jamgram rajbari
writwik das
ঋত্বিক দাস

ভ্রমণের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই৷ পাহাড়, নদী, স্থাপত্য – এ সবের টানেই হাজার জীবনযুদ্ধের মাঝে পাওয়া ক্ষণিকের ছুটিগুলোতে এ-দিক সে-দিক বেরিয়ে পড়ার মধ্যে এক অনাবিল আনন্দ৷

এমনই আনন্দ পাওয়ার লোভে এক রবিবারের সকালে আমরা তিন বন্ধু চেপে বসলাম বর্ধমান মেন লাইনের লোকাল ট্রেনে৷ গন্তব্য ছিল পান্ডুয়া স্টেশন নেমে সেখান থেকে জামগ্রাম রাজবাড়ি৷ জামগ্রাম রাজবাড়ি আদপে নন্দী বংশের জমিদারবাড়ি৷

আরও পড়ুন: বনজ্যোৎস্নায় সবুজ অন্ধকারে : বেথুয়াডহরী

পান্ডুয়া স্টেশনের টিকিট কাউন্টার লাগোয়া অটোস্ট্যান্ড থেকে জামগ্রাম যাওয়ার অটোতে আমরা তিন বন্ধু চড়ে বসলাম৷ রবিবারের ভিড় বাজার ছাড়িয়ে অটো গ্রাম্যপথ ধরল৷ আহাঃ কী শোভা সেই পথের৷ পথের দু’ধারে শুধুই দিগন্তবিস্তৃত খেত, সদ্য লাগানো ধানের চারা সবুজ ভেলভেটের মতো দিগন্তভূমি জুড়ে রয়েছে৷ তার মাঝ দিয়ে কালো পিচের রাস্তা, সে কী অপরূপ দৃশ্য! সেই নয়নমুগ্ধকর দৃশ্য পেরিয়ে আমরা পৌঁছোলাম নন্দী জমিদারবাড়ির সামনে৷ প্রথমেই চোখে পড়ল সুবিশাল কৃষ্ণ মন্দির৷ তার ডানপাশেই রাজবাড়ি প্রবেশের দরজা৷

krishna temple, nandibari
কৃষ্ণ মন্দির।

বাইরে থেকে রাজবাড়ির বিশালত্ব সহজে অনুমান করা যায় না৷ প্রায় ১৩ বিঘা জমির ওপর দাঁড়িয়ে জামগ্রামের নন্দীবাড়ি৷ রাজবাড়ির সামনে পরিচয় হল নন্দী বংশের প্রবীণ সদস্য সতিপতী নন্দী মহাশয়ের সঙ্গে৷ বর্তমানে ৮১ বছর পার করেছেন৷ তাঁর মুখ থেকেই জানা গেল, অতীতে ব্রিটিশ শাসনকালে অধুনা হালিশহরের কেওটা গ্রামে নন্দীবংশের আদিবাস ছিল৷ ব্রিটিশদের অত্যাচারে তাঁরা কেওটাগ্রাম ছেড়ে চলে এসে পান্ডুয়ার জামগ্রামে বসতি গড়েন৷পরে তাঁদেরই একটা অংশ অধুনা কালনা মহকুমার বৈদ্যপুর অঞ্চলে বসতি গড়েন৷সুপুরি, বিভিন্ন প্রকার মশলা ও নুনের ব্যবসা, এই ছিল নন্দীদের প্রধান জীবিকা৷ বর্ধমানের কালনা, কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলের পোস্তা, বেলেঘাটার খালপোল অঞ্চলে নন্দীদের ব্যবসার গদি ছিল৷

শোনা যায় এক বার বড়লার্ট ওয়ারেন হেস্টিংসের অনেক টাকার দরকার হয়৷ তখন বড়লার্ট তৎকালীন নন্দীদের কাছে অনেক টাকা দাবি করেন৷ আবার সেই সময় বাংলার রানি ভবানীর সঙ্গে বৃটিশদের অশান্তি লাগে৷ এর শোধ নিতে বড়লার্ট হেস্টিংস মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রানি ভবাণীর তিনটি মহল (কালনা, বৈদ্যপুর ও জামগ্রাম) নন্দীদের দিতে চান। নন্দীরা প্রথমে অসম্মত হলেও পরে ব্রিটিশদের শর্ত মানতে বাধ্য হন৷ তখনকার দিনে ব্রিটিশদের কোনো অনুষ্ঠান হলে বাংলার মধ্যে একমাত্র বর্ধমান রাজা ও নন্দীরা নিমন্ত্রিত হতেন ৷

a part of jamgram rajbari
রাজবাড়ির একাংশ।

জামগ্রামের নন্দীপাড়ার গোটা অঞ্চলটিতেই নন্দীদের বাস৷ কোনো অচেনা মানুষ একা একা রাজবাড়িতে ঢুকে পড়লে আর দরজা চিনে বাইরে বেরোতে পারবে না যতক্ষণ না তাঁকে বাড়ির কেউ এসে বেরোনোর পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন৷ বাড়ির ভেতর বিভিন্ন মহল৷ এক একটা মহলে অতীত থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের আসবাবপত্র, বাসন, মূল্যবান কাগজপত্র সংরক্ষিত৷

thakurdalan, rajbari
ঠাকুরদালান।

জামগ্রাম নন্দীবাড়ি দুর্গাপুজো দেখার মতো। আজও দুর্গাপুজোর সব রকম ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন এই নন্দী পরিবার। দুর্গাপুজো শুরু হয় রথের সময় কাঠামোপুজো করে, খড়ের ওপর মাটি লেপে৷ পুজোর দিনগুলোতে বাইরে থেকে সব আত্মীয়স্বজন এসে মিলিত হন৷ তার মধ্যে প্রায় সবাই নন্দী৷ এই সময়ে বাইরের কোনো মানুষের সঙ্গে নন্দী বংশের ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্ব করার দরকার হয় না৷ জ্ঞাতি ভাইবোনেরাই সবাই বন্ধুর মতো মজা করে গোটা অঞ্চল মাতিয়ে রাখে৷ বাংলা তথা ভারতের আর কোথাও এত বড়ো যৌথ পরিবার ক’টা আছে হাত গুনে বলা যায়৷ বিদেশিদের চোখেও তাই জামগ্রাম রাজবাড়ির আলাদা কদর রয়েছে৷

artworks on the piller
পিলারের কারুকাজ।

পুজোর চার দিন এই গ্রামে কোনো মাইক বাজে না৷ তখন শুধুই ঢাকের বোল শোনা যায়৷ সব মিলিয়ে আজও নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অক্ষুন্ন রেখেছে এই পরিবার৷

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে বর্ধমান মেন লাইনের লোকালে চড়ে পান্ডুয়া স্টেশনে নেমে, সেখান থেকে জামগ্রাম যাওয়ার অটোতে উঠে রাজবাড়ির সামনে নামতে হবে৷

কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়েও যাওয়া যায়। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সিঙ্গুর গিয়ে ডান দিক ঘুরে দিল্লি রোড- জিটি রোড ধরে পান্ডুয়া পৌঁছে জামগ্রাম চলুন। কিংবা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গুড়াপ গিয়ে ডান দিক ঘুরে পান্ডুয়া পৌঁছে জামগ্রাম চলুন।

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন