সঞ্জয় চক্রবর্তী

আমরা যারা সেই অর্থে পিঠে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর রাবার ষ্ট্যাম্প ছাড়াই আইটি-র গরম জলে খুদকুড়ো ফুটিয়ে গ্রাসাচ্ছদনে ব্রতী আছি, তারা এককালে ফাঁকে-ফোঁকরে এক-আধটা সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিতুম। এই ভুমিকা, সেখানকার একটা প্রশ্নের অবতারণা করার জন্য! বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে সুন্দরবনের যে দ্বীপটি সর্ব প্রথম ডুবে যায় তার নাম কী? ক) জম্বুদ্বীপ খ) লোহাচারা দ্বীপ, গ) মৌসুনি দ্বীপ ঘ) ঘোড়ামারা দ্বীপ। উঃ আপনি জানেন, না হলে খুঁজে দেখুন। তা দ্বীপ সম্পর্কে আমার জ্ঞান এইটুকুই।

 

অনেক কাল আগে সেই প্রথম, প্রশ্নপত্রে মৌসুনির নাম শোনা। আপাতত আমরা চলেছি। কিন্তু হঠাৎ কেন? আসলে গত বছর এক বন্ধুর সুত্রে ফোনালাপ সেন্টু-র সঙ্গে। ওর একটি থাকার জায়গা আছে ওই দ্বীপে। তার পর ফেসবুকে কিছু টুকরো টুকরো কথা। ব্যাস ওইটুকুই, যাওয়া আর হয়নি। সে হেন ব্যক্তিটির সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় হল গত মাসে, দলমার পাহাড়ে গিয়ে। মাকুলাকোচা ফরেস্ট রিসর্টে। ওরাও বেড়াতে গিয়েছে। জানলাম থাকার জন্য এখন দুটো টেন্ট করেছে বিচের ওপর। ব্যাস! পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছি শনিবার। দলে আমরা চার জন (আমি, নানিস, গদা আর রাজা)।

বাস ধর্মতলা থেকে নামখানা। ডব্লিউবিএসটিসি। প্রথম বাস সকাল ৬.৩০। নামখানায় নামলাম দশটায়। চাইলে শিয়ালদা থেকে নামখানা ট্রেনেও আসতে পারেন। তার পর হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী পার হয়ে বাসস্ট্যান্ড (বকখালি যাঁরা গেছেন, তাঁদের সক্কলের চেনা)। এখান থেকে উঠে পড়া ম্যাজিক গাড়িতে। গন্তব্য মৌসুনি ঘাট (জায়গার নাম দুর্গাপুর)। ভাড়া মাথাপিছু ১৫ টাকা। আপনি রিজার্ভ করে নিতে পারেন। ভাড়া ৩৫০ টাকা। দূরত্ব ত্রিশ মিনিটের।

এখন আমরা ‘চেনাই’ নদীর পারে, আপনিও হয়তো এতক্ষণে খেয়াল করেছেন রাস্তার দু’পাশে শুরু হয়ে গিয়েছে সবুজ ম্যানগ্রোভ। কারণ পুরোটাই সুন্দরবন এলাকার অর্ন্তভুক্ত। এ বার উঠে পড়া যাক মোটরচালিত নৌকোয়। আমরা এসে পড়েছি মৌসুনি দ্বীপে। আমাদের স্বাগত জানাতে নদীর পাড়ে হাজির ‘মুজিবর’। আজ ওই আমাদের লোকাল গাইড কাম ম্যানেজার। সেন্টু আগেই ওর নম্বর দিয়ে দিয়েছিল। নামখানা নেমেই একবার ফোন করে নিন।

আরও পড়ুন: পুজোয় অদূর ভ্রমণ / অন্য রকম ওড়িশা

মৌসুনি। বাগডাঙা, কুসুমতলা, বালিয়াড়া এই তিন পঞ্চায়েত নিয়ে প্রায় ২৪ স্কোয়ার কিলোমিটার একটা দ্বীপ। নামখানা মহকুমার অর্ন্তগত। মূলত জেলেদের গ্রাম দিয়ে গড়া। আমরা চলেছি কাঁকড়ামারির চরে, মুজিবরের ভুটভুটি ভ্যানে চেপে, পাশে রাস্তার দু’ ধারে সবুজ গ্রাম, ধানখেত। দু’ চোখে যতটা পারছি গিলে নিচ্ছি। আর কিয়দংশ ডিজিটাল ফর্ম্যাটে! কারেন্ট বলতে সোলার পাওয়ার। বিচে পাতা দু’টো টেন্ট। গাছে বাঁধা দোলনা। আপনারা আর গ্রামের লোক। দুপুরে খেয়ে নিন, টাটকা মাছের ঝোল, ডাল, ভাত, তরকারি। শংকরদার বাড়িতেই চলছে রান্নাবান্না। কী আছে দ্বীপে? শহুরে কমর্ফোট ছেড়ে এক দিনের জন্য বেরোলেই একটা সম্পুর্ণ ভার্জিন লোকেশন, বিস্তৃত বিচ, ঝাউবনে মাইগ্রেটেড পাখী, সামনেই খালি চোখে দেখা যাচ্ছে আরও দু’টো দ্বীপ। জম্বু ও সাগরদ্বীপ।

ভাটায় জল সরে গেলে গ্রামের ছেলেমেয়ের নেমে পড়ে ফুটবল খেলতে। পায়ে স্পাইক শু। মাঝিরা ফিরে আসছে, সঙ্গে জালে পড়া মাছ। কিনে নিন, রাতের পানাহারে কাজে লাগবে। এই দেখুন, চোখে জড়িয়ে আসছে ভাত ঘুম, একটূ জিরিয়ে নিন। আরে না, কিছুই মিস হবে না। আপনার রাত্রিবাসের টেন্ট তো বিচের ওপরেই। চা এসে গেছে, আড়মোড়া ভাঙুন – সামনে প্রকৃতি তুলি নিয়ে বসে পড়েছে, সূর্য ডুবছে। লাল কাঁকড়া মুখ বের করছে, একটু পরেই লাল কার্পেট বিছিয়ে দেবেন তেনারা।

এই দেখুন মুজিবর জোগাড় করে ফেলেছে দেশি মুরগি, শুকনো কাঠ…আরে আপনি তন্দুর করবেন যে। চাঁদ মাথার ওপরে, আপনার ব্লুটুথ স্পিকারে সুমন, মাঝিদের সঙ্গে সমুদ্র-অভিজ্ঞতার গল্প…রাত্রি লম্বা হোক। কাল সকালে সূর্যোদয়, চা ব্রেকফাস্ট সেরেই ফিরতে হবে। এক দিনের জন্য বেড়িয়ে পড়ুন, খুবই বেসিক ব্যবস্থা, নেচার শুষে ফেরা, সোমবার থেকে আবার কার্বনে নিঃশ্বাস।

চাইলে পুরো ব্যবস্থাটাই করে দিতে পারে ট্র্যাভেল অ্যান্ড বিয়ন্ড। ৯৮৩১০৩০৭০২।

ছবি: লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here