উদয়ন লাহিড়ী

হাঁটছিলাম এক নির্জন রাস্তায়। ছিল হালকা চাঁদের আলো। রাস্তার দু’ ধারে রহস্যময় জঙ্গল। হঠাৎ হঠাৎ শেয়াল ডাকছিল। সঙ্গে ছিল আমার পায়ের শব্দ। সে দিনটা কিন্তু স্মৃতিতে মরচে পড়া একটা দিন। সে দিন বুঝেছিলাম চন্দ্রিমা শুধু সুন্দরী হয় না, রহস্যের জাল-বোনাও হয়। ক’দিন ধরেই সেই চাঁদভেজা রাতটা ফেরত পেতে খুব ইচ্ছা করছিল। কিন্তু সুযোগ হচ্ছিল না।

অফিসে গেছিলাম সে দিন। মুখপুস্তিকার একটি বার্তা ভেসে উঠল মুঠোফোনের পর্দায়। সেই বার্তায় সুযোগ এসে গেল হাতের মধ্যে। ঝাড়গ্রাম যাওয়ার সুযোগ। বসন্ত উৎসবের দিনে। সেই রাতে চন্দ্রিমা তন্বী নয়, পূর্ণাঙ্গী। আমি উৎসাহিত, উত্তেজিত।

ট্রেন ছেড়েছিল ঠিক সময়ে।  ধীর গতিতে স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে যন্ত্রটি, বিরহী এক প্রেমিকের মতো। বেশ কিছুক্ষণ পরে যানটির গতিবৃদ্ধি হল। জানলার গা চুঁয়ে গড়িয়ে পড়ছে এক ফালি রোদ্দুর, ভারী চঞ্চল। কখনও পালিয়ে যাচ্ছে, আবার ছুটে আসছে। ট্রেন ছুটল দুর্বার গতিতে। কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। সাড়ে ন’টাতেই ঝাড়গ্রাম।

স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল সুমন, ঝাড়গ্রাম ট্যুরিজম-এর রিপ্রেজেন্টেটিভ। রোগা। বসন্ত উৎসব লেখা একটা গেঞ্জি পরে। চোখে বুদ্ধির ছাপ। হাসিটা ডান দিক ঘেঁষা। বলল, গোটা ট্যুরটায় ও আমার সঙ্গেই থাকবে। যাক ভালোই হলো। আমরা চললাম সাত কিলোমিটার দূরে কৌশল্যা হেরিটেজ হোটেলে, লোধাশুলির পথে। লোধাশুলি থেকে পাঁচ কিলোমিটার আগে থামলাম। সাদা রঙের হোটেল। সামনে পতাকা উড়ছে পত পত করে। ট্রিম করা ঘাসের লন। চারিদিকে নানান গাছের জঙ্গল। আসার পথে শালের জঙ্গলের মাঝে একটা লাল রঙের গাছ দেখলাম। শালের গাছে ফাগুনের ছোঁয়া। নতুন পাতায় কাঁচা সবুজ। ব্যাক গ্রাউন্ডে নীল আকাশকে সঙ্গে নিয়ে তাকালে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। নতুন সুন্দরী।

হোটেলে পৌঁছে ব্রেকফাস্ট । বিশাল লুচি, ছোলা বাটোরার মতো সাইজ। চারটেতেই মধ্যপ্রদেশ ধর্মঘট ডাকল।

গাড়ি নিয়ে এলাম ঝাড়গ্রাম টাউনে। রবীন্দ্র উদ্যান। বসন্ত উৎসবের অনুষ্ঠান দেখতে। ঢুকতেই রবীন্দ্রনাথের মূর্তি। চারিদিকে গাছ। একটি মঞ্চ আছে। এখানেই হবে অনুষ্ঠান। চাঁদোয়া হিসাবে অনেক ছাতা লাগানো। নানা রঙের ছাতা। অ্যাঙ্কর, অ্যাঙ্করনি মঞ্চে এসে শুরু করল অনুষ্ঠান।  যা দেখলাম, সেটুকু ভালো লাগা নিয়ে ফেরত এলাম কৌশল্যায়। মধ্যাহ্নভোজের মেনুটাও খুব ভেবে চিন্তে করা। রান্না ভালো।

ঘুরতে এসে বসে থাকবো? তাই আবার বেরিয়ে পড়া, চললাম ক্রিস গার্ডেন।

অনেকটা হাঁটা। মাঝে পেলাম কাজু গাছের জঙ্গল। কাজুও হয়েছে দেখলাম। এটাও জানলাম তার ওপরের অংশকে বলে চারমগজ। এগিয়ে পেলাম বিশাল আমবাগান। আমাদের সঙ্গে ছিলেন গাছবিশারদ ও পক্ষী বিশারদ। তাঁরা পটাপট গাছ আর পাখির নাম বলে ফেলছেন। আমি শুনেছি বটে, কিন্তু দশ সেকেন্ড পরে ভুলেও যাচ্ছি। তবু একটাও যদি মনে থাকে তাতেই আমার লাভ।

ক্রিস গার্ডেন এক বড়োলোক মারোয়াড়ির খেয়াল। ক্রিস পাটোয়ারি। বিশাল সাজানোগোছানো একটা বাগান বানিয়ে রেখেছেন। এ রকম জায়গায় বড্ডো বেমানান। আমরা যখন গেলাম তখন অবশ্য বন্ধ হয়ে গেছে। ভেতরে ঢুকতে পারলাম না।

ফেরত যাব এ বার। ক্রিস গার্ডেনের ছেলেটি বলল, তাড়াতাড়ি যান, এ দিকে হাতি আছে। যে রাস্তাটা আসতে আমাদের প্রায় দেড় ঘন্টা লেগেছিল সেটা আমরা অতি দ্রুত পেরিয়ে এলাম।

পূর্ণ চাঁদের মায়া।

হোটেলে পৌঁছে সোজা ছাদে। সন্ধের স্ন্যাক্স, সঙ্গে ফাগুনের চাঁদ। আকাশ ঝকঝকে। মেঘের একটা কুচিও নেই। চাঁদে ভেজা জঙ্গল। এই সেই রাত, যে রাতে রাস্তায় একা হেঁটে যাব বলে এখানে আসা। বেরিয়ে পড়লাম চাঁদের রহস্য দেখতে। চারিদিকে ধোঁয়া ধোঁয়া জঙ্গল। তার মধ্যে হালকা চাঁদের আলো পড়ে ভারী নৈসর্গিক, আবার ভয়জাগানোও। এই তো সেই রাস্তা। এই রাস্তাতেই তো হাঁটতে চেয়েছিলাম।

ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি।

পরের দিন বেরিয়ে পড়লাম। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি এখন হোটেল। রাজবাড়ির সামনে প্রাঙ্গণে ঘুরতে কেউ আটকায় না। তবে আগে থেকে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হয়। ঢুকতেই কানে এসেছিল কীর্তনের আওয়াজ। খোল নিয়ে গোপালের নামকীর্তন। ও দিকে গেলাম। সুমন বলল, নিয়ম হল রাজবাড়িতে ঢুকলে আগেই গোপালের সঙ্গে দেখা করতে হয়। তাই করলাম।

আমি নিজেকে খুব বড়ো নাস্তিক হিসাবেই জানি। মন্দিরে ঢুকি না, খুব একটা পছন্দও করি না। এখানে কিন্তু ঢুকলাম। কীর্তনটা শুনে মনে হল, এর থেকে আর শ্রুতিমধুর কী হতে পারে। তারও একটা ব্যাখ্যা খুঁজে পেলাম। এরা গান গাইছে মনের তাগিদে। তার সঙ্গে পরিবেশগুণ তো আছেই। শব্দহীন পরিবেশে শুধুই কীর্তন। এর পর গেলাম ঠিক পাশেই, শিবমন্দিরে। রাজবাড়িতে এ রকম অনাড়ম্বর মন্দির সত্যি শান্তির আধার। অনেকক্ষণ বসে থাকতে ইচ্ছা করে। শিবমন্দিরের পেছনে রাখা আছে মুগুর। হাতলওয়ালা কাঠের গুঁড়ি। জমিদারেরা এই মুগুর ভাঁজতেন। কসরত করতেন। শরীরচর্চা। মাথার উপর ঘোরাতেন বন বন করে। আমি হাঁটুর উপরে তুলতেই পারলাম না। আমাদের মধ্যে কেউই পারল না।

মাঝখানে একটি বহু পুরোনো ফোয়ারা। এখনও চালু। তার চারিদিকে ফুলের বাহার। আরও ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু নো এন্ট্রি লেখা জায়গায় ঢোকা নিষেধ। তাই ফেরত চললাম। এ বার যাব চিলকিগড়।

কনকদুর্গার প্রাচীন ফেটে যাওয়া মন্দির।

চিলকিগড়, ঝাড়গ্রাম থেকে জামবনি হয়ে পনেরো কিলোমিটার। দেখলাম কনকদুর্গার মন্দির। একটা নতুন চকচকে মন্দিরের পাশে কনকদুর্গার আসল মন্দির, যেন দুয়োরানি। মাঝখান দিয়ে ফেটে গেছে। আর বেশি দিন হয়তো থাকবে না। কালের মন্দিরা বাজতে শুরু করেছে। কেউ আসল মন্দিরটি ফিরেও দেখছে না। আমার একটু দুঃখ হল। আমিও নতুন মন্দিরটির দিকে ঘুরেও তাকালাম না। যাহ, শোধবোধ।

ডুলুং নদী।

একটু এগোলেই ছোট্টো ডুলুং নদী। তার না আছে স্রোত না, না আছে অবয়ব। নামতে ইচ্ছা করল। জুতো খুলে পা মাটিতে দিতেই নুড়ি পাথরগুলো পায়ের তোলা কেটে বসে যেতে লাগল। আস্তে আস্তে জলে গিয়ে নামলাম। ভারী ভালো লাগছে। স্বচ্ছ জল হালকা হালকা পা ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমাকে আঘাত করতেই চায় না। ছবি তোলা চলল। সুমন তাড়া দিল। সে আমাদের গাইড কিনা।

চিলকিগড় রাজবাড়ি।

মন্দিরচত্বরে কালোমুখো অনেক হনুমান কোলে বাচ্চা নিয়ে করুণ মুখে বসে। কাছে গেলেও তেমন উত্তেজনা নেই। ওদের দেখেও মনটা খারাপ হল। আমি বড় বেশি আবেগপ্রবণ। খাবারের অভাবে হনুমানগুলো ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেছে। এর পর দেখলাম চিলকিগড় রাজবাড়ি।

ঘাগরা, বেলপাহাড়ি।

চিলকিগড় দেখে চললাম বেলপাহাড়ি। সেখান থেকে ঘাগরা। পুরো অঞ্চলটি আগ্নেয় পাথরের। বর্ষাকালে জল যায়। এখন শুকিয়ে গেছে। জলের উৎস বৃষ্টি। তা ছাড়া জল থাকে না। তবে জমা জল রয়েছে। সে জল বেশ টলটলে। একটা নদীখাতও রয়েছে। ওই রাস্তাতেই জল আসে। পেছনে বেশ জঙ্গল। জায়গাটি একেবারে নিস্তব্ধ। নাম-না-জানা পাখিরা ডেকে উঠছে। এখানকার রাতটা কেমন? ভাবতেই গা ছমছম করে উঠল।

ফিরে এলাম বেলপাহাড়িতে। মধ্যাহ্নভোজ সেরে গররাসিনির পথে। অনেক কাল আগের একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেল। বন্ধুকে নিয়ে এসেছিলাম বেলপাহাড়ি। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে হাঁটা দিয়েছিলাম গররাসিনির দিকে। পথে দেখা হয়েছিল ধনীরাম সোরেঙ-এর সঙ্গে। বাচ্চা ছেলে। যাচ্ছিল মামার বাড়ি। আমরাও ওর পিছু নিলাম। প্রায় ঘণ্টা তিনেক হাঁটার পরে পৌঁছেছিলাম গররাসিনির পাদদেশে। সেখানে ছিল একটি আশ্রম। পাশে জলসত্র। প্রাণভরে জল খেয়েছিলাম। সেই জল ছিল অমৃতের মতো। আশ্রম থেকে একটি সারমেয় পথ দেখাল। সারমেয়টি সামনে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে, আমরা পিছুপিছু। শেষ পর্যন্ত পৌঁছোলাম বাসরাস্তায়। কিন্তু জায়গাটির নাম দেখলাম তামাজুরি। মাইল ফলকে দেখলাম ‘বেলপাহাড়ি ১৪ কিলোমিটার’। তখন সূর্য ডুবছে। না, বেলপাহাড়ি যাইনি, সে দিন বাস ধরে পৌঁছে গেছিলাম রানিবাঁধে।

সেই স্মৃতি আজও বেশ স্পষ্ট। দেখলাম আশ্রমটি আছে। কিন্তু কালের নিয়মে তাতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। জলসত্রটি খুঁজে পেলাম না। কেন জানি না স্বজনহারানোর ব্যথা জেগে উঠল।

যেটা আগের বার দেখিনি, সেটা হল পাহাড়ে ওঠার রাস্তা। গররাসিনিরতে পাহাড়ে ওঠার রাস্তা হয়েছে। কিছুদূর উঠে নেমেই এলাম। আমার ক্ষমতার বাইরে। ওপরে একটা শিবের মন্দির রয়েছে। নীচে থেকেই দেখা যাচ্ছে। সাদা ধবধবে ছোট্টো একটা মন্দির। একটা গুহাও আছে শুনলাম। যারা গেল তাদের যেতে আসতে বেশ সময় লাগল। আমি ততক্ষণ উপভোগ করলাম নিস্তব্ধতা।

এখান থেকে চললাম খান্দারানি হ্রদ। এই হ্রদটি নাকি গররাসিনির ওপর থেকে দেখা যায়। অনাবিল প্রকৃতির মাঝে এই হ্রদ। ঢুকতেই একটা লক গেট। এটা কেন তা বুঝলাম না। সুমন বলল, এটার সঙ্গে নদীর যোগ আছে। লক গেট টপকে মোরামের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেলাম জঙ্গলের দিকে। ওখান দিয়ে হ্রদের ধারে নেমে আসার রাস্তা। হ্রদের ধরে জঙ্গলের ছায়া। মাটিতে ঘাস। চুপ করে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ।

সূর্যদেব জানান দিলেন সে দিনের মতো ওঁর কাজ শেষ। জঙ্গলের পেছনে নেমে যাবেন। আমরা শেষ পর্যন্ত দেখতে পেলাম না। আকাশ হলুদাভ থেকে সবে কমলা হতে শুরু করেছে, আমরাও বেরিয়ে পড়লাম। হোটেলে ফিরতে হবে যে।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে হাওড়া থেকে ঝাড়গ্রাম ঘণ্টা আড়াইয়ের পথ। সব চেয়ে ভালো ট্রেন ইস্পাত এক্সপ্রেস। হাওড়া থেকে ছাড়ে সকাল ৬.৫৫ মিনিটে, ঝাড়গ্রাম পৌঁছোয় ৯.০৮ মিনিটে। হাওড়া-ঘাটশিলা মেমু শনিবার ছাড়া সপ্তাহে ছ’ দিন হাওড়া থেকে সকাল ১০টায় ছেড়ে ঝাড়গ্রাম পৌঁছোয় ১২.০৮ মিনিটে। এ ছাড়াও সারা দিনে আরও গোটা বেশ কিছু ট্রেন রয়েছে ঝাড়গ্রাম যাওয়ার জন্য। সড়কপথে ৬ নম্বর বরাবর লোধাশুলি গিয়ে ডান দিকের পথ ঝাড়গ্রাম, দূরত্ব ১৭২ কিমি। এসপ্ল্যানেড, হাওড়া থেকে বাস রয়েছে ঝাড়গ্রাম যাওয়ার জন্য।

কোথায় থাকবেন

থাকার জায়গার কোনও অভাব নেই ঝাড়গ্রামে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি টুরিস্ট লজ বুক করতে পারেন অনলাইনে (www.wbtdc.gov.in) । আছে পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের ঝাড়গ্রাম প্রকৃতি পর্যটন কেন্দ্র (wbfdc.net/onlineguestlogin.aspx) । ঝাড়গ্রাম ও তার আশেপাশে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় রয়েছে প্রচুর থাকার জায়গা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঝাড়গ্রাম রিট্রিট (যোগাযোগ ৯৮৩১৭৪৪০৪২), হোটেল কৌশল্যা হেরিটেজ (যোগাযোগ ৯৮৩০৬৩৪৫৪১) প্রভৃতি।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here