papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

দুর্গাপুজোর সময় থেকে ঢল নেমেছে ঘাটশিলায়। দোলপূর্ণিমাও পার হয়ে গিয়েছে। একই রকম মানুষের ভিড়। নববর্ষ পেরিয়ে গেল। এ বার গরম বাড়ছে, ভিড়ও কমছে। কিন্তু সন্ধে নামার পর থেকে মাঠে প্রান্তরে ধামসামাদলের তালে তালে অঙ্গ দুলে ওঠায় কোনো খামতি নেই। এ দৃশ্য প্রায় সব আরণ্যক স্থানেই। রুখাশুখা অঞ্চলের এই মিঠি সুর প্রাণে আনে সুধা-সঞ্জীবনী। প্রকৃতির কাছে এ ঋণ আমাদের মাথা নত করে স্বীকার করে নিতে হয়। একই সঙ্গে প্রকৃতিপথিকের নাম উচ্চারণের পাশাপাশি স্মরণ করি ঘাটশিলায় ‘গৌরীকুঞ্জ’-র কথা।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঘাটশিলায় কাটিয়েছিলেন জীবনের বেশ কিছু সময়। যে বাড়িতে কাটিয়েছিলেন সেটি প্রথমা স্ত্রী গৌরীর নামে নামকরণ করেন ‘গৌরীকুঞ্জ’। এত দিন অবহেলায় পড়েছিল সেই কুঞ্জ। ইদানীং সেই বাটী ঘাটশিলায় ক্রমেই বিখ্যাত হয়ে উঠছে। বিভূতিভূষণের স্মৃতিধন্য  সেই ‘গৌরীকুঞ্জ’ দেখতে ঘাটশিলায় ছুটে আসা।

gourikunja as it was a few years back
কী দশা ছিল বাড়ির, ছবিই তাঁর প্রমাণ।

এক সময়ে কী অবস্থায় ছিল এই বাড়িটি ছিল, তার কথা বিশদ জানালেন তাপস চট্টোপাধ্যায়। ছবিও দেখালেন। তাপসবাবুর বয়স তখন নিতান্তই কম। ছিল একটা গাড়িও। ট্যুর অরগানাইজ করতেন কয়েক জন মিলে। বাঙালি দেখলেই সাহিত্যিকের বাড়ি দেখানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে যেতেন ওঁরা। আবার অনেক পর্যটক নিজেদের উৎসাহে সেখানে যেতে চাইতেন। এই ভাবে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত চলল। বাড়ির ভগ্নদশা দেখে নিজেদেরও খুব খারাপ লাগত। বাড়িটা নিয়ে যে কিছু একটা করা দরকার, তা বুঝতে পারলেন তাপসবাবু। তৈরি করলেন ‘গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি’।

এলাকায় বিধায়ক হয়ে এলেন প্রদীপ বালমুচু। তাঁর কাছে আবেদন জানালেন তাপসবাবু-সহ ঘাটশিলার বিভূতি-অনুরাগীরা। তাঁরা চাইলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে কিছু করা হোক। আড়াই লাখ টাকা ধার্য হল ‘গৌরীকুঞ্জ’ সংস্কারের জন্য। পথ চলা শুরু নতুন উদ্যমে। বিভূতি-সদন সংস্কারের জন্য গোড়ার দিকে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার থেকে ইতিবাচক সম্মতি না মিললেও পরে সেই বাধা দূর হয়ে যায়। এবং আজকের রূপ পায়। ২০০৮-এর ২১ ফেব্রুয়ারি নব-রূপায়িত বাড়িটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিভূতি-পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও বৌমা মিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়।

sangskriti mancha
সংস্কৃতি মঞ্চ।

রেলপথের সমান্তরাল সুবর্ণরেখা, মাঝে রাজপথ। হঠাৎ পথ নেমেছে ঢাল বেয়ে, ‘অপুর পথ’, লালমাটির। পথ মিলেছে ‘গৌরীকুঞ্জে’। ১৭ ডেসিমিলের ওপরে এক দিকে তৈরি হয়েছে সংস্কৃতি মঞ্চ। ফটকের সামনে ভিটের তিনটি ঘরে বিভূতিভূষণের ব্যবহৃত জামাকাপড়, চিঠি, বইয়ের সম্ভার, দেওয়াল পত্রিকা। বাইরের দেওয়াল ঢেকেছে পটের চিত্রে। এই স্মৃতিমন্দির থেকে এলাকার ছেলেমেয়েদের লেখা একটি দেওয়াল পত্রিকা ‘দুন্দুভি’ প্রকাশিত হয় নিয়মিত। একটি বাঙলা ব্যাকরণ বই লিখেছিলেন, সেটিও আছে। রোটারি ক্লাবের সাহায্যে সোলার আলো ও স্মৃতিমন্দিরের সামনে বিভূতিভূষণের আবক্ষ মূর্তি বসানো হয়েছে। গড়ে তোলার ইচ্ছে পাঠাগার। কারণ এলাকার বহু ছাত্রছাত্রী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে গবেষণা করছেন। কেউ গৌরীকুঞ্জের পাঠাগারে এলে যেন হাতের মুঠোয় সবটাই পান এমনটাই ইচ্ছেপ্রকাশ করলেন ‘গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি’র সভাপতি তাপসবাবু।

bibhutibhushan's dress
বিভূতিভূষণের পোশাক, গৌরীকুঞ্জে সংরক্ষিত।

কিন্তু একা এই দায়িত্ব বহন করবেন কী ভাবে? ডোহিজোড়ার সংস্কৃতি সংসদ, মৌ ভাণ্ডারের নেতাজী পাঠাগার, কলেজ রোডের বিভূতি সংস্কৃতি, বাবু লাইনের ইভনিং ক্লাব ও কাশিদার অ্যাথলেটিক ক্লাব – ঘাটশিলার এই ৫টি বাংলা বাংলাভাষী ক্লাব তাপসবাবুর পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বারো মাসের তদারকির জন্য যে ব্যয় হয় তা আসে কোথা থেকে? প্রতি মাসের খরচ প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। নিজে খরচ চালালেও তাপসবাবুর মনে হয় এখন আরও যত্ন ও সংরক্ষণের প্রয়োজন। এর জন্য আরও সুস্থ সংস্কৃতিসম্পন্ন মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। তাপসবাবুর একটাই অনুরোধ, পশ্চিমবঙ্গের কাছে, অন্তত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিনে যেন কেউ আসেন ঘাটশিলায়, ‘গৌরীকুঞ্জ’এ।

২০১৮- ‘পথের পাঁচালী’ স্রষ্টা বিভূতিভূষণের ১২৫তম জন্মবর্ষ। চলুন না, একবার ঘাটশিলা গিয়ে সেই সাহিত্য-মনীষীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসি।

আরও পড়ুন: নির্জনবিলাসী ঘাটশিলায় ১ / বড়ো মন ছুঁয়ে যাওয়া নাম, ফুলডুংরি

আরও পড়ুন: নির্জনবিলাসী ঘাটশিলায় ২ / ‘অপুর পথ’ ধরে সুবর্ণরেখা-তীরে

half bust of bibhutibhushanকী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে ট্রেনে ঘাটশিলা খুব বেশি হলে ঘণ্টা চারেকের পথ। সারা দিনে বেশ কিছু ট্রেন আছে। তবে সব চেয়ে ভালো সকাল ৬.২০-এর হাওড়া-বরবিল জনশতাব্দী বা সকাল ৬.৫৫-এর ইস্পাত এক্সপ্রেস। জনশতাব্দী ঘাটশিলা পৌঁছে দেয় ৯.১২ মিনিটে, ইস্পাত ৯.৫১ মিনিটে। সকাল ১০টায় হাওড়া-ঘাটশিলা মেমু পৌঁছোয় দুপুর ১.৫০ মিনিটে। হাওড়া-মুম্বই রেলপথে টাটানগর স্টেশন থেকে ঘাটশিলা ৩৬ কিমি। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে টাটানগর এসে ট্রেনে, বাসে বা গাড়ি ভাড়া করে ঘাটশিলা আসা যায়।

৬ নং জাতীয় সড়ক তথা বোম্বে রোড বরাবর কলকাতা থেকে ঘাটশিলার দূরত্ব গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন

ঘাটশিলায় থাকার জন্য অনেক বেসরকারি হোটেল, রিসর্ট আছে। triviago.in, make my trip, goibibo, yatra.com ইত্যাদির মতো ওয়েবসাইটগুলিতে বেসরকারি হোটেলের সন্ধান পাবেন।

স্টেশনের কাছেই রয়েছে সুহাসিতা রিসর্ট। যোগাযোগ ৯৭৭১৮৩১৮৭৭, ০৩৩-২২২৩৪৬৫১। ম্যানেজার অমরেন্দ্র মিত্র। ই-মেল [email protected]

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here