শম্ভু সেন:

৩৫ বছর আগেকার ছবিটার সঙ্গে কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না আজকের দেখাটা। কোথাও এতটুকু মিল নেই। বাসস্ট্যান্ডের দু’কিলোমিটার আগে একটা বাঁক। রাস্তার দু’দিকের জমিতে এক চিলতে ফাঁক নেই। ছিটেবেড়া থেকে আধুনিকতার ছাপ লাগানো লজ আর হোটেল গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে। নানা দামের নানা মানের, ‘থাকিবার সুবন্দোবস্ত’। আর সেই সঙ্গে সস্তায় ‘সুরুচিকর আহারের ব্যবস্থা’। বেলা ১১টার আগেই এসে পৌঁছোলাম বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে।

৩৫টা বছর অবশ্য কিছু কম সময় নয়। সে বার এসেছিলাম বাবা-মা-ভাইকে নিয়ে। আর এ বার আমার ভ্রমণসঙ্গী স্ত্রী-পুত্র। সে বার এসেছিলাম বাসে আর এ বার লোকাল ট্রেনে। সে বার যাত্রা করেছিলাম সকাল ছ’টায়। ধর্মতলা থেকে নামখানার সরকারি বাস। ভুটভুটিতে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া পেরোনো। তার পর ভিড়ের জন্য প্রথম বাস ছেড়ে দ্বিতীয় বাসে বকখালি যাত্রা। তখন এ পথে বাস চলত হাতে গোনা। ১৩৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছিল সাত ঘণ্টা।

আর এ বার যাত্রা শুরু সকাল সোয়া ৭টায়। শিয়ালদহ থেকে নামাখানাগামী ট্রেন। ১০টার একটু পড়ে পৌঁছোল নামখানা। স্টেশন থেকে ভ্যানরিকশায় জেটিঘাট। ভেসেলে নদী পেরিয়ে বাসযাত্রা। বাস প্রচুর, প্রায় মিনিটে মিনিটে।

৩৫ বছর আগে নামখানা-বকখালির রাস্তা ছিল শুনশান। শীর্ণ, ভাঙাচোরা, রাস্তায় গাড়িঘোড়াও কম ছিল। রুটে নামমাত্র কিছু বাস আর মাল পরিবহণের জন্য কিছু ট্রাক। বেশ দূরে দূরে ছিল বসতি, টিমটিমে। তবে সবুজ-সম্ভার ছিল অফুরান। ২ কিলোমিটার আগের সেই বাঁকটা ঘুরতেই ডান দিকে নজরে পড়ত অল্প দূরের ঝাউয়ের সারি। ছুটে আসত সমুদ্রের হাওয়া। জানিয়ে দিত বকখালি কাছেই।

ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলা।

বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে ডান দিকে ঘুরলাম। দোকানপাটের মধ্যে দিয়ে এসে বাঁ দিকে টুরিস্ট লজকে রেখে চলে এলাম পার্কিং-এর জায়গায়। সামান্যই পথ। সামনেই সৈকত। বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি ভাঙতেই পায়ের উপর আছড়ে পড়ল সমুদ্র।

ও মা! সমুদ্র এত কাছে। সে দিন এমন ছিল না। বাস থেকে নেমে লাল মোরামের পথ ধরে পৌঁছে গিয়েছিলাম সরকারি টুরিস্ট লজে। সেই মোরামের পথই দীর্ঘ ঝাউবন ভেদ করে পৌঁছে গিয়েছিল সমুদ্র কিনারে। কয়েক মিনিট পথ ভেঙে পৌঁছোতে হত সমুদ্রে। সৈকতে ছিল অসংখ্য গাছের গুঁড়ি। তাই কিছুটা যেন রয়েসয়ে পদচারণা করতে হত। উদ্দাম সমুদ্রের সঙ্গে খেলতে হত অতি সাবধানে। পাছে ঢেউয়ের ধাক্কায় গুঁড়ির ওপর পড়ে গিয়ে চোট লেগে যায়, তাই নিজেদের কিছুটা গুটিয়ে রাখতে হত। তার পরে সন্ধে নামলেই টুরিস্ট লজের ঘেরাটোপে ফেরা। নির্জনতা আর আঁধার গ্রাস করত সৈকতকে। ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে ফেরার সময়ে কেমন গা ছমছম করত। তাই ফেরার পথে পা চলত অতি দ্রুত।

বালি ভাস্কর্যে ব্যাস্ত অনন্ত হালদার। বকখালির ‘সুদর্শন পট্টনায়ক’।

কোথায় সেই গা ছমছমে ভাব? কোথায় সেই ঠাসবুনট জঙ্গল? কোথায় সেই গাছের গুঁড়ি? সমুদ্রের সঙ্গে খেলাও তাই সমানে সমানে। পুলিনবিহারীদের উদ্দামতা এখন বাঁধভাঙা। ঝাউবন অনেক পাতলা, তার গায়ে লাগিয়ে পায়ে চলা বাঁধানো পথ। মারকারি ভেপার ল্যাম্পের রোশনাই। দূরত্বও যেন ঘুচে গিয়েছে সমুদ্রের। সে এখন অনেক কাছে। স্থানীয় মানুষরাও বলেন, পঁয়ত্রিশ বছরে সমুদ্র অনেক এগিয়ে এসেছে।

টুরিস্ট লজের রেস্তোরাঁটি ছাড়া খাওয়ার জায়গা ছিল নামমাত্র। বাসস্ট্যান্ডের আশেপাশে গোটা কয়েক নামগোত্রহীন হোটেল – চাটাই আর হোগলার ঘর, মাটির দাওয়ায় কাঠের নড়বড়ে বেঞ্চি বা টিনের চেয়ার। চেহারায় হয়তো ভক্তি আসে না, কিন্তু সুস্বাদু পার্শে বা ভেটকি মাছ দিয়ে গরম ভাত পরিবেশনে তাদের জুড়ি মেলা ভাড়। এখন অসংখ্য খাবারের জায়গা, কোনটা ছেড়ে কোনটা ধরি, কিন্তু তৃপ্তি যেন হয় না।

আরও পড়ুন: বালিয়াড়ার বালিয়াড়িতে

আঠারো মাথা খেজুর গাছ, বিশালাক্ষী আর বনবিবির মন্দির তেমনই আছে। শুধু হোটেল-লজের ভিড়ে এদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অদূরেই আর এক সৈকত ফ্রেজারগঞ্জ যেন আরও ম্রিয়মাণ। ফেরার পথে হাতছানি দিয়ে ডাকে জম্বুদ্বীপ। খুব সকালে বেরিয়ে ভুটভুটিতে সমুদ্রবিহার করে দুপুরের আগেই ফিরে আসা যায় সেখান থেকে।

সৈকতে সতর্কবার্তা।

নির্জনতা হারিয়েছে বকখালি। কিন্তু জনপ্রিয় হয়েছে। ভরা গরমেও সেখানে সমুদ্রপিপাসুদের দাপাদাপি। আসলে কলকাতার এত কাছে নীল সমদ্র আর সবুজ ঝাউবীথিকার হাতছানি আর কোথায় মিলবে? তাই সপ্তাহান্তে চলো বকখালি।

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে নামখানার জন্য প্রথম লোকাল ট্রেনটি ছাড়ে সকাল ৭:১৫-এ। দিনে আরও বেশ কিছু ট্রেন সোজা নামখানা যায়। ট্রেনে লক্ষ্মীকান্তপুর গিয়ে সেখান থেকে ট্রেন বদল করে নামখানার ট্রেনেও উঠতে পারেন। নামখানা স্টেশন থেকে ভ্যানরিকশা বা টোটোয় যান জেটিঘাট। ভেসেলে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া পেরিয়ে যান। ও-পারে বকখালি যাওয়ার মুহুর্মুহু বাস ছাড়ছে। ধর্মতলা থেকে ভূতল পরিবহণের বাসেও পৌঁছে যেতে পারেন বকখালি। গাড়ি নিয়ে গেলেও অসুবিধা নেই। বাস বা গাড়ি হাতানিয়া-দোয়ানিয়া পেরিয়ে যায় ভেসেলে চেপে।

কোথায় থাকবেন

বকখালিতে থাকার অঢেল জায়গা। টুরিস্ট মরশুম না হলে গিয়েই বুক করে নেওয়া যায়। তবে সব থেকে ভালো থাকার জায়গা, পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের বকখালি টুরিস্ট লজ। অনলাইনে বুক করতে পারেন www.wbtdcl.com

1 মন্তব্য

  1. Bokkhalir khub kachakachi arek nirjon dip Mousuni Island, sundor grammo poribeshe, nirhon somudro soikat, bokkhalir moton kono adhunikota pouchote pareni ekhono, thakar khub sadharon maner ekta bebostha royeche. Bokkhaler sathe ekdin ekhaneo katiye jete paren, mondo lagbena hoito

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here