চলুন ঘুরে আসি জামগ্রাম রাজবাড়ি

0
2321
jamgram rajbari
writwik das
ঋত্বিক দাস

ভ্রমণের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই৷ পাহাড়, নদী, স্থাপত্য – এ সবের টানেই হাজার জীবনযুদ্ধের মাঝে পাওয়া ক্ষণিকের ছুটিগুলোতে এ-দিক সে-দিক বেরিয়ে পড়ার মধ্যে এক অনাবিল আনন্দ৷

এমনই আনন্দ পাওয়ার লোভে এক রবিবারের সকালে আমরা তিন বন্ধু চেপে বসলাম বর্ধমান মেন লাইনের লোকাল ট্রেনে৷ গন্তব্য ছিল পান্ডুয়া স্টেশন নেমে সেখান থেকে জামগ্রাম রাজবাড়ি৷ জামগ্রাম রাজবাড়ি আদপে নন্দী বংশের জমিদারবাড়ি৷

আরও পড়ুন: বনজ্যোৎস্নায় সবুজ অন্ধকারে : বেথুয়াডহরী

পান্ডুয়া স্টেশনের টিকিট কাউন্টার লাগোয়া অটোস্ট্যান্ড থেকে জামগ্রাম যাওয়ার অটোতে আমরা তিন বন্ধু চড়ে বসলাম৷ রবিবারের ভিড় বাজার ছাড়িয়ে অটো গ্রাম্যপথ ধরল৷ আহাঃ কী শোভা সেই পথের৷ পথের দু’ধারে শুধুই দিগন্তবিস্তৃত খেত, সদ্য লাগানো ধানের চারা সবুজ ভেলভেটের মতো দিগন্তভূমি জুড়ে রয়েছে৷ তার মাঝ দিয়ে কালো পিচের রাস্তা, সে কী অপরূপ দৃশ্য! সেই নয়নমুগ্ধকর দৃশ্য পেরিয়ে আমরা পৌঁছোলাম নন্দী জমিদারবাড়ির সামনে৷ প্রথমেই চোখে পড়ল সুবিশাল কৃষ্ণ মন্দির৷ তার ডানপাশেই রাজবাড়ি প্রবেশের দরজা৷

krishna temple, nandibari
কৃষ্ণ মন্দির।

বাইরে থেকে রাজবাড়ির বিশালত্ব সহজে অনুমান করা যায় না৷ প্রায় ১৩ বিঘা জমির ওপর দাঁড়িয়ে জামগ্রামের নন্দীবাড়ি৷ রাজবাড়ির সামনে পরিচয় হল নন্দী বংশের প্রবীণ সদস্য সতিপতী নন্দী মহাশয়ের সঙ্গে৷ বর্তমানে ৮১ বছর পার করেছেন৷ তাঁর মুখ থেকেই জানা গেল, অতীতে ব্রিটিশ শাসনকালে অধুনা হালিশহরের কেওটা গ্রামে নন্দীবংশের আদিবাস ছিল৷ ব্রিটিশদের অত্যাচারে তাঁরা কেওটাগ্রাম ছেড়ে চলে এসে পান্ডুয়ার জামগ্রামে বসতি গড়েন৷পরে তাঁদেরই একটা অংশ অধুনা কালনা মহকুমার বৈদ্যপুর অঞ্চলে বসতি গড়েন৷সুপুরি, বিভিন্ন প্রকার মশলা ও নুনের ব্যবসা, এই ছিল নন্দীদের প্রধান জীবিকা৷ বর্ধমানের কালনা, কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলের পোস্তা, বেলেঘাটার খালপোল অঞ্চলে নন্দীদের ব্যবসার গদি ছিল৷

শোনা যায় এক বার বড়লার্ট ওয়ারেন হেস্টিংসের অনেক টাকার দরকার হয়৷ তখন বড়লার্ট তৎকালীন নন্দীদের কাছে অনেক টাকা দাবি করেন৷ আবার সেই সময় বাংলার রানি ভবানীর সঙ্গে বৃটিশদের অশান্তি লাগে৷ এর শোধ নিতে বড়লার্ট হেস্টিংস মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রানি ভবাণীর তিনটি মহল (কালনা, বৈদ্যপুর ও জামগ্রাম) নন্দীদের দিতে চান। নন্দীরা প্রথমে অসম্মত হলেও পরে ব্রিটিশদের শর্ত মানতে বাধ্য হন৷ তখনকার দিনে ব্রিটিশদের কোনো অনুষ্ঠান হলে বাংলার মধ্যে একমাত্র বর্ধমান রাজা ও নন্দীরা নিমন্ত্রিত হতেন ৷

a part of jamgram rajbari
রাজবাড়ির একাংশ।

জামগ্রামের নন্দীপাড়ার গোটা অঞ্চলটিতেই নন্দীদের বাস৷ কোনো অচেনা মানুষ একা একা রাজবাড়িতে ঢুকে পড়লে আর দরজা চিনে বাইরে বেরোতে পারবে না যতক্ষণ না তাঁকে বাড়ির কেউ এসে বেরোনোর পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন৷ বাড়ির ভেতর বিভিন্ন মহল৷ এক একটা মহলে অতীত থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের আসবাবপত্র, বাসন, মূল্যবান কাগজপত্র সংরক্ষিত৷

thakurdalan, rajbari
ঠাকুরদালান।

জামগ্রাম নন্দীবাড়ি দুর্গাপুজো দেখার মতো। আজও দুর্গাপুজোর সব রকম ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন এই নন্দী পরিবার। দুর্গাপুজো শুরু হয় রথের সময় কাঠামোপুজো করে, খড়ের ওপর মাটি লেপে৷ পুজোর দিনগুলোতে বাইরে থেকে সব আত্মীয়স্বজন এসে মিলিত হন৷ তার মধ্যে প্রায় সবাই নন্দী৷ এই সময়ে বাইরের কোনো মানুষের সঙ্গে নন্দী বংশের ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্ব করার দরকার হয় না৷ জ্ঞাতি ভাইবোনেরাই সবাই বন্ধুর মতো মজা করে গোটা অঞ্চল মাতিয়ে রাখে৷ বাংলা তথা ভারতের আর কোথাও এত বড়ো যৌথ পরিবার ক’টা আছে হাত গুনে বলা যায়৷ বিদেশিদের চোখেও তাই জামগ্রাম রাজবাড়ির আলাদা কদর রয়েছে৷

artworks on the piller
পিলারের কারুকাজ।

পুজোর চার দিন এই গ্রামে কোনো মাইক বাজে না৷ তখন শুধুই ঢাকের বোল শোনা যায়৷ সব মিলিয়ে আজও নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অক্ষুন্ন রেখেছে এই পরিবার৷

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে বর্ধমান মেন লাইনের লোকালে চড়ে পান্ডুয়া স্টেশনে নেমে, সেখান থেকে জামগ্রাম যাওয়ার অটোতে উঠে রাজবাড়ির সামনে নামতে হবে৷

কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়েও যাওয়া যায়। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সিঙ্গুর গিয়ে ডান দিক ঘুরে দিল্লি রোড- জিটি রোড ধরে পান্ডুয়া পৌঁছে জামগ্রাম চলুন। কিংবা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গুড়াপ গিয়ে ডান দিক ঘুরে পান্ডুয়া পৌঁছে জামগ্রাম চলুন।

 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here