মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

নামের সঙ্গে প্রথম আলাপ সহজ পাঠের পাতায়। আর্মানি গির্জা। জোড়াসাঁকো থেকে তখন গির্জার ঘণ্টা শোনা যেত। এখনও কি যায়? এখন অবশ্য বুধবার ছাড়া প্রতি ঘণ্টায় জানানও দেয় না ঘড়ি। বড়বাজারের ঘিঞ্জি অলিগলি দিয়ে যাওয়ার সময় একবারও মনে হয়নি কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলবে প্রায় চারশো বছরের পুরোনো ইতিহাস। আজকের কলকাতা যখন তৈরি হয়নি, সেই সময়কার গল্প বলব আজ। গির্জা চত্বরে ঢুকে পড়লে আর কোনো আওয়াজই নেই। চার পাশ কত শান্ত। কলকাতার এই এক অদ্ভুত মজা। খোপে খোপে ভাগ করা এক একটা সময় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে এই মহানগরে।

গির্জার নামেই রাস্তার নাম। আর্মেনিয়ান স্ট্রিট। গির্জার বয়স ৩১০ বছর। কলকাতার সব চেয়ে পুরোনো গির্জা এটি। ১৬৮৮ সালে তৈরি এই গির্জার প্রথম স্থাপত্যটি ছিল কাঠের। শোনা যায় আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর ১৭০৭ সালে এখনকার চেহারায় আসে ‘আর্মেনিয়ান চার্চ অব দ্য হোলি নাজারেথ’। ১৭২৪ সালে চার্চের মাথায় চুড়োটি তৈরি করেন আগা নজর। ১৬৮৮!! একটু ভেবে দেখুন, কলকাতার রূপকার জোব চার্নক কলকাতায় এসেছিলেন ১৬৯০-তে। অর্থাৎ কলকাতা তার এখনকার চেহারা পাওয়ার দু’বছর আগেই সেখানে তৈরি হয়ে গিয়েছে গির্জা। খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে বাংলার পরিচয় কিন্তু আর্মেনিয়ানদের হাত ধরেই, ব্রিটিশরা আসার অনেক আগে।

হোলি নাজারেথ চত্বরে গির্জা হওয়ার আগে ওটি ছিল আর্মেনিয়ানদের সমাধিক্ষেত্র। বছর কয়েক আগে গির্জা চত্বরে ১৬৩০ সালের একটি সমাধি আবিষ্কৃত হয়। সমাধিটি আর্মেনিয়ান মহিলা রেজাবেবাহ্‌-এর। ওঁর স্বামী কলকাতায় পরিচিত ছিলেন ‘চ্যারিটেবল’ সুকিয়া নামে। রেজাবেবাহ্‌-র সমাধিটি এখন পর্যন্ত পাওয়া বাংলার প্রাচীনতম খ্রিস্টান সমাধি। কলকাতার মাটিতে ১৬৩০-এর জুলাই মাসে ঘুমিয়ে পড়ার আগে বেশ কিছু বছর এখানে ছিলেন নিশ্চয়ই তিনি। ইংরেজরা তখন কোথায়? আর মাস কয়েকের মধ্যে পৃথিবীর আলো দেখবেন জোব চার্নক। আর তারও প্রায় ষাট বছর পর তাঁর জাহাজ নোঙর ফেলবে বাংলায়। অথচ স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও কিন্তু স্বাধীন হয়নি ইতিহাস। এখনও কলকাতার ইতিহাস রয়ে গেছে তিনশো বছরের পুরোনো।

গির্জার স্থাপত্যে জাঁকজমক নেই তেমন। উপাসনা ভবনের লাগোয়া স্মৃতিসৌধটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত ১০ লক্ষেরও বেশি আর্মেনীয় সৈনিকের স্মরণে তৈরি। প্রতি রবিবার সকাল ৯টা থেকে ১১টা প্রার্থনা হয় গির্জায়। শহরে যে ক’টি হাতে গোনা আর্মেনীয় পরিবার রয়েছে, প্রার্থনায় অংশ নেন। আমরা অনেকেই জানি না, ২৫ ডিসেম্বর নয়, আর্মেনিয়ার মানুষ বড়োদিন উদযাপন করেন জানুয়ারির ৬ তারিখ।। আমাদের কলকাতার হোলি নাজারেথেও নিয়মটা সে রকমই। কিন্তু কেন? খ্রিস্টধর্ম নিয়ে চর্চা করা গবেষকরা বলেন, যিশুর জন্মের আসল দিনটি কেউ জানত না। চতুর্থ শতক পর্যন্ত খ্রিস্টধর্মাবলম্বী প্রতিটি দেশ জানুয়ারির ৬ তারিখেই যিশুর জন্মোৎসব উদযাপন করত। ২৫ ডিসেম্বর পালন করা হত পেগান উৎসব। ওই দিনটিকে সূর্যের জন্মদিন হিসেবে মানা হত অনেক দেশেই। দিনটির গুরুত্ব যাতে চাপা পড়ে যায়, তাই রোমান গির্জা কর্তৃপক্ষ সারা পৃথিবী জুড়ে ২৫ ডিসেম্বর দিনটিকে যিশুর জন্মদিন হিসেবে ঘোষণা করে দেন। বাদ পড়ে রইল শুধু আর্মেনিয়া। তার পেছনেও অবশ্য দু’টো কারণ। এক, আর্মেনিয়ায় পেগান উৎসবের প্রচলন ছিল না। দুই, এটি রোমান চার্চের শাখা নয়। ব্যাস, সেই থেকে আজও ৬ জানুয়ারি বড়োদিন উদযাপিত হয় আর্মেনিয়ায় এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা যে কোনো আর্মেনীয় গির্জায়।

এশিয়া এবং ইয়োরোপের সীমান্তে ককেশীয় পার্বত্য অঞ্চল থেকে এঁরা ভারতে এসেছিলেন। মূলত ব্যবসা করে এ দেশে প্রচুর নাম ডাক হয়েছিল আর্মেনীয়দের। কিন্তু বণিকের মানদণ্ড শাসকের রাজদণ্ডে বদলে ফেলার ইচ্ছেটা এঁদের কোনো দিনই ছিল না। ইতিহাস বলছে, মুঘল এবং ইংরেজ কারোর সঙ্গেই সম্পর্ক খারাপ ছিল না আর্মেনীয়দের। সম্রাট আকবর খুব খাতির করতেন এঁদের। তাঁর শাসনকালে আগ্রায় তৈরি হয় আর্মেনীয় গির্জা। ভারতে পশম, আয়না, বন্দুক আমদানি করতেন এঁরা। বদলে দেশ থেকে নিয়ে যেতেন সুতির কাপড়, মশলা, মুক্তো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতের সঙ্গে ব্যবসা করার ব্যাপারেও এঁরাই সাহায্য করেছিলেন। ভুল করেছিলে হে আর্মেনীয়, ভুল করেছিলে। যে স্বীকৃতি তোমার পাওয়ার কথা ছিল, পাওনি। অতি সযত্নে, নিপুণ ভাবে ঔপনিবেশিকতার ছায়ায় লালিত এবং চর্চিত হয়েছে কলকাতার ইতিহাস। কলকাতা থেকেছে তিনশো বছরের পুরোনো হয়ে, আজও।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here