sambhu

 

শম্ভু সেন

এখানেই দেখা পেয়ে গেলাম কপালকুণ্ডলার।

পায়ে পায়ে কলি-ফেরানো মন্দিরের দিকে হাঁটতেই ওরা ঘিরে ধরল আমাদের। ওদের  লিডার বলল, “ওটা কপালকুণ্ডলা মন্দির নয়, মন্দির গাঁয়ের ভেতরে। চলো, নিয়ে যাই”।

“পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ ?” এ কথা বলে কপালকুণ্ডলা কি এ ভাবেই নিয়ে গেছিল নবকুমারকে ?

ও দিকে নতুন সাজে সেজে ওঠা মন্দিরের চাতালে দাঁড়িয়ে পুরোহিতমশাই হাতছানি দিয়ে ডাকছেন।

ওদের টানাপোড়েনে আমরা আতান্তরে।

এক যুগ আগে আমরা এখানে এসেছিলাম। এক যুগ মানে ১২ বছরই। আমরা মানে সেই পাঁচ জনই। ফের কপালকুণ্ডলার গাঁয়ে। এ যেন সেই ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘ইয়ারো আনভিজিটেড, ইয়ারো ভিজিটেড, ইয়ারো রিভিজিটেড’-এর মতো।  

doriyapur-3 

এক যুগ আগে কাঁথি থেকে দরিয়াপুর আসার যে পথ ছিল তার অনেকটাই ছিল বাঁধ বরাবর কাঁচা রাস্তা। গাড়িতেই এসেছিলাম। হঠাৎই বাঁধের ধারে নির্জন মাঠের মাঝে পেয়েছিলাম এক ভাঙা মন্দির। বাঁধের পথে গাড়ি দাঁড় করিয়ে চলে এসেছিলাম সেই ভাঙা মন্দিরে। মন্দিরের দশা এতই জরাজীর্ণ ছিল যে ভিতরে ঢোকা যায়নি। কে যেন বলেছিল এই সেই কপালকুণ্ডলার মন্দির।

অনেক পালটে গেছে এই দরিয়াপুর। বাঁধ বরাবর রাস্তা এখন পাকা এবং মসৃণ। চা ও টুকিটাকি খাবারের দোকান তৈরি হয়েছে। মূল সড়ক থেকে দু’টি পিচ-পথ বেরিয়েছে, একটি গেছে গাঁয়ের ভিতর, আরেকটি নব কলেবর ধারণ করা মন্দির পর্যন্ত। তৈরি হয়েছে বঙ্কিম-স্মারক। এই দরিয়াপুরকে দেখেই ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের কাহিনিটি মাথায় আসে সাহিত্যসম্রাটের। তার জন্য তাঁকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়েছে।    

খুশির তুফান তুলে হুল্লোড়ে মেতেছে এক দঙ্গল কচিকাঁচা। এই গাঁয়ে টুরিস্টদের পদচিহ্ন যে নিয়মিত পড়ে, আজকের দিনটাই তার প্রমাণ। এই ঘামঝরানো সকালে আমরা ছাড়াও এই মুহূর্তে আরও দু’টি গাড়ি টুরিস্ট নিয়ে এসেছে। এবং কচিকাঁচার দল আমাদের দেখে আদৌ বিস্মিত নয়, শহুরে মানুষজন দেখলে যে স্বাভাবিক বিস্ময় দেখা যায় গাঁয়ের শিশুদের চোখেমুখে, হাবেভাবে। দরিয়াপুরের শিশুরা রীতিমতো সপ্রতিভ। তারাই গাইড করছে টুরিস্টদের। তাদের লিডার সব সময়েই অগ্রবর্তিনী।  

doriyapur-1

আপাতত ওদের ডাক এড়িয়ে সাড়া দিলাম পুরোহিতমশাইয়ের হাতছানিতে। এক যুগ আগে এই সদাশিব মন্দিরকেই জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখেছিলাম। দেখে বুঝেছিলাম, অবিলম্বে এই মন্দিরের সংস্কার না হলে জায়গাটার আকর্ষণ অনেকটাই কমে যাবে। যাক, মানুষের শুভবুদ্ধি এই মন্দিরকে রক্ষা করেছে।

গর্ভগৃহে ডেকে নিয়ে গেলেন তিনি — তপনকুমার পরিহারী তথা দেবশর্মা। ষাটোর্ধ মানুষটি কথাবার্তায় স্মার্ট, গলায় রুদ্রাক্ষের মালাটি তাঁর বাড়তি আকর্ষণ। প্রথমেই জানিয়ে দিলেন পরিহারী পদবিটি ওড়িশার। এই অঞ্চল আগে ছিল ওড়িশার। কবে কী ভাবে এই বাংলায় এল তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস শুনিয়ে দিলেন তপনবাবু। এবং কচিকাঁচাদের কথায় সায় দিয়ে জানালেন, এই সদাশিব মন্দির কপালকুণ্ডলা মন্দির নয়। কপালকুণ্ডলা মন্দির মা কালীর। সেটি গাঁয়ের ভিতরেই ছিল। আগে তো এখানে বসতি ছিল না, ছিল জঙ্গল, ছিলেন কাপালিক, ছিল তাঁর পর্ণকুটির, ছিল তরুণী  কপালকুণ্ডলা, ছিল হাড়িকাঠ, ছিল খড়গ। নরবলি নিষিদ্ধ হওয়ার পর ব্রিটিশরা সেই অস্ত্র নিয়ে চলে যায়। হাড়িকাঠ কালের প্রভাবেই ধ্বংস হয়। জঙ্গলে এই সদাশিব মন্দিরও ছিল। কাপালিক এখানে নিয়মিত আসতেন। এখানকার লিঙ্গ স্বয়ম্ভু।

অনেকেই বলেন, কপালকুণ্ডলার কাহিনি কল্পকাহিনি। কাঁথির ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থাকার সময় প্রায়ই ঘোড়া ছুটিয়ে আসতেন বঙ্কিমবাবু। জায়গাটি তাঁর মনে ধরে। এই গ্রামকে পটভূমি করেই তিনি ‘কপালকুণ্ডলা’ লেখেন। কলকাতার প্রখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা দেজ পাবলিশিং-এর প্রাক্তন কর্মী তপনবাবু কিন্তু কপালকুণ্ডলার কাহিনিকে পুরোপুরি ফিকশন বলে উড়িয়ে দিতে নারাজ। তাঁর মতে, উপন্যাসে কল্পকাহিনি তো থাকবেই। কিন্তু কাপালিক, কপালকুণ্ডলা, নবকুমার সব ঐতিহাসিক চরিত্র। তপনবাবু এ-ও জানালেন, দরিয়াপুর লাইটহাউসে উঠে দক্ষিণ দিকে ঠাহর করলে কোথায় নবকুমারদের নৌকা ভিড়েছিল তা নাকি বোঝা যায়। লাইটহাউসটি কাছেই।

doriyapur-2

এ বার ‘কপালকুণ্ডলার’ হাতে ধরা পড়ার পালা। ও অপেক্ষা করে রয়েছে, আমাদের গাঁয়ের ভিতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তপনবাবুও জানিয়ে দিয়েছেন, মিনিটখানেক হেঁটে গেলেই মিলবে সেই জায়গা, যেখানে এক সময় সব কিছু ছিল। কচিকাঁচাদের এই লিডারটি শ্যামাঙ্গী, ক্ষীণাঙ্গী, মিষ্টি মুখে যেন খই ফুটছে।

— “তোমরা দাঁড়াও, আমি আসছি” — ছুট দিয়ে সে কোথায় গেল, কয়েক মুহূর্ত পরেই ফিরে এল –- “চলো”।

নাম কী ?

স্বাগতা।

আজ স্কুল নেই ?

গরমের ছুটি চলছে তো।

সামনে এগিয়ে স্বাগতা। তার আশেপাশে আমরা পাঁচ। আমাদের পিছনে লিডারের অনুগামীরা।

অল্প পথ। স্বাগতা পৌঁছে দিল এক মন্দির চত্বরে। গেট ঠেলে ঢুকলাম। দেখেই বুঝলাম, এই মন্দির খুব প্রাচীন নয়। যদিও এর সংস্কার হয়েছে অতি সম্প্রতি। গর্ভগৃহের নতুন দরজা। বন্ধ ছিল। খুলে দিলেন এক বৃদ্ধ, সেখানে কোনও বিগ্রহ নেই। হয়তো এখানেই ছিল সেই কালী মন্দির, আশেপাশেই কোথাও ছিল কাপালিকের কুটির। হয়তো সত্যিই কোথাও ছিল সেই হাড়কাট, যেখানে নবকুমারকে বলি দিতে উদ্যত হয়েছিল কাপালিক। আর না থাকলেই বা কী ? বাস্তবে এ সবের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেই বিতর্কে গিয়ে কি লাভ ? এই গ্রামই যে বঙ্কিমের অমর সৃষ্টি ‘কপালকুণ্ডলা’র পটভূমি তাতে তো সন্দেহ নেই। দরিয়াপুরের নাম তো তাঁর উপন্যাসেই আছে।

গাড়ির কাছে পৌঁছে দিয়ে গেল স্বাগতারা। ওদের গাইডগিরির মুল্য কিছু দেব না ? লজেন্সের প্যাকেটটা ধরিয়ে দিতেই লিডার গুনে গুনে ভাগ করে দিতে থাকল বন্ধুদের মধ্যে। অবাক হয়ে দেখলাম, এক অদ্ভুত শৃঙ্খলায় তারা লিডারের অনুগামী।

 

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে ট্রেনে দিঘার পথে কাঁথি। সেখান থেকে জুনপুট-বাঁকিপুট হয়ে দরিয়াপুর ১৫ কিলোমিটার। স্টেশন থেকে শেয়ার ট্রেকারে যাওয়া যায়। দু’ ভাগেও যেতে হতে পারে। কাঁথি স্টেশন থেকে শেয়ার ট্রেকারে জুনপুট, আবার সেখান থেকে শেয়ার ট্রেকারে বাঁকিপুট হয়ে দরিয়াপুর। ভালো হয় স্টেশন থেকে যদি গাড়ি ভাড়া করে চলে যাওয়া যায়। কলকাতা-হাওড়া থেকে বাসেও যাওয়া যায় কাঁথি।     

কোথায় থাকবেন

দরিয়াপুরের কাছে থাকার সব চেয়ে ভালো জায়গা বাঁকিপুটের ঝিনুক রেসিডেন্সি। যোগাযোগ সোমনাথ বসু ০৯৯৩২৬৭৭২৫৮। অথবা tajpurnaturecamp.com ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজের ই-মেল দিয়ে ‘submit’ করলে জবাব পাবেন।

তা ছাড়া কাঁথিতে বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল আছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here