অসীম সেন

প্রথমেই কাজের কথাটা সেরে নেওয়া যাক। সিকিম যেতে হলে প্রথমেই পৌঁছতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি। কলকাতা থেকে রাতের দিকের যেকোনো ট্রেনে উঠে পড়লে পরের দিন সকালে নিউ জলপাইগুড়ি। কলকাতা থেকে ট্রেনের ভাড়া, সেকেন্ড ক্লাস স্লিপারের কমবেশি ৪০০ টাকার মতন। ট্রেন না হলে বাসে শিলিগুড়ি গিয়েও ম্যানেজ করা যায়। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে গ্যাংটক যাওয়ার একটি গাড়ি ভাড়া করে নিলেই হবে। সরকারি প্রিপেড ট্যাক্সিও নিতে পারেন। ভাড়া ২০০০ টাকা। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গ্যাংটকের দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। পৌঁছতে লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা।

কিছুদূর এগোতেই শহর ছেড়ে গাড়ি পাহাড়ি পথে। গাড়ির বাঁ দিকে পাথরের দেওয়াল, ডান দিকে অতল শূন্য। অনেক নীচে রুপোর ফিতের মতো কিশোরী তিস্তা। সমতলের ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। গায়ে হালকা একটা চাদর। ট্রেন লেট না করলে গ্যাংটক পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল। মাঝে মাঝে গাড়ি চালানোতে ছেদ পড়তে বাধ্য। কারণ তখন আপনি সেলফি তুলছেন পাহাড়ের সঙ্গে। অথবা চেখে নিচ্ছেন মোমোর স্বাদ। যারা প্রথম বার গ্যাংটক এলেন তাদের কাছে পুরো বিষয়টাই অনাঘ্রাতা জুঁইফুলের মতন। অনুভূতি কিছুতেই ছেড়ে যেতে চায় না। পাহাড়ের ধাপে গোটা শহর। সন্ধ্যা নামতেই কে বা কারা যেন হাজার হাজার বাতির মালা সাজিয়ে দিয়েছে পাহাড়ে।

হোটেলে ঢুকে ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে পড়ুন স্থানীয় বাজারে। হালকা কিছু বাজার, স্মৃতিরক্ষার তাগিদে। পরের দিন গুরদম্বার উদ্দেশে যাত্রা। হোটেলে কথা বললেই আপনার গাড়ির ব্যবস্থা করে দেবে। এ ক্ষেত্রে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রত্যেকের চার কপি করে পাসপোর্ট ছবি এবং ভোটার কার্ডের চারটি ফটোকপি নিতে ভুলবেন না। সিকিমে প্রতিটি মুহূর্তে আপনার বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন। যদিও অনুমতির বিষয়টা পুরোটাই আপনার হোটেল বুঝে নেবে। সকালে টিফিন করে ১০টার মধ্যে উঠে পড়ুন গাড়িতে। গুরুদংমার যেতে হলে রাত কাটাতে হবে লাচেনে। লাচেনে সব সময়ই বেশ শীত। সুতরাং যথেষ্ট গরম জামাকাপড় নিতে ভুলবেন না। গ্যাংটক থেকে লাচেনের দূরত্ব একশ দশ কিলোমিটারের মতো। সময় লাগে প্রায় পাঁচ ঘন্টা। পুরো রাস্তাটাই একটি অভিজ্ঞতা। রাস্তায় নাম না জানা অসংখ্য পাহাড়ি ঝোড়া। আপনাকে ঘিরে রয়েছে বরফি পাহাড়। রাস্তার প্রতিটি বাঁকে সঙ্গী তিস্তা। লাচেনে পৌঁছিয়ে সোজা হোটেলে। পরের দিন সকাল চারটের মধ্যে গড়াতে হবে গাড়ির চাকা।

এক্ষেত্রে কয়েকটি দরকারি কথা বলে নেওয়া যাক। গুরুদংমার হ্রদটির উচ্চতা ১৭ হাজার ৮০০ ফুট বা ৫ হাজার ৪৩০ মিটার। হ্রদটি বুদ্ধ এবং শিখ উভয় সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্যই অতি পবিত্র। কথিত আছে বৌদ্ধ ধর্মগুরু পদ্মসম্ভবা অষ্টম শতকে এই হ্রদটি পার করেছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে গুরু নানকও এই হ্রদ দর্শনে এসেছিলেন। উচ্চতার জন্য এখানে অক্সিজেনের অভাব ঘটতে পারে। কতগুলি বিষয় একটু মাথায় রাখবেন। কলকাতা থেকে আসার সময়ে শ্বাসকষ্টের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ আনতে ভুলবেন না। পাহাড়ে এই সমস্যার জন্য হোমিওপ্যাথি ওষুধ কোকা থারটি খুবই জনপ্রিয়। এছাড়াও প্রচুর চকলেট আর পপকর্ন নিয়ে আসবেন। কিছুটা কর্পুর নিয়ে আসবেন। শ্বাসকষ্টে আরাম পাবেন।

ভোর চারটেয় হোটেল থেকে বেরিয়ে প্রথমে ঠান্ডার ধাক্কা সামলাতে কেটে যাবে বেশ কিছুটা সময়। গাড়ির কাচে আছড়ে পড়ছে মেঘ। লাচেন থেকে গুরুদংমারের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটারের মতন। পাহাড়ি ধ্বসে রাস্তাটি বেশ খারাপ। মাঝে মাঝেই মিলিটারি ক্যাম্প। যে কোনও অসুবিধা বোধ করলে এদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে উপকার পাবেন। শেষ ২ কিলোমিটারের মতন বেশ ভালো রাস্তা। আপনার চারপাশের পাহাড়ের বরফে সূর্যকিরণ ছিটকে পড়ে সোনার বরণ নিয়েছে। সাদা পাহাড়। নীল আকাশ, হলুদ রোদ। গুরুদম্বা হ্রদের স্বচ্ছ জলে ওপরের আকাশের ছবি। জলে ঢেউ নেই। বছরের অন্যান্য সময়ে এই হ্রদ পুরোটাই বরফে ঢাকা থাকলেও এ সময়ে পরিষ্কার থাকার সম্ভাবনাই বেই। আনন্দে মাতোয়ারা হতেই পারেন কিন্তু দৌড় ঝাঁপ একেবারেই চলবে না। হাঁপ ধরার সম্ভাবনা প্রবল। বরং দুচোখ ভরে বন্দি করুন প্রকৃতিকে। ফ্লাক্সে করে চা নিয়ে যেতে পারেন। আধঘণ্টা- একঘন্টা হ্রদের সৌন্দর্য উপলব্ধি করে এবার ফেরার পালা। আবার ঝাঁকুনি পূ্র্ণ রাস্তায় বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে। হোটেলে খাওয়া দাওয়া শেষ করে রওনা দিতে হবে লাচুং এর পথে। লাচেন থেকে লাচুং এর দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারের মতন। (ক্রমশ)

ছবি: লেখক

1 মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here