এখনও সুযোগ আছে পুজোর ছুটিতে বেরিয়ে পড়ার। ট্রেনের টিকিট? তা-ও পাবেন। পর্যটন সম্পদে ভরপুর, পুজোর সপ্তাহ তিনেক আগে ট্রেনের টিকিট পেতেও অসুবিধা নেই, এমন জায়গা অনেক আছে। এমনই একটি রাজ্য বিহার। এই রাজ্যের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস। বুদ্ধদেব, মহাবীর, অজাতশত্রু, বিম্বিসার, চন্দ্রগুপ্ত, অশোক যে রাজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে, যে রাজ্যে বিশ্বের প্রথম রিপাবলিকের পত্তন হয়, শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাসের ভিত্তি যে রাজ্য, সেই রাজ্যকে কি পর্যটন-মানচিত্রে ব্রাত্য রাখা যায়। আমাদের প্রতিবেশী বিহারে পৌঁছেও যাওয়া যায় সহজে। তাই এ বার গন্তব্য হোক বিহার, বিহারের মগধ।

চলুন বেরিয়ে পড়ি – পটনা-বৈশালী-গয়া-রাজগীর-নালন্দা

প্রথম দিন – যাত্রা করুন পটনার উদ্দেশে।

কলকাতা থেকে পটনা যাওয়ার সব থেকে ভালো ট্রেন দুরন্ত এক্সপ্রেস। ট্রেনটি প্রতি সোম, বুধ এবং শুক্রবার রাত ১০:০৫-এ শিয়ালদহ থেকে যাত্রা শুরু করে পটনা পৌঁছোয় পরের দিন সকাল সাড়ে ছ’টায়। রয়েছে গরিবরথ এক্সপ্রেস। ট্রেনটি প্রতি মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনিবার কলকাতা স্টেশন থেকে রাত ৮:০৫-এ ছেড়ে, পটনা পৌঁছোয় পরের দিন ভোর সাড়ে ৫টায়। এ ছাড়াও শেষ মুহূর্তেও জায়গা পেয়ে যাবেন জনশতাব্দী এক্সপ্রেসে। ট্রেনটি রবিবার বাদে প্রতি দিন দুপুর ২:০৫-এ হাওড়া থেকে ছেড়ে পটনা পৌঁছোয় রাত ১০:১৫-এ।

কলকাতা থেকে পটনা বাসেও যেতে পারেন। সাধারণ থেকে বিলাসবহুল, সব রকম বাসই পাবেন। সাড়া দিনই চলে। খুব বেশি হলে ১০ ঘণ্টা সময় নেয়। বাসের জন্য কলকাতার বাবুঘাট বাসস্ট্যান্ডে খোঁজ করুন।

জনশতাব্দী এক্সপ্রেসে এলে প্রথম দিন রাতে পটনা পৌঁছোবেন। আর রাতের ট্রেনে এলে পৌঁছোবেন দ্বিতীয় দিন সক্কালেই। সুতরাং দ্বিতীয় দিন থেকে ঘোরাঘুরির সূচি দেওয়া হল।

দ্বিতীয় দিন ও তৃতীয় দিন – পটনা ঘোরাঘুরি ও রাত্রিবাস

গান্ধী ময়দান, পটনা।

পটনায় কী দেখবেন

(১) কুমরাহর – পর্যটন ভবন থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে পটনা বাইপাসে। কুমরাহর, ভিকনাপাহাড়ি, বুলন্দি বাগে রাজধানী মগধের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। দেখুন মৌর্য আমলের প্রাসাদ, ৮০টি স্তম্ভ বিশিষ্ট অ্যাসেম্বলি হল, বৌদ্ধ মনাস্ট্রি আনন্দ বিহার। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালের সংগ্রহ নিয়ে রয়েছে মিউজিয়াম

(২) গান্ধী ময়দান – শহরের হৃদপিণ্ড।

গোলঘর, পটনা।

(৩) গোলঘর তথা কেন্দ্রীয় শস্যাগার – ১৭৭০-এর মন্বন্তরের বিভীষিকায় সন্ত্রস্ত ব্রিটিশ সরকার ফৌজের জন্য খাদ্যশস্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৭৮৬-তে গান্ধী ময়দানের পুবে গঙ্গার তীরে গড়ে গোলঘর। এতে ১৪০০০০ টন খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা যায়। অভিনব স্থাপত্য, ধনুকাকার সিঁড়িতে ১৪৫ ধাপ উঠে উপর থেকে পটনা শহর দেখতে বেশ ভালো লাগে। দেখুন এর হুইসপারিং গ্যালারি। বিপরীতে গান্ধী সংগ্রহালয়। সন্ধ্যায় গোলঘর চত্বরে দেখে নিন লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো।

(৪) পটনা মিউজিয়াম – বুধমার্গে, মোগল ও রাজপুত শৈলীতে তৈরি। দেখুন বিশ্বের বৃহত্তম (১৭ মিটার) বৃক্ষ-ফসিল। মৌর্য, গুপ্ত ও কুষান যুগের স্থাপত্য, নানা মূর্তি, টেরাকোটা, মুদ্রা, ব্রোঞ্জ ও মিনিয়েচার পেন্টিং-এ সমৃদ্ধ। বোধগয়া ও নালন্দার নানা সংগ্রহও প্রদর্শিত হয়েছে।

সদাকত আশ্রম, পটনা।

(৫) সদাকত আশ্রম – প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের বসতবাটি। দানাপুর রোডের এই বাড়িতে তৈরি হয়েছে রাজেন্দ্র স্মৃতি মিউজিয়াম।

(৬) শহিদ-কি-মকবরা – জংশন স্টেশন থেকে ১০ কিমি দূরে পটনা সিটি স্টেশনের পাশে নবাব সিরাজের তৈরি সাদা-কালো পাথরে পিতার স্মারক।

(৭) পটনা সাহিব – পটনা ঝাউগঞ্জে দশম শিখগুরু গোবিন্দ সিং-এর জন্মস্থানে গড়ে উঠেছে শ্রী হরমন্দির সাহিব বা পটনা সাহিব। গুরুত্বে স্বর্ণমন্দিরের পরেই এর স্থান। স্থাপত্যও সুন্দর। রয়েছে গুরু গোবিন্দ সিং-এর পাদুকা, দোলনা ইত্যাদি স্মারক।

(৮) শের শাহি মসজিদ – হরমন্দির লাগোয়া দুর্গের ধ্বংসাবশেষের উপর আফগান স্থাপত্যে শের শাহ সুরির গড়া প্রাচীন মসজিদ। রাস্তা জুড়ে শের শাহের কিল্লা হাউস

(৯) আগম কুয়া – গুলজারিবাগ স্টেশনের কাছে। সম্রাট অশোক তাঁর ছয় ভাইকে হত্যা করে এই কুয়োয় ফেলে সিংহাসনে বসেন।

শহিদ স্মারক, পটনা।

(৯) আগম কুয়া – গুলজারিবাগ স্টেশনের কাছে। সম্রাট অশোক তাঁর ছয় ভাইকে হত্যা করে এই কুয়োয় ফেলে সিংহাসনে বসেন।

চতুর্থ দিন – পটনা থেকে চলুন বৈশালী, ৬২ কিমি। পটনার গান্ধী ময়দান বাসস্ট্যান্ড বাস ধরে চলুন বৈশালী। গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন। পটনা থেকে সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়ুন, ঘণ্টা তিনেকে পৌঁছে যান বৈশালী। সারা দিন বৈশালীর দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখে সন্ধ্যা নাগাদ ফিরুন পটনা। রাত্রিবাস পটনা।

অশোক পিলার, বৈশালী।
বৈশালীতে কী দেখবেন

বিশ্বের প্রথম রিপাবলিক তৈরি হয়েছিল এই বৈশালীতে। খ্রিস্টজন্মেরও ৬০০ বছর আগে। বৈশালী বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত। তাঁর শেষ ভাষণটিও এই বৈশালীতেই দেন, গন্ধকি নদীর তীরে কলুহায়। বুদ্ধের নির্বাণের ১০০ বছর পরে দ্বিতীয় বৌদ্ধ কাউন্সিল বসেছিল এই বৈশালীতেই। এই বৈশালীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল ১৩টি বৌদ্ধস্তূপ, যার মধ্যে ৬টির ধ্বংসাবশেষ স্মৃতি রোমন্থন করায়। রাজনর্তকী আম্রপালি আম্রকানন যৌতুক দেন বুদ্ধকে, বৌদ্ধধর্মে দীক্ষাও নেন এই বৈশালীতে।

(১) অশোক পিলার – ১৮.৩ মিটার উঁচু লাল বেলেপাথরের স্তম্ভের মাথায় ওলটানো পদ্মের উপর সিংহমূর্তি, বুদ্ধের শেষ ভাষণদানের স্মারক।

(২) বৌদ্ধস্তূপ ১

(৩) অদূরে চার শতকের চতুর্মুখী মহাদেব

(৪) সামনে যেতে মিউজিয়ামের পথে বৌদ্ধস্তূপ ২। ১৯৫৮-য় এখানে খননকাজ চালিয়ে বুদ্ধের চিতাভস্ম সংবলিত পাত্র পাওয়া যায়।

রাজা বিশাল কা গড়, বৈশালী।

(৫) মিউজিয়াম

(৬) অভিষেক পুষ্করিণী – এখানকার পবিত্র জলে পূত হয়ে বৈশালীর জনপ্রতিনিধিরা শপথ নিতেন। এর কাছেই ছিল লিচ্ছবি স্তূপ।

(৭) বিশ্ব শান্তি স্তূপ – অভিষেক পুষ্করিণীর পাড়ে।

(৮) বাওয়ান পোখর মন্দির – বাওয়ান পোখর অর্থাৎ বাহান্ন তীর্থের জল সঞ্চিত হয়েছিল ৫২টি কুণ্ডে, কালে কালে একটি পুকুর। তারই ধারে পাল আমলের মন্দির

(৯) রাজা বিশাল কা গড় – বিশাল মাটির স্তূপ, এক কিমি পরিধি। এটাই ছিল ৭৭০৭ জনপ্রতিনিধির সংসদ ভবন।

(১০) অদূরেই হরিকাটোরা মন্দিরে রাম-লক্ষ্মণ-সীতা।

কুন্দালপুর, বৈশালী।

(১১) কুন্দালপুর – ৪ কিমি দূরে, ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের জন্মস্থান। এখানে তিনি জীবনের ২২টি বছর কাটিয়েছিলেন।

পঞ্চম দিন – গন্তব্য গয়া। গয়া ঘোরাঘুরি ও রাত্রিবাস।

ট্রেনে গয়া যাওয়া সব থেকে ভালো। পটনা থেকে গয়াগামী অসংখ্য মেমু লোকাল ট্রেন রয়েছে। ঘণ্টা আড়াই সময় লাগে। এ ছাড়া রয়েছে রাঁচিগামী জনশতাব্দি এক্সপ্রেস। ট্রেনটি রোজ সকাল ছ’টায় পটনা জংশন স্টেশন থেকে ছেড়ে গয়া পৌঁছয় ৭:৫৫-এ।

বিষ্ণুপদ মন্দির, গয়া।

গয়ায় কী দেখবেন

(১) বিষ্ণুপাদ মন্দির – অন্তঃসলিলা ফল্গুর পাড়ে। কারুকার্যময় আট সারি স্তম্ভ, ৩০ মিটার অষ্টকোণি চূড়া। ভিতরে পাথরে বিষ্ণুর পায়ের ছাপ।

(২) পাতালেশ্বর শিব ও অক্ষয়বট – বিষ্ণুপাদ মন্দিরের এক কিমি দূরে ১০০০ সিঁড়ি উঠে ব্রহ্মযোনি পাহাড়, চুড়োয় পাতালেশ্বর শিব আর নিচুতে অক্ষয়বট।

(৩) সূর্য মন্দির – বিষ্ণুপাদ মন্দিরের উত্তরে শোন নদীর তীরে।

(৪) বরাবর গুহা – গয়া-পটনা লোক্যাল ট্রেনে একটি স্টেশন পরেই বেলা, এখান থেকে রিকশা বা টাঙায় ১০ কিমি। গয়া থেকে গাড়ি বা বাসেও আসতে পারেন। সম্রাট অশোকের সময়ে তৈরি গুহা। সাতটি গুহা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। তিন ধরনের গুহা – নাগার্জুনীয় গুহা, পঞ্চপাণ্ডব গুহা ও কুটিরাকার গুহা। গুহার কাছেই আনন্দ সরোবর, সিদ্ধেশ্বর পাহাড়।

ষষ্ঠ দিন– চলুন বোধগয়া, বাসে বা গাড়ি, অটো, টাঙায়। ভারত সেবাশ্রম আশ্রমের কাছে কাছারি চক থেকে শেয়ার অটোয় আসা যায়।  রাত্রিবাস গয়া।

বুদ্ধ মন্দির, বুদ্ধগয়া।
বুদ্ধগয়ায় কী দেখবেন

নিরঞ্জনা নদীর তীরে উরুবিল্ব গ্রামে পিপুল গাছের নীচে বোধি লাভ করে গৌতম হলেন বুদ্ধদেব। সেই নিরঞ্জনা আজ ফল্গু, উরুবিল্ব আজ বুদ্ধগয়া আর পিপুল গাছ আজ বোধিবৃক্ষ।

(১) বোধিবৃক্ষ – পাথরে পায়ের ছাপ বুদ্ধের।

(২) সুজাতা দিঘি – পাশেই। কথিত আছে, এই দিঘির জলে স্নান করে সুজাতা পায়েস নিবেদন করতেন বুদ্ধদেবকে।

মহাবোধি মন্দির, বুদ্ধগয়া।

(৩) মহাবোধি মন্দির – ৬০ ফুট প্রশস্ত, ১৮০ ফুট উঁচু পিরামিডধর্মী চুড়োওয়ালা দ্বিতল মন্দির। ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় ৮০ ফুটের বুদ্ধমূর্তি। প্রবেশফটক বৌদ্ধধারায় দক্ষিণ ভারতীয় শৈলীতে তৈরি। পণ্ডিতদের মতে, সম্রাট অশোকের দানের ১ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রায় উপগুপ্তের হাতে তৈরি এই মন্দির। বহু বার নানা কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে এই মন্দির, আবার সংস্কার হয়েছে। মন্দিরের উত্তরে চক্রমাণা (বুদ্ধের ধ্যানস্থান), ঘেরা প্রাঙ্গণে অনিমেষলোচন চৈত্য (এক সপ্তাহ ঠায় দাঁড়িয়ে বুদ্ধ পিপুল গাছ অবলোকন করেন), মোহান্তর মনাস্ট্রি, রত্নাগার

(৪) সুজাতা মন্দির – মহাবোধির দু’ কিমি পশ্চিমে।

(৫) মুচলিন্ড সরোবর – ৩ কিমি দূরে, নাগরাজ মুচলিন্ড ফণা মেলে ধ্যানস্থ বুদ্ধকে রোদ-ঝড়-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতেন।

(৬) তিব্বতীয় মনাস্ট্রি – মহাবোধির উত্তর-পশ্চিমে বাজার পেরিয়ে ১৯৩৮-এ তৈরি।

ভিয়েতনামী মন্দির, বুদ্ধগয়া।

(৭) চিনা বুদ্ধিস্ট মন্দির – অদূরেই ১৯৪৫-এ তৈরি সাদা রঙের মন্দির।

(৮) মিউজিয়াম – চিনা বুদ্ধিস্ট মন্দিরের বিপরীতে, বৌদ্ধ স্থাপত্যের নানা নিদর্শন।

(৯) থাই মনাস্ট্রি – সামনে এগোতেই প্যাগোডাধর্মী মন্দির।

(১০) ভুটান মনাস্ট্রি – আর একটি প্যাগোডাধর্মী মন্দির।

(১১) তিব্বতীয় বুদ্ধ মন্দির

(১২) জাপানি বুদ্ধ মন্দির

এ ছাড়াও মায়ানমার, বাংলাদেশ, লাওস, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনামও মনাস্ট্রি গড়েছে। খোলা আকাশের নীচে ২৫ মিটার উঁচু বুদ্ধমূর্তিটিও পথ চলতে চলতে দেখে নিন।

বিশ্ব শান্তি স্তূপ, রাজগীর।

সপ্তম দিন – চলুন রাজগীর। রাত্রিবাস রাজগীর।

গয়া থেকে রাজগীরের দূরত্ব ৬০ কিমি। গাড়ি বা বাস পাওয়া যাবে। গয়া থেকে বখতিয়ারপুরগামী প্যাসেঞ্জার ট্রেনেও রাজগীর আসতে পারেন। ট্রেনটি রোজ সকাল ৮:০৭-এ গয়া থেকে ছেড়ে রাজগীর পৌঁছোয় সকাল এগারোটায়।

নালন্দার ধ্বংসাবশেষ।

অষ্টম দিন – ঘুরে আসুন নালন্দা, পাওয়াপুরী। রাত্রিবাস রাজগীর।

রাজগির থেকে ১১ কিমি উত্তরে নালন্দা। দেখে নিন বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ ও সংলগ্ন মিউজিয়াম।

এর পর চলুন ১৮ কিমি দূরে পাওয়াপুরী – প্রসিদ্ধ জৈনতীর্থ, ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের নির্বাণস্থল। দেখুন কমল সরোবরে জলমন্দির। এক কিমি দূরে মহাবীরের প্রথম উপদেশস্থল। রয়েছে জৈন শ্বেতাম্বর মন্দির। আরও অনেক জৈন মন্দির আছে পাওয়াপুরীতে।

জল মন্দির, পাওয়াপুরী।

নবম দিন – রাজগীরে ঘোরাঘুরি ও রাত্রিবাস রাজগীর।

রাজগীরে কী দেখবেন

রাজগীরের বয়স কত? ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাজগীরের নাম ছিল রাজগৃহ। অজাতশত্রু নাম রাখেন গিরিব্রজ। জরাসন্ধেরও রাজধানী ছিল এই রাজগৃহ। রামায়ণেও উল্লেখ আছে রাজগৃহের। বুদ্ধের আগমনে মৌর্যসম্রাট বিম্বিসার দীক্ষা নেন তাঁর কাছে। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটক লেখা হয় এই রাজগৃহে। মহাবীর তাঁর প্রথম ধর্মসভা করেন রাজগৃহে। এমনই মাহাত্ম্য এই জায়গার।

(১) হট স্প্রিং – আধুনিক রাজগীরের অন্যতম আকর্ষণ, বেণুবনের দক্ষিণ-পুবে সরস্বতী নদী পেরিয়ে। ঝরনাধারার নীচে ভূ-গর্ভস্থ মন্দিরে মূর্তি হয়েছে গৌতম, ভরদ্বাজ, বিশ্বামিত্র, জমদ্যগ্নি, দুর্বাসা, বশিষ্ঠ ও পরাশর তথা সপ্তঋষির। পাহাড় ঢালে সাতটি ধারায় বেরিয়ে আসছে হট স্প্রিং-এর জল। তারতম্য রয়েছে উষ্ণতার। অদূরে জাপানি প্যাগোডা।

গৃধ্রকূট পাহাড়, রাজগীর।

(২) অজাতশত্রু দুর্গ – পাহাড় কেটে পরিখাবৃত দুর্গ। ৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে গড়েন বিম্বিসারের পুত্র অজাতশত্রু। ৩২টি প্রবেশদ্বারের মধ্যে একটিও অক্ষত।

(৩) অজাতশত্রু স্তূপ

(৪) আম্রবন বা জীবকের আমবাগান

(৫) বিম্বিসারের জেল – ১.৮ মিটার পুরু দেওয়াল, ১৮.৫৮ বর্গ মিটার জমির ওপর তৈরি জেলে পুত্র অজাতশত্রুর হাতে বন্দি ছিলেন বিম্বিসার।

(৬) বিম্বিসারের খাজাঞ্চিখানা তথা স্বর্ণভাণ্ডার – আকারে অনেকটা গুহার মতো।

(৭) মনিয়ার মাঠ – পাহাড়ের নিচুতে সমতলে এক উদ্যানভূমি। এখানে রাজসূয়, অশ্বমেধ যজ্ঞ হত। কিংবদন্তি, এখানেই ভীম ও জরাসন্ধের মধ্যে ২৮ দিনব্যাপী দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলে এবং জরাসন্ধের মৃত্যু হয়।

(৮) জয়প্রকাশ নারায়ণ উদ্যান – মনিয়ার মাঠের বিপরীতে।

শোনভাণ্ডার, রাজগীর।

(৯) শোনভাণ্ডার – উদ্যানের অদূরেই, জরাসন্ধের ধনাগার।

(১০) বেণুবন বিহার – বিম্বিসারের প্রমোদকানন, বুদ্ধও বাস করেছেন এখানে, এখন ডিয়ার পার্ক তথা চিড়িয়াখানা, বেণুবনের জলাশয়ে খেলা করে মাছ।

বীরায়াতম ব্রাহ্মী কলা মন্দিরম, রাজগীর।

(১১) বীরায়তন ব্রাহ্মী কলা মন্দিরম – দর্শনী দিয়ে প্রবেশ, দেখুন পুতুলে মহাবীরের জীবন আখ্যান।

(১২) বিশ্বশান্তি স্তূপ – শহর থেকে ১২ কিমি দূরে রত্নগিরি পাহাড়চুড়োয় জাপানি বৌদ্ধসংঘের তৈরি। শহর থেকে কুণ্ড পেরিয়ে পাঁচ কিমি দূরে গৃধ্রকূট পাহাড় থেকে ৬০০ মিটার বৈদ্যুতিন রোপওয়েতে সাত মিনিট যেতে হয়। হেঁটেও ওঠা যায় শান্তিস্তূপে।

এ ছাড়াও রাজগীরে রয়েছে বহু জৈন মন্দির, বার্মিজ মন্দির, বুদ্ধ মন্দির, আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম, শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ইত্যাদি।

দশম দিন – ফিরুন বাড়ির দিকে।

কোথায় থাকবেন

পটনা, গয়া এবং রাজগিরে বিহার পর্যটন উন্নয়ন নিগমের হোটেল রয়েছে। অনলাইনে বুকিং-এ কিছু সমস্যা হয়। তাই যোগাযোগ করুন বিহার পর্যটনের কলকাতা অফিসে। ঠিকানা- ২৬বি, ক্যামাক স্ট্রিট, দূরভাষ- ২২৮০৩৩০৪।

রয়েছে অনেক বেসরকারি হোটেলও। হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তাদের সন্ধান পেয়ে যাবেন।

রাজগীরে রয়েছে বহু হলিডে হোম। সন্ধানের জন্য দেখুন www.holidayhomeindia.com

বরাবর গুহার কাছে সিদ্ধেশ্বর পাহাড়ের মাথায় যাওয়ার সিঁড়ি।

কী ভাবে ঘুরবেন

(১) পটনা শহরের দ্রষ্টব্য দেখে নিন অটো ভাড়া করে।

(২) বৈশালীতে ট্যুরিস্ট রেস্ট হাউসের ডাইনে-বাঁয়ে এক কিমির মধ্যে প্রায় সব দ্রষ্টব্যস্থান, অশোক পিলার ৪ কিমি বামে। রিকশায় চেপে ঘুরে নিতে পারেন বৈশালী।

(৩) গয়ায় পৌঁছে সকালের দিকে মন্দির দর্শন করে দুপুরের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে চলুন বরাবর গুহা।

(৪) রিকশা ভাড়া করে ঘুরে নিতে পারেন বুদ্ধগয়া।

(৫) রাজগীরে অনেক বেসরকারি ট্রাভেল এজেন্সি আছে যারা নালন্দা- পাওয়াপুরী ঘুরিয়ে আনে। বাস বা শেয়ার ট্রেকারে রাজগীর থেকে নালন্দা, নালন্দা থেকে পাওয়াপুরী যাওয়া যায়। তার পর পায়ে পায়ে নালন্দা আর স্থানীয় যানে ঘুরে নেওয়া যায় পাওয়াপুরী। রাজগীর থেকে ভাড়া গাড়ি করে ঘোরার ব্যবস্থা তো আছেই।

রাজগীরের বাহন টাঙা।

(৬) রাজগীরে ঘোরার জন্য রয়েছে রিকশা অথবা টাঙা।

কী ভাবে ফিরবেন

রাজগীর থেকে হাওড়া ফেরার একমাত্র ট্রেন রাজগীর প্যাসেঞ্জার। তবে ট্রেনটি প্রচুর সময় নেয়। তাই রাজগীর থেকে চলুন বখতিয়ারপুর জংশন। বখতিয়ারপুর থেকে কলকাতাগামী অনেক ট্রেন রয়েছে। তবে পটনা-কলকাতা এক্সপ্রেসে এখনও আসন খালি রয়েছে। ট্রেনটি প্রতি দিন সন্ধ্যা ৬:৩৬-এ বখিতিয়ারপুর থেকে ছেড়ে কলকাতা স্টেশন পৌঁছোয় পরের দিন সকাল সাড়ে সাতটায়।

মনে রাখবেন

(১) কুমরাহরের মিউজিয়াম সোমবার ছাড়া সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা।

(২) পটনা মিউজিয়াম সোমবার ছাড়া সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টে পর্যন্ত খোলা।

(৩) পটনায় সদাকত আশ্রম সোমবার ছাড়া অন্যান্য দিন খোলা। দুপুরের দিকে ঘণ্টা দুই-তিন বন্ধ থাকে। গ্রীষ্ম আর শীতে খোলার সময় কিঞ্চিৎ আলাদা। আগেভাগে জেনে নেবেন।

আরও পড়ুন:  পুজোয় অদূর ভ্রমণ / অন্য রকম ওড়িশা

(৪) ভ্রমণের সময় সংক্ষেপ করতে চাইলে পটনা শহরে দু’ দিন থাকুন। এক দিন পটনা শহর ঘুরে নিন, আরেক দিন বৈশালী। তবে দু’টো দিন পটনা শহরের জন্য রাখলে ধীরেসুস্থে ঘুরতে পারেন।

(৫) বৈশালীতে মিউজিয়াম শুক্রবার ছাড়া ১০টা-৫টা খোলা।

(৬) বুদ্ধগয়ার মিউজিয়ামও শুক্রবার ছাড়া ১০টা-৫টা খোলা।

(৭) বুদ্ধগয়ায় মহাবোধি দর্শনে টিকিট লাগে, ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা এবং দুপুর ২টো থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা।

(৮) রাজগীরের হট স্প্রিং-এ স্নান করতে হলে ভিড় এড়াতে চলুন খুব ভোরে কিংবা সন্ধের পরে।

(৯) রাজগীরের রোপওয়ে চলে সকাল সোয়া ৮টা থেকে দুপুর ১টা, দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টা।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন