমারী সৈকত চাঁদপুরে একটা দিন

ম্যাকলুস্কি সাহেবের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রায় ৪০০ অ্যাংলো পরিবার এই স্থানে পাকাপাকি ভাবে বসতি স্থাপন করে৷ ১৯৩৪ সাল নাগাদ রাতু মহারাজের কাছ থেকে লাপড়া, কঙ্কা ও হেসাল, এই তিনটি অঞ্চল দান হিসেবে চেয়ে নিলেন ম্যাকলুস্কি সাহেব৷ রাতু মহারাজ সেই আবদারে রাজি হয়ে অঞ্চল তিনটি ম্যাকলুস্কি সাহেবকে দান করলেন৷ ম্যাকলুস্কি সাহেবের নামে নাম হল ম্যাকলুস্কিগঞ্জ৷ অনেক অ্যাংলো স্কুল এখানে গড়ে উঠল৷ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অ্যাংলো ছেলেমেয়েরা এই সব স্কুলে পড়তে এল৷ তাদের থাকার জন্য অনেক হোস্টেল তৈরি হল৷ ব্রিটিশরা ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে ঝাড়খণ্ডের স্কটল্যান্ড বলেও ডাকত৷ আজও অনেকে এই স্থানটিকে ‘স্কটল্যান্ড অব ঝাড়খণ্ড’ বলে ডেকে থাকেন৷

dugadagi
ডুগাডগি।

তবে অ্যাংলোদের বসতি স্থাপন সুখের হয়নি৷ তাদের সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসীদের সম্পর্ক ক্রমশ খারাপের দিকে এগোতে থাকে৷ আদিবাসীরা নিজেদের পুরোনো জায়গায় কেমন যেন পর হয়ে গেল৷ অ্যাংলোদের কাছে তারা চাকরের মতো হয়ে গেল৷ গাছের ফলে হাত দিলে জুটত অপমান, এমনকি কখনও মারও৷ একই জায়গায় থেকেও নিজেদের মধ্যে মেলামেশা করতে পারত না আদিবাসীরা৷ সব সময় সাহেবরা বন্দুক নিয়ে ঘুরত আর তাদের ওপর নজর রাখত৷ এমন অবস্থায় আদিবাসীরা ক্রমশ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে৷ যার ফলস্বরূপ স্বাধীনতা লাভের পর বহু অ্যাংলো পরিবারকে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ ছাড়তে হল।

আরও পড়ুন জঙ্গল, পাহাড় ও কাঞ্চনময় তিনচুলে

এর পরও বেশ কিছু অ্যাংলো পরিবার এখানে থেকে গেল নিজেদের জমি আঁকড়ে। পরবর্তীকালে তাদের উত্তরসূরিরাও একে একে পাড়ি জমাল বিদেশে রোজগারের সূত্রে৷ ক্রমশ সাহেবদের বাড়িগুলো পরিত্যক্ত হতে শুরু করল৷ সেগুলো পরে স্থানীয় ক্ষমতাশালী মানুষজন ও ব্যবসায়ীরা নেন৷ কিছু অ্যাংলো পরিবার অবশ্য এই অঞ্চলেই নিজেদের বাড়িতে থেকে গেল৷

সত্যি কথা বলতে কি বাঙালির কাছে ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে পরিচিত করেছেন সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ৷ যথারীতি আমারও এই জায়গাটার প্রতি আকর্ষণ ছিল। আমার সেই আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিল আমার এক ছোটো ভাই সৌম্যদীপ মণ্ডল। শেষ পর্যন্ত নভেম্বর মাসের ২৩ তারিখে উঠে পড়লাম ট্রেনে৷

আরও পড়ুন চলুন সপ্তাহান্তে, ভূতাবুড়ি ও ঘাঘরবুড়ি দর্শনে

প্রথম বার গিয়েই প্রেমে পড়ে গেলাম ম্যাকলুস্কিগঞ্জের৷ তবে এখানে ‘এলাম দেখলাম আর জয় করলাম’, এমন মনোভাব নিয়ে এলে নিরাশই হতে হবে৷ এখানে দু’টো দিন হাতে নিয়ে আসতে হবে৷ আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ইচ্ছা থাকলেই এখানে আসা সার্থক৷ এখানে সে ভাবে কোনো ট্যুরিস্ট স্পট নেই৷ শুধু ভোরের সুর্য ওঠা থেকে শুরু করে বিকেলের সুর্যাস্ত পর্যন্ত রেললাইনের পাশ দিয়ে কিংবা মেঠো রাস্তা দিয়ে প্রকৃতিকে আপন করে ঘুরে বেড়ানো৷

আসলে সত্যিকারের প্রকৃতিপ্রেমিকদের কাছে আদর্শ জায়গা এই ম্যাকলুস্কিগঞ্জ। লাল কাঁকুড়ে পথঘাট, আশেপাশে সাহেবদের কটেজ৷ দূরে অরণ্য ও পাহাড়ের হাতছানি৷ পূর্ণিমার রাতে মায়াবী রূপ ধরে প্রকৃতি৷ বসন্তে পলাশ, শিমুলের সঙ্গে জাকারান্ডায় ছেয়ে যায় চারি দিক৷ সেই রূপ আরও মোহময়ী৷ এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় হিমেল হাওয়ার স্পর্শ৷ দিনের বেলায় শুধুই পাখির কুজন।

view from watchtower
ওয়াচটাওয়ার থেকে।

ম্যাকলুস্কিগঞ্জের আশেপাশে কিছু জায়গা আছে যেগুলোকে যুক্ত করে একটা সুন্দর ট্রিপ হতে পারে৷ এই প্রসঙ্গে প্রথমেই আসি ওয়াচটাওয়ারের কথায়৷ স্টেশন থেকে প্রায় আড়াই কিমি দূরে ছোটো একটি টিলার টঙে এই ওয়াচ টাওয়ার। সেখান থেকে গোটা অঞ্চলটিকে ছবির মতো দেখায়৷ ১৮০ ডিগ্রি বৃত্তাকারে পাহাড়শ্রেণি ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে ঘিরে রেখেছে৷

ডুলি
ডুলি উপাসনাস্থল।

চলুন, এ বার যাওয়া যাক ডুলি উপসনাস্থলে৷ স্টেশন থেকে প্রায় ন’ কিমি। হিন্দু, ইসলাম, শিখ আর খ্রিস্টান, এই চার ধর্মের এক সঙ্গে পাশাপাশি উপাসনার বেদি৷ জায়গাটি সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা বহন করে৷

duli forest
ডুলি ফরেস্ট।

ডুলির পাশেই একটি ছোটো দিঘি, নাম তার সীতাকুণ্ড৷ স্থানীয়রা এই কুণ্ডকে খুব মান্যি করে৷ রাস্তার দু’ধারে ডুলি ফরেস্ট। মাঝেমধ্যে হাতি অভিসারে আসে এই অরণ্যে৷

এখান থেকে সামান্য দুরে জাগৃতিবিহার৷ আদিবাসীদের হস্তশিল্পের সমবায়৷

Chatti river
চাট্টি নদী।

জাগৃতি বিহার থেকে কিছুটা দূরে চাট্টিনদীর পাড়৷ জায়গাটির নাম ডুগাডগি বা ডিগাডগি৷ চাট্টি ম্যাকলুস্কিগঞ্জের নিজস্ব নদী৷ দামোদর থেকে এর উৎপত্তি৷ টিলাময় এই জায়গা৷ জায়গাটায় দু’ দণ্ড বসে চার পাশের দৃশ্য বেশ সুখকর লাগে৷

রেলগেটের বাঁহাতি পথে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে দামোদর নদীর ব্রিজ৷ ব্রিজের ওপর থেকে দামোদর নদী আর চাট্টি নদীর মিলনস্থল দেখা যায়৷ এখান থেকে সূর্যাস্ত বা সুর্যোদয়ের দৃশ্যও মনোরম৷ এখান থেকে প্রায় ৫০ কিমি দূরে একটি পাহাড়ের ঝোরা থেকে দামোদরের উৎপত্তি৷

আর একটি জায়গা হল ম্যাকলুস্কি সাহেবের কবরখানা৷

এ ছাড়া চলতে ফিরতে অসংখ্য হোস্টেল রয়েছে জায়গাটিকে ঘিরে৷ এক সঙ্গে এত হোস্টেল খুব কম জায়গায়ই দেখা যায়।

দুপুরের খাওয়াদাওয়া করে বেরিয়ে পড়ুন। ৮০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে রফা করে গাড়ি বা অটো নিয়ে ঘুরে আসুন। সন্ধে নামার আগেই হোটেলে ফিরে আসা যায়৷ তবে সব সময় সন্ধের অন্ধকার নামার আগে গেস্টহাউসে ফিরে আসা ভালো৷

এ ছাড়াও ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে কেন্দ্র করে ঘুরে আসতে পারেন ৫০ কিমি দুরের লাতেহারের জঙ্গল থেকে৷

পাহাড়, জঙ্গল, স্থাপত্য, নদী সব মিলিয়ে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ এক স্বয়ংসম্পূর্ণ জায়গা৷ সপ্তাহান্তে দু’-তিন দিন হাতে নিয়ে এখানে ঘুরে আসতে পারলে সেটা জীবনের একটা স্মৃতি হয়েই থাকবে৷

যাওয়া 

হাওড়া থেকে রাঁচিগামী ট্রেনে রাঁচি পৌঁছে সেখান থেকে গাড়িতে প্রায় ৬৪ কিলোমিটার দুরে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ৷ এ ছাড়া হাওড়া থেকে সরাসরি শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস ম্যাকলুস্কিগঞ্জ পৌঁছে দেয় রাত পৌনে ১১টায়৷ হোটেল/গেস্টহাউসে বলে রাখলে তারা স্টেশনে গাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে৷ তবে হাওড়া থেকে রাতের ট্রেন ধরে সকালে রাঁচি পৌঁছে সেখান থেকে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ যাওয়াই ভালো।

maccluskieganj station
ম্যাকলুস্কিগঞ্জ স্টেশন।

থাকা 

ম্যাকলুস্কিগঞ্জ গিয়ে দিন দুয়েক থাকতেই হবে৷ থাকার জন্য সব চেয়ে উপযুক্ত হল গর্ডন গেস্টহাউস৷ ফোন নম্বর: ০৯৮৩৫৭৭০৬৭৯/৯৪৭০৯৩০২৩০৷ এ ছাড়া আছে মাউন্টেন হলিডে রিসর্ট৷ ফোন নম্বর: ২৭৬৩৫৭/৭৭৩৯০৮৯০৫২

Gordon guest house
গর্ডন গেস্ট হাউস।

খাওয়া

যে গেস্টহাউসে থাকবেন সেই গেস্টহাউসে বলে রাখলে তারা দুপুর বা রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়৷ এ ছাড়া বাইরে অনেক খাবারের হোটেল আছে৷ তাদের বলে রাখলে আপনার পছন্দসই খাবারের ব্যবস্থা করে, এমনকি গেস্টহাউসে পৌঁছেও দেয়৷ স্টেশনের সামনে সুরেশের শিঙাড়ার স্বাদ নিন৷ আর স্টেশনের বাইরেই এক জন চাউমিন বানান, স্বাদ খুব ভালো৷ এ ছাড়া ম্যাকলুস্কিগঞ্জের তেলেভাজা, কচুরি, জিলিপি ও চাল দিয়ে তৈরি ধোস্কার স্বাদ নিতে ভুলবেন না৷

ঘোরাফেরা

auto available in station
স্টেশনেই মিলবে অটো।

স্টেশন থেকেই অটো পেয়ে যাবেন৷ গেস্টহাউস থেকেও অটো বা গাড়ির ব্যাবস্থা করা হয়৷ অটোর জন্য যোগাযোগ করতে পারেন সুখেন্দ্র মুন্ডার সঙ্গে, ফোন নম্বর: ৮৫২১৪৫৩৫৪০

ছবি লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here