জাহির রায়হান

বিশ্বম্ভর রায় মানতেই নারাজ যে তাঁর সোনালি সময় অতীত, জমিদারি অস্তাচলের পথে, এখন জলসাঘরের রোশনাই ফিরিয়ে আনা না-মুমকিন। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খেয়ালি গঙ্গার নিরন্তর জলপ্রবাহের সাথে ভেসে গিয়েছে তাঁর জৌলুস, তাঁর কৌলীন্য। শতজীর্ণ, ধ্বংস-উন্মুখ রাজবাড়ির করুণ চাউনি বুকের ভেতর মরমের ঢেউ তোলে, অব্যক্ত বেদনা অনুভূত হয় শরীরের হাজারো শিরা-উপশিরায়, আনাচে-কানাচে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এক সময়ের গৌরব চোখের সামনে ক্ষয়ে ক্ষয়ে ঝরে পড়ছে বর্তমানের করাল বাস্তবতায়। তন্ময়ের ডাকে সম্বিৎ ফেরে সহসা, কানে ভেসে আসে হিন্দি গানের সুর, চকিতে মনে পড়ে আমরা এসেছি বনভোজনে সদল, মনে পড়ে নিমতিতা রাজবাড়ির কথা, যার সামনে ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে আছি বেশ কিছুক্ষণ।

প্রায় প্রতি বছরই কলেজ-পিকনিকের দিনক্ষণ স্থির করা নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে লড়াই বাঁধে। বিগত তিন বছর আমরা এর একটা সমাধানসূত্র বের করেছি, এখন জানুয়ারি মাসের ১২ তারিখ আমাদের কলেজ-পিকনিকের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এখন লড়াইটা হয় মূলত পিকনিকের স্থান নির্বাচন ঘিরে। এ বছরও হয়েছে, কেউ বলে দিঘা তো কেউ বলে মন্দারমণি। কখনও আলোচনায় আসে মুকুটমণিপুর, কখনও আবার লালবাগ। এমনই অনেক জায়গা, এমনকি কলেজের বড়ো ছাদ পেরিয়ে শেষমেশ ঠিক হয় নিমতিতা। নিমতিতার কথা শুনেই পল্টু নেচে ওঠে, কারণ সে ইতিমধ্যেই নিমতিতা রাজবাড়ির ইতিহাসের গন্ধে মশগুল, আত্মমগ্ন।

আরও পড়ুন ওখরে-হিলে-ভার্সে, যেন মেঘ-বালিকার গল্প

কোথাও যাওয়ার থাকলে, বিশেষত অনেকের সাথে, আমার ভেতরে একটা অস্থিরতা কাজ করে অহেতুক। মনে হয় এই বুঝি সকলে চলে গেল। তাড়াহুড়ো করে বের হই বাড়ি থেকে এবং গিয়ে দেখি আসেইনি তখনও কেউ। অগত্যা পায়চারি আর নিন্দেমন্দ করে সময় অতিবাহিত করি। এ বারেও তার অন্যথা হল না। কলেজ পৌঁছে দেখি গেটের সামনে ঢাউস একটা বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর আমার মতোই দু’ একজন দুর্বল চিত্তের খাপছাড়া লোক ছাড়া কেউ কোত্থাও নেই। অনেকটা সময় পার করে একে একে বাবুরা আসেন, বাস ছাড়ে নির্ধারিত সময়ের দু’ ঘন্টা পর। গাড়িতেই থাকে প্রাতরাশ সেরে নেওয়ার ব্যবস্থা। ফলে কলা আর ডিমসেদ্ধ খেতে খেতেই যাত্রা শুরু হয় আমাদের। এই একটা দিন আমরা খুব মজা করি সহকর্মীদের সাথে, বাসের মধ্যেই শুরু হয় একে অপরের লেগ পুলিং, আর চলতে থাকে নাগাড়ে হইহুল্লোড়।

লেখালেখি শুরু করার পর, যে কোনো স্থানেই কাজে-অকাজে যাওয়ার সময় আমার পথিক সত্তাও সক্রিয় হয়ে ওঠে ইদানীং। বাইরে থেকে বোঝার উপায় না থাকলেও ভেতর ভেতর লুকিয়ে থাকা পর্যটক-মন তার কাজ করে চলে নিয়ত। বাস ট্রেনের জানলার বাইরে সে যেমন ছুটন্ত ঘরবাড়ি, গাছপালা এমনকি দোকানের সাইনবোর্ড খেয়াল করে, তেমনি ঠিক সেই মুহূর্তে তার আশেপাশে থাকা মানুষজনের হাসি ও কথাবলার ধরন, আলোচনার বিষয়বস্তুও শোনে মন দিয়ে। লিখতে বসে দেখেছি সেই দেখা ও শোনা বেশ কাজে দেয়।

আরও পড়ুন ভারতের প্রথম চিন সাম্রাজ্যে একদিন

চুপচাপ বসেই ছিলাম সামনের দিকে, পিছন থেকে আওয়াজ এল, জাহির রায়হান আবার ভদ্রলোক হল কবে থেকে? আমার সাঙ্গোপাঙ্গরা বরাবরই পিছন দিকের যাত্রী, আওয়াজটা তাদের মধ্যেই কেউ দিল। সুজিতদার গলাও পেলাম, জাহির ভদ্রলোক? ও হল একটা গ্রেডলেস ছোটোলোক! জানি এগুলো উত্তরোত্তর বাড়বে যতক্ষণ না তাদের সাথে যোগ দিই, অগত্যা।

এগারো বছর হয়ে গেল আমার চাকুরিজীবনের। অনেক ছাত্র-ছাত্রী বেরিয়ে গেল পড়া শেষ করে। আমরাও যুবক থেকে ক্রমশ মধ্য বয়সের দিকে শুরু করেছি যাত্রা, বেশ কিছু নতুন সহকর্মীও যোগ দিয়েছে এবং বলতে দ্বিধা নেই আমাদের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কে কোনো মলিনতা নেই, স্টাফরুমের পরিবেশ দারুণ স্বাস্থ্যকর, বন্ধুত্বপূর্ণ। এ দিকে বহরমপুর শহর ছেড়ে আমাদের বাস উঠে পড়েছে রামেন্দ্রসুন্দর সেতুর ওপরে। নীচে বাহিত হচ্ছে ভাগীরথী উত্তর থেকে দক্ষিণের পানে। এই নদী পেরোলেই রাঢ়বঙ্গের শুরু। নিমতিতাও গঙ্গা নদীর পশ্চিম পাড়ে, যেটা আজ আমাদের গন্তব্য।

rajbari nearly destroyed
রাজবাড়ি আজ ধ্বংসের মুখে।

কথা ছিল নিমতিতাস্থিত এক বৃহৎ কৃষি খামারেই হবে আমাদের বাৎসরিক আনন্দভোজন। সেখান থেকে আমরা আশপাশটা ঘুরে ফিরে দেখে নেব। কিন্তু নিমতিতা পৌঁছে সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয়ে গেল অচানক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাবুবাড়ির সামনেই প্রশস্ত চত্বরে হবে রান্নাবান্না, যেখান থেকে চওড়া গঙ্গা-পদ্মা-ভাগীরথীর জলরাশি হাতছানি দিয়ে ডাকে সবর্দা। রেললাইন পেরিয়ে নিমতিতা রেলস্টেশনকে বাম হাতে রেখে, অকুস্থলে গিয়ে দেখা গেল, শুধু আমরাই নই, আরও দু’ একটি দল জুটেছে বাবুবাড়ির সামনে, একই উদ্দেশ্যে। প্রসঙ্গত জানাই নিমতিতা রাজবাড়িকেই এলাকাবাসী ডাকে ‘বাবুবাড়ি’ নামে, যে ডাকে মিশে আছে নিমতিতা জমিদারির ইতিহাস।

দূরে চিকচিক করছে রূপোলি গঙ্গা, জানুয়ারি মাসের কনকনে ঠান্ডা যেন উঠে আসছে ওই নদীর বুক থেকে। আর নিমতিতা রাজবাড়ি কঙ্কালসার দেহে বুক চিতিয়ে লড়ে যাচ্ছে এখনও টিকে থাকার তাগিদে। আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে, গৌরসুন্দর চৌধুরী ও দ্বারকানাথ চৌধুরীর উদ্যোগে নির্মিত হয় নিমতিতা জমিদারবাড়ি। নিমতিতা ও সংলগ্ন এলাকায় চৌধুরীদের জমিদারি শুরু হয় ১৮৮৫ সাল নাগাদ। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্যে চৌধুরী পরিবারের উদ্যম ও উদ্যোগে গড়ে ওঠে ইতালিয়ান ধাঁচের এই স্থাপত্য কীর্তি। বাড়িটি পাঁচটি উঠোন এবং প্রায় দেড়শো ঘর বিশিষ্ট। আয়তন ও বিশালতায় এ একেবারে রাজবাড়ি সমতুল্য। এক সময় আলো, উৎসব ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবেও এই জমিদরবাড়ির সুনাম ছিল। মুর্শিদাবাদ জেলার সব চেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ শারদ উৎসব অনুষ্ঠিত হত এই বাড়িতেই। জমিদারবাড়ির গৃহদেবতা ছিলেন গোবিন্দজি। বসন্তের দোলপূর্ণিমায় রাজবাড়ি থাকত সরগরম, উৎসবমুখর ।

আরও পড়ুন জঙ্গল, পাহাড় ও কাঞ্চনময় তিনচুলে

দ্বারকানাথের পুত্র মহেন্দ্রনারায়ণ প্রতিষ্ঠা করলেন হিন্দু থিয়েটার রঙ্গমঞ্চ এই বাড়িতেই। নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ির উপস্থিতিতে মঞ্চস্থ হল ‘আলমগীর’ নাটকটি, ঔরঙ্গজেবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন স্বয়ং মহেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। পরের দিন ওই একই নাটকে মোঘলসম্রাট ঔরঙ্গজেবের ভূমিকায় মঞ্চে এলেন শিশির ভাদুড়ি মহাশয়। নবনির্মিত এই রঙ্গালয়ে ‘আলমগীর’ ছাড়াও ‘শংকরাচার্য’, ‘মেবার পতন’, ‘সাজাহান’, ‘রামানুজ’, ‘রঘুবীর’, ‘প্রতাপাদিত্য’ প্রভৃতি নাটক অভিনীত হয় সাফল্যের সঙ্গে। ১৯৪৪ সালে, এক ভয়াল বন্যায় ভেঙে পড়ে রঙ্গালয়টি। ভাঙনের সেই শুরু, যা আজও চলছে সমানে।

সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ সিনেমার মাধ্যমেই নিমতিতা রাজবাড়ি প্রচারের আলো পেল নতুন করে। যে ছবির সংগীত  পরিচালক ছিলেন ওস্তাদ বিলায়েৎ খান সাহেব। শুধু তা-ই নয় প্রখ্যাত সানাই বাদক বিসমিল্লাহ খান ও হিন্দুস্থানী ধ্রুপদী সংগীতশিল্পী বেগম আখতার সশরীরে অভিনয় করলেন ‘জলসাঘর’ সিনেমায়। নিমতিতা রাজবাড়ির আলোচনায় যোগ হল এক নব অধ্যায়। সত্যজিৎ রায় পরবর্তীতে ‘দেবী’ (১৯৬৯) এবং ‘সমাপ্তি’ (১৯৬০) সিনেমার শুটিংও করেন এখানেই। ‘জলসাঘর’, ‘দেবী’ ও ‘সমাপ্তি’র দৃশ্যকল্পে তাই আজও জীবিত নিমতিতা রাজবাড়ির ইতিকথা।

আরও পড়ুন এক টুকরো ইতিহাস – বাণগড়

চৌধুরী বংশের বর্তমান প্রজন্ম কলকাতার নাগরিক। শারদ উৎসবের সময় আসেন নিমতিতায়। বাপ-ঠাকুর্দার প্রচলন করা দুর্গোৎসব তাঁরা এখনও করেন নিষ্ঠাভরে। নির্মিত হয় একচালার প্রতিমা আগের মতোই, একই বংশের প্রতিমা শিল্পীর দ্বারা। রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে এখনও জড়ো হন নিমতিতাবাসী। সংলগ্ন অঞ্চলে বারোয়ারি পুজোর রমরমা যতই বাড়ুক আজও বাবুবাড়ির প্রতিমাদর্শন না করলে এলাকাবাসীর মন ভরে না।

তবে সেটুকুই আশার আলো, বাকিটা নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকার। বিবর্ণ, ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ি সব হারিয়ে জীর্ণ, বিদীর্ণ। সাপখোপ আর পোকামাকড়ের নিরুপদ্রব আস্তানা। ছবি বিশ্বাস অভিনীত জলসাঘরের বিশ্বম্ভর রায়ের চরিত্রটির মতোই অসহায়। পুত্র শোকে যন্ত্রণাবিদ্ধ পড়তি জমিদার বিশ্বম্ভর রায় ঘোড়া ছুটিয়ে চললেন গঙ্গা নদীর দিকে, কিছুটা যাওয়ার পর পড়ে গেলেন সেই নদীর তীরে যে গ্রাস করছে তাঁর একমা্ত্র সন্তানকে, বিশ্বম্ভর রায় আর উঠতে পারেননি সে দিন, শেষ হয়ে গেল ‘জলসাঘর’। নিমতিতা রাজবাড়িও ছুটছে কালের পিঠে সওয়ার হয়ে সেই মৃত্যুমুখের দিকে, নদীও এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে নিমতিতা জমিদারির ইতিহাস, সজ্ঞানে, নির্ভুল নিশানায়।

তন্ময় জিজ্ঞেস করলো, দাদা, কী হল? উত্তরে, নিজেই শুনতে পেলাম নিজের গভীর দীর্ঘশ্বাসের নৈর্ব্যক্তিক আর্তনাদ।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া/শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে নিমতিতা ২৭৯ কিলোমিটার। সব চেয়ে সুবিধাজনক ট্রেন হাওড়া-কাটিহার এক্সপ্রেস। রাত ৯.২৫ মিনিটে ছেড়ে নিমতিতা পৌঁছে দেয় ভোর পাঁচটা নাগাদ। আরও ট্রেন আছে। ট্রেনগুলি সবই ফারাক্কা যায়। বহরমপুরে থাকতে হলে সেখানে যাওয়ার আরও ট্রেন আছে, সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in

কলকাতা থেকে সড়কপথে নানা ভাবে যাওয়া যায়। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে কৃষ্ণনগর-বহরমপুর হয়ে। অথবা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে পানাগড়, সেখান থেকে পানাগড়-মোরগ্রাম জাতীয় সড়ক ধরে মোরগ্রাম, সেখান থেকে নিমতিতা। এই পথে দূরত্ব ২৬৯ কিমি। আর একটি রাস্তা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বর্ধমান, তার পর ভাতার-খরগ্রাম-মোরগ্রাম হয়ে। এই পথে দূরত্ব ২৭৪ কিমি।

কোথায় থাকবেন

থাকতে হলে বহরমপুর বা ফারাক্কায় থেকে নিমতিতা ঘুরে নিতে পারেন। ৭৮ মিনি দূরে বহরমপুরে আছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের টুরিস্ট লজ। অনলাইনে বুকিং: www.wbtdcl.com । এ ছাড়াও বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল-লজ আছে। সন্ধান পেয়ে যাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip, holidayiq  ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে। থাকতে পারেন ১৮ কিমি দূরে ফারাক্কাতেও। ফারাক্কা লজ (যোগাযোগ ০৯৯৩৩৩৯৯৯৮৬), হোটেল প্যারামাউন্ট ইন (যোগাযোগ ০৮৯২৬৮১৮৯০৭) উল্লেখযোগ্য।

ছবি: লেখক

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন