উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৯/ ঝান্ডির আঙিনায়

2
593

শ্রয়ণ সেন:

পাশের কটেজের ছোট্টো একটা হট্টগোলে ঘুমটা গেল ভেঙে। ঘড়িতে তখন সাড়ে চারটে, ভোর নয়, বিকেল।

আসলে বরেলি মাছ সহযোগে গরম ভাত। দুপুরের খাওয়াটা বেশ জম্পেশ হয়েছিল। বরেলি উত্তরবঙ্গের মাছ, এই তথ্যটা জানা ছিল। কিন্তু এ বার ভ্রমণ শুরুর থেকে এক দিনও সেই মাছ চেখে দেখার সুযোগ হয়নি। সুযোগটা এসে গেল এখানে এসেই। দুর্দান্ত রেঁধেও ছিলেন এখানকার রাঁধুনি। এরই প্রভাবই লম্বা ভাতঘুম, যার ফলে অসাধারণ একটা মুহূর্ত থেকে বঞ্চিতই হয়ে যেতাম হয়তো।

যাই হোক, তড়িঘড়ি বিছানা থেকে উঠে ব্যালকনিতে এলাম। সামনে সুবিশাল, শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা। বিকেলের পড়ন্ত রোদের লাল আভা তার গায়ে। সেই লাল আভা দিয়েই দিনের মতো পাততাড়ি গোটালেন সূর্যদেব।

ঝান্ডি ইকো হাটস।

উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে পাহাড়-যাত্রা শুরু হল আমাদের। বন্ধুর মারফত সন্ধান পেয়েছিলাম এই জায়গাটার। উত্তরবঙ্গের আর পাঁচটা পাহাড়ি গ্রামের মতো এখানকারও বিশেষ আকর্ষণ কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন। তবুও অন্য সব জায়গার থেকে এ-ই আমাদের একটু বেশি টেনেছিল। বিশেষ করে তাদের ওয়েবসাইটে যখন এখানকার ইকো হাটের ছবিগুলো দেখেছিলাম। কিন্তু ওয়েবসাইট দেখা ছবি আর বাস্তবের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে তো? জায়গাটা সত্যি ভালো লাগবে তো? এই সব সন্দেহ এক লহমায় দূরে চলে গেল এখানে পৌঁছোতেই। বুঝতে পারলাম, ওয়েবসাইটে যা দেখেছি তার থেকে আরও কয়েক গুণ সুন্দর এই ঝান্ডি ইকো হাট্‌স।

গরুবাথান থেকে লাভার দিকে কিলোমিটার খানেক এগোলেই বাঁ দিকে ঝান্ডি ইকো হাট্‌সের দিক নির্দেশনা দেখতে পাওয়া যায়। সেই পথ ধরলাম আমরা। চেল নদী পেরিয়ে পথ ক্রমশ উঠে গিয়েছে পাহাড়ে। অদ্ভুত একটা সৌন্দর্য এই পথটার। এক দিকে দুর্গম পাহাড়, উলটো দিকেই জলপাইগুড়ির সমতল।

পরের পর হেয়ারপিন বেন্ড পেরিয়ে উঠে চলেছে আমাদের গাড়ি। আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে। সমতলের গরমকে সরিয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব জায়গা করে নিচ্ছে। সবে বর্ষা গেছে, তাই রাস্তার অবস্থা বিশেষ ভালো নয়, কিন্তু খুব খারাপও নয়। একটা তিন রাস্তার মোড় এল। সামনের রাস্তাটা চলে গিয়েছে লাভা। আমরা ঘুরলাম বাঁ দিকে, যে রাস্তা শেষ হল এক্কেবারে ইকো হাট্‌সের প্রাঙ্গণে।

বুঝতে পারলাম একটা পাহাড়ের প্রায় টঙে আমরা। এখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কটেজগুলো। ঘরগুলো বেশ সুন্দর। কাঞ্চনজঙ্ঘা এখন মেঘে ঢাকা। কিন্তু বোঝা গেল, আকাশ পরিষ্কার হলেই উপভোগ করা যাবে তাকে। বিকেলে তো সেটাই হল।

ইকো হাটসের ভিউ পয়েন্ট থেকে উত্তরবঙ্গের সমতল।

সমুদ্রতল থেকে ছ’হাজার ফুটের কিছু বেশি উঁচুতে অবস্থিত ঝান্ডিদারা গ্রাম। সেই গ্রামটাকে আলো করে রেখেছে এই ঝান্ডি ইকো হাট্‌স। ইকো হাট্‌সের নিজস্ব একটা ভিউ পয়েন্ট আছে। সেখানে এসে বসলাম কিছুক্ষণ। এই ভিউ পয়েন্টটা এক কথায় অসাধারণ। সত্যি করে বলতে, এই ভিউ পয়েন্টাই ঝান্ডির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে। এক দিকে আদিগন্ত সমতল, এক দিকে দেখা যাচ্ছে লাভার বিখ্যাত মনেস্ট্রি। আবার আর অন্য এক দিকে তাকালে পুরো কালিম্পং শহর, আর কাঞ্চনজঙ্ঘা তো রয়েছেই। এই ভিউ পয়েন্টের আসল সৌন্দর্য অবশ্য প্রত্যক্ষ করলাম সন্ধ্যায়।

রোদ পড়তেই ঠান্ডা বেড়ে গেল কয়েক গুণ। এতদিন গরমে ঘোরাঘুরি করার পর অবশ্য এই ঠান্ডাটা বেশ উপভোগ করার মতোই। তাই ঘরের মধ্যে নিজেদের আটকে না রেখে, এসে বসলাম ওই ভিউ পয়েন্টে। সন্ধে নেমেছে, তাই পাহাড় আর সমতলে আলো জ্বলে উঠেছে।

টেক-অফ করার মুহূর্তে বিমানের ভেতর থেকে নীচের সমতলকে যেমন লাগে ঠিক, এখান থেকেও সামনের সমতলকে সে রকমই লাগছে। মালবাজার শহরকে তো বোঝা যাচ্ছেই, এমনকি অনেক দূরে আরও একটা আলোর সমাহার চোখে পড়ছে। সেটা নিশ্চয়ই শিলিগুড়ি। এ দিকে কালিম্পং-এর আলো যেমন ঝকমক করছে, তার পেছনের পাহাড়েই জ্বলে উঠেছে দার্জিলিং-এর আলো। চা-পকোড়ার সঙ্গে সেই মায়াবী দৃশ্য উপভোগ করতে করতে কোথা দিয়ে যে সন্ধেটা কেটে গেল খেয়ালই করিনি।

ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ ঘুম ভেঙে গেল। না, কোনো অ্যালার্মের সাহায্যে নয়। কাঞ্চনজঙ্ঘায় সূর্যোদয় দেখার লোভেই এত তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙল। কাছেই একটা সানরাইজ পয়েন্ট আছে। ঝান্ডিদারা সানরাইজ পয়েন্ট। আগের দিন ইকো হাটের রিসেপশনে বলে রাখলে এখানকার একজনকেই গাইড হিসেবে পেয়ে যাবেন। তবে আমরা সানরাইজ পয়েন্টে না গিয়ে আমাদের ব্যালকনিকে সানরাইজ পয়েন্ট বানিয়ে নিলাম।

দিনের প্রথম আলো কাঞ্চনজঙ্ঘায়। ইকো হাটস থেকে।

আসতে আসতে আলো ফুটছে। কাঞ্চনজঙ্ঘাকে বোঝা যাচ্ছে পরিষ্কার। একটু পরেই শুরু হয়ে গেল আলোর খেলা। মিনিটে মিনিটে রঙ পালটাতে শুরু করল কাঞ্চনজঙ্ঘা। শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গের চূড়ায় কমলা আভা দেখা দিল। অর্থাৎ পূবে সূর্য উঠেছে। ধীরে ধীরে সেই কমলা আভা ছড়িয়ে পড়ল পুরো শৃঙ্গে। আবার রঙ বদল। কমলা থেকে হলুদ এবং অবশেষে ধবধবে সাদা। সূর্যোদয়ের পর্ব সাঙ্গ হল। শুধু কি কাঞ্চনজঙ্ঘা? দেখা যাচ্ছে তার সঙ্গীসাথীদেরও। দূরে বরফ-জমা নাথুলা পাসও চিনিয়ে দিল কে এক জন।

মন্যাস্ট্রি থেকে লাভা শহর।

ঝান্ডি থেকে অনেক জায়গা ঘুরে আসা যায়। লাভা, লোলেগাঁও, চারখোল, কোলাখাম, কালিম্পং — আরও অনেক জায়গায়ই। সাইটসিয়িং-এর সমস্ত ব্যবস্থা এই ইকো হাট থেকেই করে দেওয়া হয়। ঝান্ডিতে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি, যে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু মত বদলে লাভা মন্যাস্ট্রিটা ঘুরে আসার পরিকল্পনা হল। ইকো হাটেই দুপুরের খাওয়া সেরে ঘুরে এলাম লাভা।

লাভা মন্যাস্ট্রি।

সমুদ্রতল থেকে সাত হাজার ফুটের কিছু বেশি উচ্চতায় অবস্থিত ছোট্টো পাহাড়ি শহর লাভা। পাইন-দেবদারুর জঙ্গলে ঘেরা। লাভার প্রধান আকর্ষণ তার মন্যাস্ট্রি। পাহাড়ি পথ ধরে কিছুটা হেঁটে পৌঁছোনো যায় মন্যাস্ট্রির ফটকে। মন্যাস্ট্রিদের জগতে একদমই তরুণ এটি, জন্ম ১৯৮৭ সালে, তবুও আর পাঁচটা মন্যাস্ট্রির মতোই এখানেও প্রবেশ করলে একটা অপার শান্তি ছুঁয়ে যায় মনকে। এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফের ফিরে চলা ইকো হাটের উদ্দেশে।

কী ভাবে যাবেন

মালবাজার থেকে ঝান্ডির দূরত্ব ৩২ কিমি। শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে পৌঁছোনো যায় নিউ মাল জংশন। স্টেশন থেকে গাড়ি পাওয়া যাবে ঝান্ডির জন্য। আগে থেকে ইকো হাটে বলে রাখলে তারাও গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে পারে।

কোথায় থাকবেন

দু’একটা হোমস্টে থাকলেও, এখানে থাকার সেরা ঠিকানা ‘ঝান্ডি ইকো হাট’। অনলাইনে বুকিং-এর ব্যবস্থা নেই। যোগাযোগ করুন এই নম্বরে: ০৯৪৩৪১১৬৩২৫। ওয়েবসাইট: www.jhandiecohut.com

আরও পড়ুন: উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ১ / বক্সা হয়ে জয়ন্তি 

উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ২/এক গন্ডা গন্ডার দর্শন 

উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৩/ খয়েরবাড়ির বাঘিনীরা 

উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৪/ যাত্রাপ্রসাদে যাত্রাপালা

উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৫/ জল্পেশ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা 

উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৬/ মূর্তির ধারে 

উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৭/ সামসিং, সান্তালেখোলা হয়ে রকি আইল্যান্ড 

উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৮/ সঙ্গী জলঢাকা

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

2 মন্তব্য

  1. আমাদের উওর বঙ্গ এত সুন্দর যে বিদেশের সৌন্দর্য্য থেকে কম কিছু নয়। এত আবিষ্কৃত অনাবিস্কৃত জায়গা রয়েছে যা অতুলনীয় । আর এর মুলে আছে কাঞ্নজঙ্ঘা ও তাকে ঘেরা জঙ্গল , বিভিন্ন নদী ও ডুয়ার্স অঞ্চল। উওর বঙ্গ ঘোরার পথিকৃত হয়ে থাকল এই ভ্রমন কাহানী ও পথনির্দেশনা।

    • উত্তরবঙ্গ সম্পর্কে আপনার এই মতামত আমি পূর্ণমাত্রায় সমর্থন করছি ।

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here