অসীম সেন

(গুরুদংমার হ্রদ ও ইয়ুংথাং পর্বের পর)

গ্যাংটকের হোটেল থেকে একটা খাড়া রাস্তা ধরে একটু হেঁটেই এম জি মার্গ । দুপাশে সাজানো দোকান। অনেকটা বিদেশ বিদেশ ধাঁচে। একটু ঘোরাঘুরি করলেন,  একটা দিন হোটেলে না খেয়ে খান চাচার দোকানের বিরিয়ানি দিয়ে রাতের খাবার সারুন। রাতে হোটেলে একটু গল্প। সকাল সাতটায় গাড়ি ছাঙ্গুর উদ্দেশে। গ্যাংটক থেকে ওল্ড বাবা মন্দির বা বাবার বাঙ্কার প্রায় ৬০ কিলোমিটার। গাড়ি চলছে। একই রাস্তায় তিনটি ঘোরার জায়গা ছাঙ্গু হ্রদ, নতুন বাবা মন্দির আর পুরানো বাবামন্দির বা বাবার বাঙ্কার। যদি আবহাওয়া ভালো থাকে তাহলে যাবার সময় ছাঙ্গু লেকে দাঁড়িয়ে যাওয়াই নিয়ম। গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু লেক ৪০ কিলোমিটারের মতন। ছাঙ্গু লেকের স্থানীয় নাম সোমগো। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই লেক রঙ পরিবর্তন করে। বছরের বেশিরভাগ সময়ে এই লেক বরফে ঢাকা থাকলেও এখন নীল জল টলটলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২ হাজার ৩১৩ ফুট ওপরে এই হ্রদটিকে স্থানীয় ভাষায় বলে সোমোগো যার অর্থ হল সব হ্রদের উৎস। ছাঙ্গু ঘিরে থাকা পাহাড়ের চূড়া গোটা বছর বরফে ঢাকা। ইয়াকের পিঠে চড়ে পিছনে নীল ছাঙ্গু আর ধূসর সাদার মিশেল পাহাড়কে রেখে একটি ছবি আপনার অ্যালবামে থাকুক স্মৃতি হিসেবে।

আরও পড়ুন: গরমে সিকিমে: গুরুদংমার হ্রদ

ছাঙ্গু থেকে বাবা মন্দিরের দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। বাবামন্দির কিন্তু কোনও দেবতার মন্দির নয়। এখানে রয়েছে একটি মানুষের দেবতা হয়ে ওঠার কাহিনি। পঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈনিক হরভজন সিং ১৯৬৮ সালে ইন্দো-চিন লড়াইয়ে মারা গিয়েছিলেন নাথুলা পাসের কাছে। ইন্দো-চিন লড়াইয়ে সৈনিকদের জন্য একটি টিম খাদ্য সরবরাহ করছিল অসম্ভব দুর্গম এক পথ দিয়ে, সেই দলের লিডার ছিলেন হরভজন সিং। পথে এক হিমবাহ চাপা পড়ে মারা যান তিনি। তবে স্থানীয় মানুষ থেকে সৈনিক, প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেন এখনও ভীষন ভাবে আছেন তিনি। কোনও পর্যটক বা সৈনিক বিপদে পড়লে আজও তাঁকে পথ দেখান বাবা হরভজন সিং। মৃত্যুর পরেও হরভজন সিং তাঁর কর্তব্য পালন করেছেন। সেনাবাহিনীতে তাঁর পদোন্নতিও ঘটেছে, বর্তমানে হরভজন সিং- এর পেনশন পান তার বাড়ির লোক।

দুটি বাবা মন্দির আছে। একটি ওল্ড বাবা মন্দির একটি নিউ বাবা মন্দির। আপনার সঙ্গে আপনার গাড়ির চুক্তি নতুন মন্দির পর্যন্ত। পুরোনো মন্দিরে যেতে হলে আপনাকে অতিরিক্ত ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হবে। নতুন বাবামন্দিরের পিছনেই রয়েছে একটি পাহাড়ি ঝোড়া। অপূর্ব দৃশ্য। কাছেই একটি শিব মন্দির। পাহাড়, বরফ, ঝরনা। সবমিলিয়ে মন ভালো করার পুরো বন্দোবস্ত। নতুন বাবা মন্দির থেকে পুরোনো বাবা মন্দিরের দুরত্ব ১১ কিলোমিটার। কালো পিচের রাস্তায় দৌড়াচ্ছে আপনার গাড়ি। হয়তো একটু আগেই বৃষ্টি এসেছিল পাহাড়ে। ডান দিকের অতল খাদে মেঘ জমেছে। ওপারের পাহাড়ে ঝিকমিক করছে রোদ্দুর। পুরোনো বাবা মন্দিরের পাশে জুতো খুলে ওদের দেওয়া  চপ্পল পড়ে নিন। ভুলেও বীরত্ব দেখিয়ে খালি পায়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। পরিবেশ প্রচন্ড ঠান্ডা। এখানেই রয়েছে বাবার বাঙ্কার। সিঁড়ি বেয়ে বেশ কিছুটা ওপরে উঠতে হয়। বেশি তাড়াহুড়ো করে ভিতরে ঢুকতে যাবেন না। অক্সিজেন এখানে বড়ই দামি। অপেক্ষা করুন, লাইন মানুন। বাঙ্কারের ভিতরের মানুষ বাইরে বেরোলে ভিতরে ঢুকুন। বাঙ্কারের ভিতরে বাবার বিছানা। চেয়ার টেবিল সব সাজানো আছে আগে যেমন ছিল, কে বলবে মানুষটা আজ নেই। তিনি আছেন, ভীষণ ভাবে আছেন। একটা কথা না বললেই নয়। এখানে মানুষ মানত করেন মিনারেল ওয়াটারের বোতল দিয়ে। মন বললে আপনিও কিছু মানত করতেই পারেন।

আরও পড়ুন: গরমে সিকিমে: ইয়ুংথাং

পুরোনো বাবা মন্দির থেকে গ্যাংটক ফিরতে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা। পরের দিন সকালে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে পরুন গ্যাংটক শহরটাকে ভালোভাবে দেখতে। ১২ টায় খাওয়াদাওয়া করে হোটেল  ছেড়ে স্থানীয় ট্যাক্সিতে করে বেরিয়ে পড়ুন নিউজলপাইগুড়ির গাড়ি ধরার জন্য। গ্যাংটকে একটি বিষয় মনে রাখবেন, এখানে সব দূরপাল্লার গাড়ি আসবে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড পর্যন্ত। সেখান থেকে হোটেল যেতে স্থানীয় ট্যাক্সি ধরতে হবে। খরচ পড়বে গাড়ি পিছু ২০০ টাকার মতন। আবার পাহাড় বেয়ে নীচে নামা। রাস্তায় সেবক ব্রিজ আসার আগেই গরম পোশাক খসে পড়েছে শরীর থেকে। ইচ্ছা করলে রাস্তায় একটু সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বল তিস্তায় রাফটিং করতেই পারেন। এ এক অন্য অভিজ্ঞতা। নিউজলপাইগুড়ি যখন পৌঁছবেন তখন প্রায় বিকেল পেরিয়ে গেছে। ট্রেন ধরার জন্য হাতে বেশ কিছুটা সময় থাকলে, স্টেশনে মালপত্র রেখে একটি অটো নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন হংকং মার্কেট। এরপর ট্রেন ছাড়বে। আবার অফিস আবার ফাইল আবার গতানুগতিক আপনার জীবন।

ছবি: লেখক ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগৃহীত

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here