wrivu

শ্রয়ণ সেন

–“ও দাদা, সমুদ্র কত দূরে গো?”

–“কোন সমুদ্র? ছোটো না বড়ো?

–“ছোটো সমুদ্র, বড়ো সমুদ্র মানে?”

–“ছোটো সমুদ্র ডান দিকে কয়েক পা, আর বড়ো সমুদ্র বাঁ দিকে দশ মিনিটের হাঁটা”

স্থানীয় এক গ্রামবাসীর কথায় আমরা হতচকিত!

ডান দিকে সমুদ্র? কী করে হয়! জায়গাটার ভৌগোলিক অবস্থান বলছে ডান দিকে সমুদ্র থাকার কথাই নয়। যাক গে লোকটার কথা মত ‘বড়ো’ সমুদ্রের উদ্দেশেই হাঁটা লাগালাম।

গ্রামের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে মোরামের রাস্তা। হেঁটে চলেছি। ঘড়ি বলছে তখন দশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। অবশ্য গ্রামের মানুষের সময় ধারণা নিয়ে আমাদের শহুরে মানুষের একটা চিরাচরিত রসিকতা রয়েছে। তাঁরা যদি বলেন দশ মিনিট, তা হলে বুঝতে হবে অন্তত আধ ঘন্টা লাগবেই।

প্রায় মিনিট পনেরো হাঁটার পর সমুদ্র নজরে এল। কিন্তু সে এখনও অনেক দূরে। আরও বেশ কিছুক্ষণের হাঁটার পর একটা গ্রাম এল। নাম বালিয়াড়া। মোরামের রাস্তা শেষ, শুরু হয়ে গেল বালি পথ। বুঝলাম সমুদ্র আর সত্যি দূরে নয়। একটা মন্দিরকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম সমুদ্রের দিকে। ‘বড়ো’ সমুদ্র আমাদের ডাকছে।

ভ্রমণ-লিখিয়েদের এক ছাদের তলায় এনেছে ‘ট্র্যাভেল রাইটার্স ফোরাম’। তাঁদের আহবানেই আজ সকালে সদলবলে চলে এসেছি ফ্রেজারগঞ্জ। উঠেছি ফ্রেজারগঞ্জ সৈকতের একটু আগে বেনফিশের হোটেল সাগরকন্যায়। ফ্রেজারগঞ্জ সৈকত বলতে আমরা যাকে বুঝি, সাগরকন্যার অবস্থান তার একটু আগেই। এখান থেকে ফ্রেজারগঞ্জ সৈকত বেশ কিছুটা দূরে।

দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর, হোটেলের ছাদে পায়চারি করতে গিয়ে নজরে এল সাগরের নীল জল। কাছে তো নয়ই, কিন্তু খুব একটা যে দূরে, তা-ও মনে হল না। ঠিক হল বিকেলে ওই দিকে হাঁটা লাগানো হবে। যেমন কথা তেমন কাজ! পাড়ি দিলাম ওই অজানা পথ ধরে।

সাদা বালির অলস সৈকত এই বালিয়াড়া। ভিড়ভাট্টার কোনও বালাই নেই। পর্যটকদের কাছে এখনও অপরিচিত। পর্যটক বলতে আমরা তিন জন আর আমাদের সঙ্গী বিখ্যাত কোস্টাল ট্রেকার রতনলাল বিশ্বাস। সমুদ্রে এখন ভাটার টান। তাই তাঁর চিরাচরিত গর্জন উধাও। সাদা বালির ওপরে ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে লাল কাঁকড়া। ডান দিকে সমদ্র বরাবর হাঁটলে ফ্রেজারগঞ্জ হয়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে বকখালি সৈকতে। রতনলালবাবুকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে সৈকত বরাবর হাঁটার ইচ্ছে ছিল কিন্তু বাধ সাধল কালবৈশাখীর হুঙ্কার।

অবশ্য সমুদ্র বরাবর হাঁটার ইচ্ছে পরের দিনই পূর্ণ হয়ে গেল। সকাল সকাল বকখালি-হেনরি আইল্যান্ড ঘুরে এসে দুপুরে সাগরকন্যায় বিশ্রাম। বিকেলে একটু আগে আগেই বেরিয়ে পড়া হল। আজ আমাদের দল আরও বেশ বড়ো। প্রায় দশ-এগারো জন মিলে হাঁটা লাগাচ্ছি বালিয়াড়ার বিচের দিকে।

baliyara-2
বালিয়াড়া থেকে সূর্যাস্ত

পূর্ব উপকূলের সমুদ্রে সূর্যাস্ত! একমাত্র এই বালিয়াড়ার এই সৈকতে অদ্ভুত এই ঘটনার সাক্ষী থাকলাম। আগের দিনের কালবৈশাখীর হুঙ্কার সুন্দর এই দৃশ্যটাকে দেখতে দেয়নি। সাদা বালির ওপর নিজেদের মতো মেতে আছে সবাই। কেউ লাল কাঁকড়াকে ফ্রেমে ভরতে ব্যস্ত, কেউ নিজেদের মতো গ্রুপ বানিয়ে মেতেছে গল্পে। কথা হল স্থানীয় একজনের সাথে। ডান দিকে আঙুল উঁচিয়ে তিনি দেখানোর চেষ্টা করলেন, ওই দূরে দেখা যাচ্ছে পটুয়াখালি। অর্থাৎ পূর্ব মেদিনীপুর। তাঁর কাছেই আগের দিন শোনা ‘ছোটো’ সমুদ্রর কনফিউশন পরিষ্কার হল। তিনি বললেন, ফ্রেজারগঞ্জের জেটি ঘাট, যেখান থেকে জম্বু দ্বীপ যাওয়ার জন্য লঞ্চ ছাড়ে তাকেই স্থানীয়রা ‘ছোটো সমুদ্র’ বলে।

তাঁর কথায়, এই সৈকতটি বিএসএফের নজরে এসেছে। এখানে নাকি একটি বেসক্যাম্প তৈরি করার চেষ্টায় আছে বিএসএফ। সত্যি যদি সে রকম কিছু হয় তা হলে বালিয়াড়ার শান্তি আর থাকবে না। আক্ষেপের সুর তাঁর গলায়।

ফ্রেজারগঞ্জের দিকে হাঁটা লাগানোর জন্য সবাই প্রস্তুত। ভাটার টানে সমুদ্র এখন শান্ত। ডান দিকে মৎস্যজীবীদের ঘর আর বাঁ দিকে বঙ্গোপসাগরকে রেখে এগিয়ে চলেছি। এই পড়তি বেলাতেও নিজেদের জাল নিয়ে সমুদ্রে গিয়েছেন কয়েকজন, কেউ আবার মীন বাছতে ব্যস্ত।

ডান দিকে হাওয়া কলের আগমন জানান দিল ফ্রেজারগঞ্জ বিচ এসে গেছে। সূর্য গেছে পাটে। চায়ের দোকানে এখন আমাদের যাত্রা বিরতি। নজর পড়ল একটি ভগ্ন বাড়ির দিকে। বিচের ওপরেই। সমুদ্রের ধাক্কা খেয়েই কোনও একদিন ভেঙে পড়েছিল।

এটাই কি সেই ফ্রেজারসাহেবের ভগ্নবাড়ি?

কী ভাবে যাবেন?

ফ্রেজারগঞ্জ বা বকখালি থেকেই ঘুরে আসুন বালিয়াড়া। শিয়ালদহ থেকে নামখানা লোকালে নামখানা পৌঁছন। নামখানা স্টেশন থেকে ভ্যানো বা টোটোয় পৌঁছে যান নামখানা জেটি ঘাটে। নৌকা করে পেরিয়ে যান হাতানিয়া-দোয়ানিয়া। নদীর ওপারে বাসস্ট্যান্ড থেকে ফ্রেজারগঞ্জ হয়ে বকখালি যাওয়ার জন্য মুহুর্মুহু বাস ছাড়ে। ফ্রেজারগঞ্জের আগে বেনফিশের স্টপে নামতে হবে। এখান থেকে ভ্যানো বা মিনিট পনেরোর হাঁটা পথেই পৌঁছে যেতে পারেন বালিয়াড়া। ধর্মতলা থেকে বকখালির ভূতল পরিবহণের বাসেও যেতে পারেন।

কোথায় থাকবেন?

বকখালি বা ফ্রেজারগঞ্জে থাকার জায়গার কোনও অভাব নেই। তবে বালিয়াড়া সৈকতে যেতে গেলে সব থেকে ভালো থাকার জায়গা বেনফিশের সাগরকন্যা হোটেল। তবে ঘর ভাড়া অন্য হোটেলের তুলনায় অনেক সস্তা হওয়ার ফলে ঘরগুলির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এ ছাড়া এখানে সব থেকে ভালো থাকার জায়গা হল বকখালির পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের টুরিস্ট লজ। অনলাইনে বুক করুন www.wbtdc.gov.in

2 মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here