এ বার রথ দেখতে চলুন গুপ্তিপাড়ায়

0
6992
শম্ভু সেন

এই মাত্র এক পশলা জোর বৃষ্টি হয়ে আকাশটা ধুয়ে গেল। মেঘের ঘোমটা উধাও। লাজুক সূর্য উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। ট্রেন থেকে নামতেই একটা সোঁদা গন্ধ ভেসে এল – প্ল্যাটফর্মের ভিজে লাল মোরাম থেকে উঠছে গন্ধটা। কেমন একটা ভালো লাগায় ভরে গেল মনটা। ওভারব্রিজের মাথা থেকে চারিদিকে দৃষ্টি চারিয়ে দিলাম – সবুজ, স্নিগ্ধ, তাজা যেন সব কিছু।

এলাম গুপ্তিপাড়ায়, বারো ইয়ারের গুপ্তিপাড়ায়, কাঁচাগোল্লার গুপ্তিপাড়ায়। এই গুপ্তিপাড়াতেই ১৭৫৯ সালে বারো জন ব্রাহ্মণ চাঁদা তুলে জগদ্ধাত্রী, মতান্তরে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। সালটা ১৭৫৯ হতে পারে অথবা ১৭৬১ কিংবা ১৭৯০। সে যাই হোক, গুপ্তিপাড়াতেই যে বাংলার বারোয়ারি পুজোর সূত্রপাত তাতে মতান্তর নেই। আপাতত অবশ্য আসা বারোয়ারির সন্ধানে নয়, গুপ্তিপাড়ার মঠ দর্শনে আর রথের প্রস্তুতি দেখতে।

আটসকাল। চায়ের তেষ্টায় মন আনচান। পথের সুলুকসন্ধানও করতে হবে। এই বাসনায় ঢুকে গেলাম চায়ের দোকানে। কী ভাবে যাব গুপ্তিপাড়ার মঠে? উড়ে এল নানা পরামর্শ। কেউ বললেন রিকশায় যেতে, কেউ বা বাস ধরতে বললেন। চুঁচুড়া-কালনা রুটের বাস নাকি এখান দিয়েই যায়। কেউ বা পরামর্শ দিলেন হাঁটা লাগাতে। কতটুকুই বা পথ! মেরেকেটে দেড় কিলোমিটার।

যা-ই হোক রিকশারই সওয়ার হলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম রথতলায়। দিন তিনেক পরেই রথ, সাজানোর কাজ চলছে। ন’টি চূড়া বিশিষ্ট কাঠের রথ। সারা বছর এই রথ টিন দিয়ে ঘেরা থাকে। কাছেই দেশকালীমাতা মন্দির দর্শন মুলতুবি রেখে ঢুকে পড়লাম মঠ এলাকায়।

মঠ এলাকা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। প্রাঙ্গণের উত্তর অংশে চারটি মন্দির, দক্ষিণ অংশে ভোগের ঘর, মঠবাসীদের থাকার ঘর। মন্দির এলাকায় ঢুকলেই তোরণ। তোরণের বাঁ দিকে কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দির। উঁচু ভিত্তিবেদির ওপর মন্দির, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। মঠ এলাকার সব মন্দিরে আলাদা আলাদা সিঁড়ি নেই। কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দির বাংলার আটচালা রীতির। মন্দিরের তিনটি খিলান, রয়েছে অলিন্দ। পুবমুখী এই মন্দিরে টেরাকোটার কাজ অল্পই।

কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দিরের সামনের রোয়াক ধরে উত্তর দিকে এগোলে বাঁ দিকে চৈতন্যদেবের মন্দির। উঁচু ভিত্তিবেদির ওপর স্থাপিত এই মন্দিরটি জোড়বাংলো স্থাপত্যের নিদর্শন। এতেও রয়েছে টেরাকোটা কাজ, তবে অবহেলা-উপেক্ষায় বেশির ভাগই নষ্ট। ভিতরে রয়েছে গৌর-নিতাইয়ের দারু বিগ্রহ।

ওই একই রোয়াক ধরে উত্তর দিকে একটু এগিয়ে ডান দিকে ঘুরলে বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দির। আটচালার এই মন্দিরে টেরাকোটার কাজ খুব একটা নেই, তবে মন্দিরের বাইরের ও ভিতরের দেওয়ালে, সিলিঙে এবং গর্ভগৃহের মধ্যে রয়েছে সুন্দর ফ্রেস্কোর কাজ।

বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দিরের সামনের রোয়াক ধরে পুব দিকে এগিয়ে ডান দিকে ঘুরলে রামচন্দ্রের মন্দির। গুপ্তিপাড়ার মঠের সব চেয়ে সুন্দর মন্দির। এক শিখরবিশিষ্ট চার চালার অষ্টকোণী মন্দিরটি পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ টেরাকোটা মন্দির। এর দেওয়ালে ও শিখরে পোড়ামাটির কাজ দেখার মতো। পোড়ামাটিতে উৎকীর্ণ আছে নানা দেবদেবীর মূর্তি, রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি, বৈষ্ণবদের নানা আখ্যান, এমনকি দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দিক। সাত ফুট বেদির ওপর মন্দিরটি তৈরি। তিন খিলানযুক্ত দক্ষিণমুখী প্রবেশপথ। তার পরেই ঘেরা বারান্দার পিছনেই গর্ভগৃহ। রয়েছে রাম-সীতা-লক্ষ্মণ-হনুমানের কাঠের বিগ্রহ।

মঠের চারটি মন্দিরই ইটের তৈরি সাঁকো দিয়ে জোড়া। ফলে একটি থেকে আরেকটি সহজেই যাতায়াত করা যায়।

মন্দিরগুলোর বয়স কত? কিছুটা আন্দাজ দিলেন মঠের মোহান্ত। তাঁর হিসাব, চৈতন্যদেবের মন্দির সব চেয়ে পুরোনো – সতেরো শতকের মাঝামাঝি এটি তৈরি করান রাজা বিশ্বেশ্বর রায়। কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দিরটি তৈরি হয় বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁয়ের আমলে। আঠারো শতকের শেষ দিকে রামচন্দ্র ও বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির তৈরি করান শেওড়াফুলির রাজা হরিশচন্দ্র রায়।

মন্দির দর্শন সেরে ফের এলাম রথের প্রস্তুতি-কাজ দেখতে। এখানকার মানুষের দাবি, মাহেশ ছাড়া এত বড়ো রথ পশ্চিমবঙ্গে আর নেই। ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এখানে রথযাত্রার সূচনা হয়। গোড়ার দিকে রথের তেরোটি চূড়া ছিল। ১৮৭৩ সালে একটি দুর্ঘটনার পর তখনকার মঠাধীশ ওই বিশাল রথ ভেঙে ছোটো করে দেন। তখন থেকেই ন’ চূড়াবিশিষ্ট রথ চালু রয়েছে। রথ যায় বড়োবাজারের কাছে মাসির বাড়িতে।

তবে গুপ্তিপাড়ার রথের সব চেয়ে বড়ো আকর্ষণ ‘ভাণ্ডারা লুঠ’। উলটোরথের আগের দিন দুপুরে প্রথামাফিক ভোগ নিবেদনের পর মাসির বাড়ির চার দরজাবিশিষ্ট নাটমন্দিরের তিনটি দরজা খুলে দেওয়া হয়। দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকে নানা ধরনের মিষ্টি, অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য লুঠ করে নেন। এটাই হল ‘ভাণ্ডারা লুঠ’।

রথযাত্রা উপলক্ষে বিশাল মেলা বসে। মেলার মাঠ ছাপিয়ে রাস্তার ধারে। মাসির বাড়ি পর্যন্ত অস্থায়ী দোকান বসে যায়। সেখান থেকে যা-ই কিনুন, গুপ্তিপাড়ার বিখ্যাত গুপো সন্দেশের স্বাদ নিতে ভুলবেন না।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে গুপ্তিপাড়া ৭৬ কিমি। কাটোয়া লোকালে পৌনে দু’ ঘণ্টার পথ। স্টেশন থেকে রিকশা বা বাসে রথতলা। গাড়িতে জিটি রোড বা দিল্লি রোড, তার পর ৬ নম্বর রাজ্য সড়ক ধরে গুপ্তিপাড়ার রথতলা। তবে রথের দিন গাড়ি রথতলা পর্যন্ত যাবে না। আগেই পার্কিং করতে হবে।

শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে শান্তিপুর গিয়ে সেখান থেকে ভেসেলে গঙ্গা পেরিয়ে গুপ্তিপাড়া যাওয়া যাবে। শান্তিপুর-গুপ্তিপাড়া পারাপারের জন্য নিয়মিত ভুটভুটি চলে। কিন্তু এ বার যাত্রীসাধারণের নিরাপত্তার কথা ভেবে রাজ্য সরকার ভেসেল চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here