উদয়ন লাহিড়ী

এলডোরাডো। সোনার শহর। এলডোরাডো হয়তো নেই, কিন্তু মানুষ এখনও খুঁজে চলেছে তার অস্তিত্ব।

সোনার নদী। যে নদীর তীরে সোনার সন্ধান আজও করে মানুষ। তাতেই নাকি তাদের রোজগার। খ্যাপা খুঁজে ফেরে…। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সবাই বুঝে গেছেন, কোন নদীর কথা বলছি। সুবর্ণরেখা।

সুবর্ণরেখার পারে দাঁড়িয়ে এই সব ভেবে চলেছি। রাঁচির কাছে পিসকা বলে একটা জায়গা আছে। সেটাই সুবর্ণরেখার উৎসস্থল। একটা সময়ে ওখানে নাকি সোনার খনি ছিল। তার থেকেই নদীর নাম সুবর্ণরেখা। দূরে দেখা যাচ্ছে গালুডি (আদত নাম গালুডিহি, মানুষের মুখে গালুডি) ব্যারাজ।

সুবর্ণরেখার পারে দাঁড়িয়ে আছি বটে, কিন্তু বেশিক্ষণ যে থাকতে পারব না, সেটা বেশ বুঝতে পারছি। প্রচণ্ড গরম। জামা ঘামে ভিজে যাচ্ছে। ভীষণ দুর্বল লাগছে। তবুও সুবর্ণরেখার পাস থেকে আসতেই ইচ্ছা করছে না। গালুডি ব্যারাজ থেকে জল ছাড়ছে। জলের উথালপাথাল চলছে।

সক্কালবেলা ইস্পাত ধরেছিলাম। ৬.৫৫-য় ট্রেন ছাড়ল। খড়্গপুর, ঝাড়গ্রাম, চাকুলিয়া, ঘাটশিলা পেরিয়ে গালুডি। ‌খড়্গপুর পেরোতেই প্রকৃতির পরিবর্তন। জঙ্গলের গাছেরা ভিড় করে কাছে এল। বুনো সুগন্ধটা আবার পেতে লাগলাম। ট্রেন থেকে ভূমি ক্রমে অনেক দূর অব্দি নেমে গেছে, আবার দিকচক্রবালে পাহাড়ের মতো উঠে গেছে। ঝাড়গ্রাম পেরোতেই পাহাড়রেখা। একটা পাহাড় নয়, অনেক।

জানি এক পলক চোখের পাতা ফেললেই অনেক কিছু খোয়াব। ট্রেনের গতি থাকলে চোখের পাতা খুলে রাখতেই হবে। ট্রেনের গতি তরুণের মতো। সেই তারুণ্যের গতিতে ভর করে গালুডি এলাম সকাল ১০.১৫-য়।

থাকার জায়গার ব্যবস্থা করাই ছিল। একটা অটো নিয়ে পৌঁছে গেলাম। জায়গাটা একটা টিলার ওপরে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে পেছন দিকটায় তাকিয়ে দেখি দূরে পাহাড়শ্রেণি। নীচে জঙ্গল। থাকার জায়গাটা বেশ ভালো।

ভীষণ প্যাচপ্যাচে গরম। শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি। ভীষণ কুঁড়েমি আর ঘুমে আমাদের পেয়ে বসছে। প্রথমে ভেবেছিলাম শুধু আমারই হচ্ছে। কিন্তু তা নয়। সবারই হচ্ছে এ রকম।

খেতে খেতে পৌনে একটা। তার আগে ঘুরে এলাম সুবর্ণরেখা ব্যারাজ। হেঁটে। যাওয়া-আসা প্রায় চার কিলোমিটার। তবে এই হেঁটে আত্মবিশ্বাসটা বাড়ল অনেকটাই। এখন দুর্বলতা যেন একটু কম।

চান করে একটু ভালো লাগলো। লাঞ্চ করে অটো নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে  ভালোপাহাড়।

গালুডি থেকে ৯ কিমি পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম বাংলায়। পুরুলিয়া জেলা। কুঁচিয়া, বান্দোয়ান। কমল চক্রবর্তী নামটি অনেকেরই জানা। শুরুটা তিনি করেছিলেন। তার কাজ এই অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। বনসৃজন, স্কুল, হাসপাতাল, সমাজসেবা ইত্যাদি। তাঁরই হাতে গড়া এই ভালোপাহাড়। ভালোপাহাড়ের ওয়েবসাইটে একটি ভারী সুন্দর কথা আছে — এ হল সেই জায়গা যেখানে আপনার ডানাগুলি বিশ্রাম পেতে পারে। সেই উদ্দেশ্যেই যাওয়া ভালোপাহাড়।

এখান থেকে চললাম দুয়ারসিনি। সেখানে যে বনবাংলোগুলো ছিল সেগুলো মাওবাদীরা বহু দিন আগে উড়িয়ে দিয়েছে। আর নতুন করে তৈরি হয়নি। এখন মাওবাদীদের সেই রমরমা আর নেই। দুয়ারসিনিতে একটা হোটেলও ছিল। দেখলাম সেটাও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আর এখানে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই।

দুয়ারসিনিতে শনিবারের হাট। নানা বিকিকিনি। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া। একটা ব্যাপারে খুব মজা লাগল। হাতে-তৈরি সাবান বিক্রি হচ্ছে। সাবান কিনলে একটি সিগারেট এবং একটি দেশলাই ফ্রি।

হাট থেকে একটু এগোলেই কালীমন্দির। তার নীচে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সাতগুরুং নদী। আগেও পথে সাতগুরুং নদী দেখেছি, কিন্তু তাচ্ছিল্য দেখিয়ে এগিয়ে গেছি। সেখানে নদী শান্ত। কিন্তু দুয়ারসিনিতে নদী পাথরে আটকে লাফ মেরে বাধা টপকেছে। তাই এখানে নদী বেশ দাপুটে। ভালো লেগে গেল লাফ-দিয়ে-চলা সাতগুরুং নদী। তারই গা ঘেঁষে রহস্যময় এক কালীমন্দির।

মেলা ঘুরে পিঁয়াজি খাওয়া আর তার সাথে চা। ফিরে চললাম গালুডি।

সন্ধেবেলা মাদলের তালে তালে নাচ হওয়ার কথা। কিন্তু তার বদলে যা হল সেটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ডিজে বক্স বাজিয়ে বিকৃত সুর, বিকট আওয়াজ করে মেয়েরা নাচল। বেশ কয়েকটা হিন্দি নাচের আদলে। দু-একটা নাচে আদিবাসী নৃত্যের ছোঁয়া। আমরা একেবারে আশাহত। এর জন্য চারশো টাকা করে দিয়েছি?

নাচের পরে শিল্পীদের ডাকা হল মুড়ি-ঘুগনি খাওয়ার জন্য। খুব বিরক্ত ছিলাম, তাই প্রথমে ওই দিকে পা মাড়াইনি। পরে মনে হল, যাই দেখেই আসি। অ্যালুমিনিয়ামের থালায় ওদের মুড়ি-ঘুগনি দেওয়া হয়েছে। মাটিতে বসেই ওরা খাচ্ছে। কিন্তু চোখেমুখে কী তৃপ্তি! থমকে গেলাম। ওরা যেন বিরিয়ানি, তন্দুর খেতে বসেছে। যেন অনেক দিন পর এ রকম ভুরিভোজ জুটেছে। ভারমুক্ত হয়ে গেলাম। এখন মনে হল চারশো টাকা দিয়েছি, বেশ করেছি। আরো বেশি দিলেও ক্ষতি ছিল না।  আর ওদের নাচ নিয়ে মনের মধ্যে যে অভিযোগ জমেছিল, সেটাও কেটে গেল নিমেষে।

পরদিন সক্কালে আমরা রেডি। যাচ্ছি বুরুডি আর ধারাগিরি। গালুডি থেকে বড়ো রাস্তা ধরে মিনিট কুড়িতে পৌঁছে গেলাম ঘাটশিলা। ওখান থেকে ফুলডুংড়ি থেকে বাঁ দিকের রাস্তা ধরলাম। এখন রাস্তা পিচের। বড়ো বড়ো গাড়ি যাচ্ছে। আগে যখন এসেছিলাম তখন পাথরের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলত অটো। সেটা যেন ছিল অনেক আদিম, অনেক প্রাকৃতিক। যা-ই হোক এগিয়ে চললাম। দু’পাশে ঘন জঙ্গল। সামনে কালো চুলের সিঁথির মতো রাস্তা।

এই অঞ্চলে তেমন বৃষ্টি হয় না। বুরুডির পাহাড়ঘেরা লেকটি তাই যেন বেশ খানিকটা শুকনো। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম জলের ধরে। দৃশ্য অপূর্ব। কিন্তু চার পাশটা খুব নোংরা। প্লাস্টিকের বোতল থেকে থার্মোকলের থালা। এ সব তো আমাদেই কীর্তি।

ওপরে ডিম ভাজাও বিক্রি হচ্ছে। সেখানে শুনলাম, “আরে বাবা কিছুই খায়নি, ডিম ভাজা দাও ওকে”। তা-ই শুনে গুটিগুটি পায় এগোলাম ধারাগিরির দিকে।

অটো পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরেই বেশ অনেকটা ওপরে উঠে এলাম। চারিদিকের দৃশ্য বর্ণনার চেষ্টা না করাই ভালো।

অটো পৌঁছল এক গ্রামে। সেখান এক দেহাতি মাসিকে পেলাম। সে আমাদের নিয়ে চলল ধারাগিরি। বেশ খানিকটা যাওয়ার পরে দেখলাম রাস্তা দিয়েই আসছে ধারাগিরির জল, কাদা। কাদা ভেঙে এগিয়ে চললাম। পা টিপে টিপে এগোতে হচ্ছে। রাস্তা পিছল। এক বার হড়কালে সামলাতে পারব না। পাগুলো কাঁপছে। শরীরের ব্যালান্স যে কমছে তা জানান দিচ্ছে পাগুলো, জানান দিচ্ছে যে প্রতিটা কোষের বয়েস বেড়েছে। আজকের প্রতিবন্ধকতা কালকের অভ্যেস।

কোনো রকমে পৌঁছলাম। ঝরনাটি ভারী সুন্দর। নীচে বেশ বড় একটি কুণ্ড তৈরি হয়েছে। বেশ কয়েক জন সেখানে নেমে পড়েছে চান করতে। কয়েকটি মেয়েও।

দেখলাম মাসি খুব রেগে কী বলছে। কোনো রকমে তার মর্মোদ্ধার করে ওদের বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম, যে এই জলই গ্রামের একমাত্র জলের উৎস। এই জলই ওরা খায়। চান করলে জল দূষিত হবে আর সেই দূষিত জল গ্রামের মানুষগুলো খাবে। তাই গ্রামের লোকেরা ধারাগিরিকে ঠাকুর বলে মানে। একটি মেয়ের প্রশ্ন, “চান করলেই কি দূষিত হয়?” আর কথা বাড়ালাম না। তবে পরে মনে হল হয়তো আমার কথা বুঝল ওরা, উঠে পড়ল।

ফিরে চললাম। মাসিকে বললাম, ছবি তুলব। মাসি শাড়িটাকে বেশ করে জড়িয়ে নিল, ছবি তোলা হল। গ্রামে পৌঁছে অটোতে উঠে বসলাম। সেই দেহাতি মাসি হাসছে, আর হাত নাড়ছে। এক নির্ভেজাল হাসি।

ইস্পাত এক্সপ্রেস একটু দেরিতেই এল। খড়্গপুরে বসার জায়গা পেলাম। মোবাইলে দেখতে শুরু করলাম ‘সুবর্ণরেখা’। এই নদীটির সৃষ্টিকর্তার নাম ঋত্বিক ঘটক।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে ইস্পাত এলস্প্রেস, সকাল ৬.৫৫-য় ছেড়ে গালুডি সকাল সওয়া ১০টায়। ফেরার ইস্পাত গালুডিতে বিকেল ৩.০৮-এ। শালিমার থেকে এলটিটি এক্সপ্রেস বিকেল ৩টেয়, গালুডি পৌঁছয় সন্ধে ৭.২১-এ। ফেরার এলটিটি এক্সপ্রেস গালুডিতে সকাল ৭.৪২-এ। সড়কপথে গালুডি কলকাতা থেকে ২৩৫ কিমি মতো। রাস্তা জাতীয় সড়ক ৬, তার পর জাতীয় সড়ক ৩৩ ধরে। জামশেদপুর থেকে ৪২ কিমি।

কোথায় থাকবেন

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকার কিছু জায়গা আছে গালুডিতে –

(১) গালুডি রিসর্ট (০৬৫৩৭ ২৩০১১৬৯, ০৬৫৩৭ ৬৫৩৩০৬৮, ০৯৪৩১৩৮১৫৫৬)

(২) রজনীগন্ধা গেস্ট হাউস (০৯৮৩১০৪৭৭০৯, ০৯৮৭৪৭৪২৬৭৯, ই-মেল [email protected])

(৩) কেডি প্যালেস (৯৮৩০৬৭৪৩২০, ২৬৭৭১১১৯, ২৬৭৭১১১৭)

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here