wrivuশ্রয়ণ সেন:

বাঁধের ওপর বসে ‘বাঁধ ভাঙা’ উপভোগ করছি।

না কোনো হেঁয়ালি নয়। আসলে বসে রয়েছি জয়ন্তি নদীর ধারে উঁচু বাঁধটার ওপর। আর উপভোগ করছি চাঁদের হাসির বাঁধ ভাঙা। প্রাক-পূর্ণিমার চাঁদ এখন আকাশে। তার আলোয় চারিদিক আলোকিত হয়ে রয়েছে। কানে আসছে ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীটির মিষ্টি একটা গর্জন।

অথচ দিনটা শুরু হয়েছিল বেশ বিশ্রি ভাবেই। আবহাওয়াই আমাদের ভ্রমণের সমস্ত আনন্দ মাটি করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সবে শেষ হয়েছে পুজো, কিন্তু বৃষ্টির কোনো বিরাম নেই। বেশ কয়েক দিন ধরেই প্রবল বৃষ্টি চলছে উত্তরবঙ্গ জুড়ে। সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই গতকাল এনজেপিতে নেমে সোজা চলে এসেছি মালবাজার। আজ সকালে মালবাজার থেকে শুরু হয়েছে আমাদের উত্তরবঙ্গ ভ্রমণ। প্রথম গন্তব্য বক্সা হয়ে জয়ন্তি।

ছোট্টবেলায় শেষ বার এসেছিলাম এই উত্তরবঙ্গ। দীর্ঘ বাইশ বছর পর আবার আসা। আমি যেন ক্রমশ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যেই জাতীয় সড়ক দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। বাঁ দিকে চোখে পড়ছে মেঘে ঢাকা হিমালয়ের শ্রেণি। কখনও চা বাগান তো কখনও গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।

চালসা, হাসিমারা, হামিল্টনগঞ্জ হয়ে এসে পৌঁছলাম রাজাভাতখাওয়ায়। এখান থেকে ডান দিকে রাস্তা চলে যাচ্ছে আলিপুরদুয়ার। বন দফতরের অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলাম বাঁ দিকে অর্থাৎ বক্সা টাইগার রিজার্ভে। এই বক্সা টাইগার রিজার্ভের শেষ প্রান্তে অবস্থিত বক্সা দুর্গ। তবে পুরোটা গাড়ি যায় না, শেষ আড়াই কিলোমিটার হেঁটে উঠতে হয়। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতেই একটা তিন রাস্তার মোড়। ডান দিকের রাস্তা চলে যাচ্ছে জয়ন্তির দিকে। বক্সা দেখে ফিরে এসে আমরা এই পথেই যাব।

পৌঁছলাম সান্তালাবাড়ি। শান্ত ছিমছাম গ্রাম। অধিকাংশ গ্রামবাসীই নেপালিভাষী। এখান থেকে চার কিমি বক্সা দুর্গ। গাড়ি যাবে দেড় কিমি দূরে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত। কিন্তু গাইড ছাড়া গাড়িকে যেতে দেওয়া হয় না। পুরো দুর্গ পর্যন্ত যেতে হলে গাইড চার্জ একটু বেশি, নইলে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত চার্জ কিছুটা কম। দুর্গ পর্যন্ত যাওয়া আমাদের সম্ভব নয়। তাই বছর পনেরোর গাইড রুদ্র থাপাকে সঙ্গী করে উঠে চললাম জিরো পয়েন্টের দিকে। উঠে পড়লাম বক্সা পাহাড়ের কোলে।

UB-2
 বক্সা ভিউ পয়েন্টের পথে

জিরো পয়েন্টে গাড়ির ইতি। এখান থেকে কিছুটা হেঁটে যেতে হয় ভিউ পয়েন্ট। সেখান থেকে নাকি নীচের আলিপুরদুয়ার সমতলকে খুব সুন্দর দেখায়। পাথুরে, খাড়াই পথ ভেঙে উঠে চললাম গাইডের পথনির্দেশে। মিনিট কুড়ির খাড়াই, তার পরই এল একটা অসাধারণ জায়গা। এক দিকে পাহাড়,  আর এক দিকে সমতল। সমতলে বয়ে চলেছে তিনটে নদী। রুদ্র গাইডের পরিচয়ে জানতে পারলাম, সব থেকে বাঁ দিকে রয়েছে বালা নদী, মাঝখানে জয়ন্তি আর ডান দিকে বক্সা নদী।

কিছুটা সময় এখানে কাটিয়ে ফের নেমে চলা। বক্সা দুর্গ ভবিষ্যতে কখনও এসে দেখা যাবে।

বৃষ্টিও ধরে এসেছে, ইতিউতি উঁকি মারছে সূর্য। জয়ন্তির দিকে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি। বৃষ্টির মধ্যে উত্তরবঙ্গ আসব আর পথে কোনো বাধা পাব না, এ রকম তো হবে না। বাধা এলও তাই। পর পর দাঁড়িয়ে রয়েছে গাড়ি। কী ব্যাপার! বক্সা ভিউ পয়েন্ট থেকে যে বক্সা নদীটা দেখেছিলাম সেটা এখন আমাদের পেরোতে হবে। কিন্তু পেরোনোর কোনো উপায়ই যে নেই। এখানে একটা ব্রিজ ছিল, সেটা বর্ষায় নদীর বানে ভেঙে গেছে। এখন তাই নদীর ওপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে যাওয়ার উপায় নেই।

UB-3
 জল নামার অপেক্ষায়

আমাদের সারথি বললেন, পাহাড়ে প্রচুর বৃষ্টির ফলে নদীর জল বেড়ে গেছে। না কমলে যাওয়া যাবে না।

—“এখন আমাদের কী করণীয়?”

—“এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব। জল কমলে এগোব।”

জল কমবে? আমাদের প্রশ্ন শুনে সারথি আশ্বস্ত করলেন বৃষ্টি যে হেতু থেমে গিয়েছে তাই একটু পরেই জল কমে যাবে। কিছু করার নেই, তাই নদীর ধারেই সময় কাটাতে লাগলাম। হঠাৎ সারথির চিৎকার, “তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠুন। জল কমে গিয়েছে, এগোব।”

সত্যি বলছি, আধঘণ্টা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকলাম, কিন্তু জল যে কমেছে সেটা আদৌ বুঝতে পারেনি। ওঁরা স্থানীয় যুবক, সব বুঝতে পারেন। যাই হোক, নদী পেরল আমাদের গাড়ি।

পৌঁছলাম জয়ন্তি। বলাই যায় উত্তরবঙ্গের একটি রত্ন এই জয়ন্তি। নদীর এক দিকে সমতল, নদীর ওপারে উত্তুঙ্গ হিমালয়। এখান থেকে কিছু দ্রষ্টব্য স্থানে যাওয়া যায়। পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ঘণ্টা দেড়েকের ট্রেক করে যাওয়া যায় পবিত্র মহাকাল মন্দিরে। এই গুহামন্দিরে পূজিত হন মহাদেব। যাওয়া যেতে পারে পোখরি। এখান থেকে ৪ কিমি হাঁটা। সেখানে রয়েছে একটি পুকুর। স্থানীয় এবং ভুটানিরা এই পুকুরকে খুব পবিত্র মনে করেন। করা যেতে পারে ফরেস্ট সাফারিও। তবে জয়ন্তিতে ফরেস্ট সাফারিতে বন্য জন্তু দেখার সম্ভাবনা কম। বরং নানা রকমের পাখির দেখা মিলতে পারে।  

ub1
 জয়ন্তিতে আমাদের আবাস

আমরা অবশ্য কোথাও না গিয়ে বাকি দিনটা বিশ্রামের জন্যই রেখে দিলাম। হোটেলের বারান্দায় বসে পাহাড়ের চূড়ায় চোখ রাখছি, আর ক্রমশ মোহিত হচ্ছি। বিকেল নাগাদ বাঁধের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম জয়ন্তি নদীর এক্কেবারে ধারে। আমাদের চোখে নদীর জল বেশ কম, তবে স্থানীয়দের মতে মাঝ অক্টোবরে এই জলটাও নাকি জয়ন্তি নদীতে থাকে না। গত দেড় দিনের বৃষ্টি বেমালুম উধাও, পরিষ্কার আকাশে সূর্যাস্তের প্রস্তুতি চলছে এক দিকে, অন্য দিকে চাঁদ উঠছে।

আজ দ্বাদশী। দেবীদুর্গা বিসর্জনের দিন এখানে। আশেপাশের গ্রাম থেকে আসতে শুরু করেছে একের পর এক দুর্গাপ্রতিমা। দেবী বরণ করে গালে সিঁদুর মেখে আসছেন বঙ্গললনারা। ঢাকের তালে কোমর দোলাচ্ছেন যুবক-যুবতীরা। জয়ন্তি নদীতে নিরঞ্জন হচ্ছে একের পর প্রতিমা আর গর্জন উঠছে—

‘আসছে বছর আবার হবে’।   

UB-4
 বিকেলের জয়ন্তি নদী

কী ভাবে যাবেন

বক্সা-জয়ন্তি যাওয়ার সব থেকে সহজ উপায় হল ট্রেনে নিউ আলিপুরদুয়ার। শিয়ালদহ থেকে নিউ আলিপুরদুয়ার যাওয়ার সব থেকে ভালো ট্রেন হল ১২৩৭৭ আপ পদাতিক এক্সপ্রেস। এ ছাড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস, তিস্তাতোর্সা এক্সপ্রেস, কামরূপ এক্সপ্রেস, সরাইঘাট এক্সপ্রেসেও পৌঁছে যাওয়া যায় নিউ আলিপুরদুয়ার। দিল্লি থেকে ডিব্রুগড় রাজধানী অথবা ব্রহ্মপুত্র মেলেও আসা যায় নিউ আলিপুরদুয়ার। বেঙ্গালুরু থেকে গুয়াহাটিগামী যে কোনো ট্রেন নিউ আলিপুরদুয়ার ছুঁয়ে যায়। মুম্বই থেকেও গুয়াহাটিগামী ট্রেনে পৌঁছতে পারেন নিউ আলিপুরদুয়ার। নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে গাড়ি থেকে পৌঁছে যেতে পারেন বক্সা বা জয়ন্তি। বক্সার দুরত্ব ১৯ কিমি, জয়ন্তির দুরত্ব ৩০ কিমি। এ ছাড়া যে কোনো ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি নেমে সেখান থেকেও গাড়িতে আসা যায় বক্সা-জয়ন্তি। এ ছাড়া কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ পরিবহণ নিগমের বাসে যাওয়া যেতে পারে আলিপুরদুয়ার।       

কোথায় থাকবেন

জয়ন্তিতে থাকার জন্য রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের টুরিস্ট লজ। অনলাইনে বুক করতে পারেন, www.wbtdc.gov.in। এ ছাড়াও জয়ন্তি নদীর ধারে বাঁধ বরাবর রয়েছে অসংখ্য বেসরকারি হোটেল। বক্সায় থাকার জন্য রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের ‘বক্সা জঙ্গল লজ’। রয়েছে বেশ কয়েকটি বেসরকারি রিসোর্ট।

প্রয়োজনীয় তথ্য

বক্সা টাইগার রিজার্ভে প্রবেশ করতে গেলে প্রবেশ মূল্য দিতে হবে । সান্তালাবাড়ি থেকে বক্সা ফোর্টের দিকে যেতে গেলে গাইড লাগবেই। বক্সা ফোর্ট গেলে গাইড চার্জ ২৭০ টাকা, জিরো পয়েন্ট তথা ভিউ পয়েন্ট গেলে গাইড চার্জ কিছুটা কম, ২৩০ টাকা। জয়ন্তিতে প্রবেশ করতে গেলে বক্সা টাইগার রিজার্ভে প্রবেশ করার টিকিট দেখালে তবে প্রবেশাধিকার মেলে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here