শ্রয়ণ সেন:

কেভেন্টার্সের ছাদে বসে পেট ভরে প্রাতরাশ করে নিলাম। ম্যালে হাঁটার আগে এই পেট ভরিয়ে নেওয়াটা খুব দরকার ছিল। এ বার যত খুশি ঘোরা যেতে পারে। পেটে ছুঁচোয় ডন মারার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।

গতকাল এসেছি দার্জিলিং-এ। পনেরো দিন ধরে উত্তরবঙ্গে ঘুরব, আর দার্জিলিং আসব না, এটা কোনো মতেই চলতে পারে না।

বাঙালির প্রিয় ‘দিপুদা’। হুট বলতে যেমন দিঘা, পুরী চলে যাওয়া যায়, ঠিক তেমনই চলে যাওয়া যায় দার্জিলিংও। কিন্তু আমাদের এই দার্জিলিঙে আসতে লেগে গেল দু’দশক। কুড়ি বছর আগে শেষ বার এখানে এসেছিলাম।

চার মাস আগেই দার্জিলিঙের হোটেল সব বুক্‌ড। টুরিস্ট লজ তো কোন ছাড়, জায়গা মেলেনি ম্যালের আশেপাশের একটা হোটেলেও। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ম্যালের তিন কিলোমিটার আগে ডালি মনেস্ট্রির কাছে একটা হোমস্টে পাওয়া গেল। শহর থেকে কিছুটা দূরে হলেও, জায়গাটা অনবদ্য। ঘর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে কোনো বাধা নেই, তবে আকাশকে পরিষ্কার থাকতে হবে, যেটা দার্জিলিঙের  পক্ষে খুবই দুষ্কর।

গতকাল বিকেলে এক বার ম্যালে ঘুরেছি, কিন্তু সে ভাবে উপভোগ করা হয়নি। তাই আজ সক্কাল হতে না হতেই ম্যালের উদ্দেশে।

শহরের এক কথায় প্রাণকেন্দ্র এই ম্যাল। এক দিকে পাহারা দিচ্ছেন নেপালি কবি ভানুভক্ত, উলটো দিকে মনের আনন্দে খেয়ে যাচ্ছে পায়রার দল। তারই মধ্যে ঘোরাঘুরি করছে মানুষজন। কেউ হাঁটছে, কেউ বা বসে আড্ডা দিচ্ছে। আর ছোটোদের ঘোড়ায় ওঠার আনন্দ তো আছেই।

অবজারভেটরি হিলকে পাশে রেখে হাঁটতে শুরু করলাম। সিঁড়ি ভেঙে ওঠা যায় মহাকাল মন্দিরে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে ম্যালের ধারে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতেই সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু আজ কোনো ভাবেই কাঞ্চনজঙ্ঘার মুড নেই আমাদের দর্শন দেওয়ার। হাঁটতে হাঁটতে, রাজভবনকে ডান দিকে রেখে ফিরে এলাম ম্যালের প্রধান এলাকায়। কেনাকাটা চলল কিছুক্ষণ।

দু’টো দিন পেরিয়ে গেল দার্জিলিঙে। আজই দার্জিলিঙে আমাদের শেষ দিন। কাঞ্চনজঙ্ঘার মুডটাও আজ অনেক ভালো। সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলের পর্দা সরাতেই চোখে পড়ল শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গকে। যতই ঝান্ডিতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখি, দার্জিলিঙে তাকে না দেখলে ঠিক মনটা ভরে না। আজ তার মন খুব ভালো। আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে হাসছে। যাই হোক, হোটেলে ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য, শৈল শহরের দ্রষ্টব্য স্থান দর্শন।

দার্জিলিঙের দু’টি প্রধান দ্রষ্টব্য স্থান, পদ্মজা নাইড়ু জুলজিক্যাল পার্ক এবং হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট। প্রবেশফটক একটাই। একটা টিকিটেই দু’টি জায়গা দেখে নেওয়া যায়।

ভারতের উচ্চতম চিড়িয়াখানাগুলির মধ্যে এই পদ্মজা নাইড়ু জুলজিক্যাল পার্কই সব থেকে বড়ো। চিড়িয়াখানা চত্বরের মধ্যেই রয়েছে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (এইচএমআই)। এমন ভাবে পথ নির্দেশনা করা হয়েছে যাতে পর্যটকরা চিড়িয়াখানার একটা দিক দেখতে দেখতে চলে যাবেন এইচএমআইয়ে, আবার ফেরার সময় চিড়িয়াখানার অন্য একটা দিক দেখতে দেখতে ফিরবেন।

চিড়িয়াখানার কথায় আসা যাক। হিমালয়ান প্রাণীদের ব্যাপারে গবেষণা এবং সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৯৫৮ সালে বার্চ হিলে এই চিড়িয়াখানাটি তৈরি হয়। শীত প্রদেশের চিড়িয়াখানা। তাই মূলত শীতের প্রাণীদের বাস এখানে। চিড়িয়াখানার বিশেষ বাসিন্দা রেড পান্ডা। একটু যেন লাজুক প্রকৃতির। কিছুতেই আমাদের সামনে আসতে চায় না। ক্যামেরায় ধরার জন্য কয়েক সেকেন্ড থিতু হয়ে বসে আবার পালিয়ে গেল।

ভাল্লুক বাবাজির অবশ্য এ রকম কোনো সমস্যাই নেই। পর্যটকদের দিকে তাকিয়ে দারুণ পোজ মেরেছে সে। ঘ্যাটাঘ্যাট ঘ্যাটাঘ্যাট ক্যামেরার শাটার টেপার আওয়াজ শুরু হয়ে গেল। বাঘ, চিতা বাঘ, স্নো-লেপার্ডদের পাশ কাটিয়ে পৌঁছে গেলাম তেনজিং নোর্গে স্মৃতি বিজড়িত এইচএমআইয়ে।

এখানকার আত্মায় রয়েছেন তেনজিং, হাওয়ায় রয়েছেন তেনজিং, গাছগাছালিতে রয়েছেন তেনজিং। ১৯৫৩ সালে তাঁর এবং হিলারির এভারেস্ট জয়ের পর স্বাভাবিক ভাবেই এই অঞ্চলে পর্বতারোহণের ব্যাপারে আগ্রহ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। সেই আগ্রহকে সম্মান দিয়েই তার এক বছরের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় এইচএমআই। ১৯৫৪-এর ৪ নভেম্বর এর উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। এখানকার প্রথম ডিরেক্টর হন তেনজিং। প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ। রয়েছে একটি সংগ্রহশালা, ট্রেকিংপ্রেমীদের কাছে যা স্বপ্নের মতো। এভারেস্ট নিয়ে যাবতীয় কৌতূহল এখানেই মিটে যাবে, শুধু প্রয়োজন ধৈর্য ধরে অনেক সময় দিয়ে সংগ্রহশালাটি দেখা। ১৯৮৬-তে মৃত্যুর পর এখানেই সমাধিস্থ হয়েছিলেন তেনজিং। তাঁর সমাধিকে প্রণাম করে বেরিয়ে পড়লাম বাকি দ্রষ্টব্যগুলি দেখতে।     

লোয়ার কার্ট রোড দিয়ে এগিয়ে গেলাম। বাঁ দিকে পড়ল তেনজিং রক। উঠতি পর্বতারোহীদের প্রশিক্ষণ চলছে এখানে। এগিয়ে গেলাম। পৌঁছোলাম ‘হ্যাপি ভ্যালি টি-এস্টেট’। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেছে এই চা-বাগান। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, এই চা-বাগান দেখে কিছুটা হতাশই হলাম। বাগানের অধিকাংশই ফাঁকা।

তবে চা বাগানের হতাশা কাটিয়ে দিল দার্জিলিঙের দ্রষ্টব্য স্থানগুলির মধ্যে নবতম সংযোজন। জাপানি পিস প্যাগোডা। জলাপাহাড়ে অবস্থিত এই প্যাগোডা। ১৯৯২ সালে সাধারণ মানুষের দর্শনের জন্য খুলে দেওয়া হয় এই প্যাগোডা। এখানে মৈত্রেয় অবতার-সহ বুদ্ধের চার অবতারই শোভা পাচ্ছেন। শহর থেকে বেশ কিছুটা ওপরে, সেই সঙ্গে হঠাৎ করেই হাজির হয়েছে এক রাশ মেঘ। সব মিলিয়ে দার্জিলিঙের থেকে ঠান্ডা কিঞ্চিৎ বেশিই এখানে।

এই মেঘই পরের দিন টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয়ের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াল। টাইগার হিলে যত আগে পৌঁছোনো যায় তত হাঁটতে কম হয়। তাই ভোর সাড়ে তিনটেই চলে এসেছি এখানে। টাইগার হিলের মাথায় জিটিএ-এর তত্ত্বাবধানে একটা স্থায়ী ভিউ পয়েন্ট তৈরি হচ্ছে। আমরা যখন পৌঁছোলাম তখনও বেশি পর্যটক আসেনি। একটা জায়গায় বসে পড়লাম। ধীরে ধীরে ভিড় ক্রমশ বাড়তে লাগল। ভোর সাড়ে চারটে থেকে শুরু হল আকাশের রঙ বদলের খেলা। কিন্তু মেঘের জন্য ভালো করে উপভোগ করা যায়নি। মেঘের আড়ালে কখন যে সূর্য উঠে গেল, সেটাও বোঝা গেল না। টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং এভারেস্টকে এক সঙ্গে দেখা যায়। কিন্তু মেঘের জন্য কিছুই দেখা যায়নি। কিছুটা হতাশ হয়েই টাইগার হিল ছাড়লাম।

এখানকার স্থানীয় চালকদের টাইগার হিল প্যাকেজের সঙ্গেই দেখিয়ে দেওয়া হয় বাতাসিয়া লুপ। আমরাও তাই টাইগার হিল থেকে এলাম বাতাসিয়া লুপে। ঘুম আর দার্জিলিঙের খাড়াইটা কমানোর জন্য এখানে গোল করে ঘুরেছে টয় ট্রেনের পথ। এখানেই রয়েছে ‘গোর্খা ওয়ার মেমোরিয়াল’। এখানকার আকর্ষণ অবশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিন্তু যথারীতি মেঘের কারণে কিছুই বোঝা গেল না। বাতাসিয়া লুপের প্রকৃত রূপ বুঝতে গেলে টয় ট্রেনে আসাই সব থেকে ভালো।

আজ মনটা একটু খারাপ। তিন দিন ধরে অনেক কিছুই দেখলাম দার্জিলিঙে। আবার বাকি রইল অনেক কিছুই। তবে এই তিন দিনে দার্জিলিং আমার এক্কেবারে মনের ভেতরে বসে গিয়েছে। আর কুড়ি বছর নয়, সুযোগ পেলে অদূর ভবিষ্যতেই আবার আসব এখানে। পাহাড়ের রানিকে এই আশ্বাস দিয়েই নেমে চললাম শিলিগুড়ির দিকে।    

আরও পড়ুন: উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৯/ ঝান্ডির আঙিনায়

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে উত্তরবঙ্গগামী যে কোনো ট্রেনে পৌঁছে যান নিউ জলপাইগুড়ি। এখান থেকে দার্জিলিঙের দূরত্ব ৭১ কিমি। গাড়িতে যাওয়া যেতে পারে। বাসেও যেতে পারেন। শিলিগুড়ির তেনজিং নোর্গে বাসস্ট্যান্ড থেকে দার্জিলিঙের উদ্দেশে নিয়মিত বাস ছাড়ছে। হাতে যদি সময় থাকে তা হলে টয় ট্রেনে চড়ার মজা নিতে পারেন। এনজেপি থেকে প্রতি সোম, বুধ এবং শুক্রবার একটাই ট্রেন দার্জিলিং যায়। সকাল সাড়ে আটটায় ছেড়ে, দার্জিলিং পৌঁছোয় বিকেল ৩:৩৫-এ।

কোথায় থাকবেন

দার্জিলিঙে থাকার জায়গার কোনো অভাব নেই। নানা দামের, নানা মানের হোটেল রয়েছে শহর জুড়ে। ঘুম থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত হিল কার্ট রোড বরাবরও রয়েছে অনেক হোটেল এবং হোমস্টে। ম্যাল থেকে দূরে হলেও, কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনে তাদের কোনো তুলনা নেই। ম্যাল থেকে কিছুটা ওপরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের দার্জিলিং টুরিস্ট লজ। অনলাইনে বুক করতে পারেন: www.wbtdc.gov.in। ছবি: লেখক   

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন