IMG_7247শম্ভু সেন

ঘ্যাট ঘ্যাট করতে করতে ভ্যানোটা বন্ধ হয়ে গেল। পথের সামান্য চড়াইটুকু ভাঙতে পারল না।

যদি হয় সুজন, তেঁতুলপাতায় ন’জন। এখানে আরও বেশি –– তেরো জন। অর্থাৎ এক ভ্যানোতে তেরো জন সওয়ার। এখানকার নিয়ম এটা। কিন্তু তেরো কোথায়, আমরা তো মোটে পাঁচ জন। এই পাঁচের প্যাঁচেই কাত ভ্যানো !

কেন ? জুতসই জবাব দিতে পারল না ভ্যানো-পাইলট রাজু। অগত্যা ভ্যানো থেকে নেমে হাঁটা। চড়াইটুকু চড়তেই বুঝলাম তীরে এসে তরী ডুবিয়েছে রাজু। গন্তব্যে প্রায় পৌঁছেই গিয়েছিল সে। পার্কিং-এর জায়গা থেকে মাত্র কয়েক হাত আগে বেঁকে বসল রাজুর ভ্যানো। গাড়ির পথ এখানেই শেষ। বাকি পথ হাঁটা।

রাজুকে পাকড়াও করেছিলাম ওল্ড দিঘায়। যাতায়াত ৩০০ টাকায় রফা হয়েছিল। এত কেন ? রাজু বুঝিয়েছিল, এক ভ্যানোতে ১৩ জন ওঠে। শেয়ারে গেলে টাকাটা ভাগ হয়ে যায়, গায়ে লাগে না। কিন্তু আমরা তো মোটে পাঁচ জন। অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে যাবও না। তাই ভাড়াটা বেশি মনে হচ্ছে। রাজুর যুক্তিটা নেহাত ফেলে দেওয়া যায় না।

দিঘা ছড়াতে ছড়াতে এখন কোথায় গেছে, থই পাওয়া যায় না। নিউ দিঘাও এখন ওল্ড। ফোরশোর রোডের দু’ দিকে, আশপাশের সমস্ত রাস্তায়, অলিগলিতে শুধুই হোটেল আর হলিডে হোম। বাঁ দিকে সায়েন্স সিটি পেরিয়ে এলাম। ফাঁকা জায়গা চোখেই পড়ে না। এ যে দেখছি, দিঘা ওড়িশা সীমানার কাছাকাছি চলে এসেছে। অবশেষে ডান দিকে কাজু উদ্যান আসার পর হাঁফ ছাড়লাম। যাক, চার কিলোমিটার দূরের কিয়াগেড়িয়াকে তা হলে এখনও গ্রাস করে নেয়নি দিঘা!

সীমানায় এসে বাঁ দিকের সেই পরিচিত পথ, যার ডান দিকে ওড়িশা আর বাঁ দিকে পশ্চিমবঙ্গ। সে দিকেই নজরে পড়ল পশ্চিমবঙ্গ মৎস্য উন্নয়ন নিগমের ওসিয়ানা টুরিস্ট কমপ্লেক্স। কোন রাজ্য এই পথের দেখভাল করে জানি না, তবে ভোল বদলেছে পথের। সেই পথের প্রায় সবটুকু পাড়ি দিয়ে বিগড়ে গেল রাজুর ভ্যানো।

কিন্তু সৈকতটা কি পিছিয়ে গেল ? আগে তো এতটা হাঁটতে হত না। গাড়ি নিয়ে সরাসরি নেমে যাওয়া যেত এই সৈকতে। বালিঢাকা পথের তলা দিয়ে পিচের চিহ্ন উঁকিঝুঁকি মারছিল। হাঁটতে হাঁটতে ডান দিকে চোখে পড়ল ‘তালসারি কোস্টাল থানা’, ওড়িশা সরকারের। বুঝলাম, এই থানা চালু হওয়ার পর কিছু বিধিনিয়ম চালু হয়েছে। এখন আর হুটহাট গাড়ি নিয়ে নেমে পড়া যায় না এই সৈকতে। সৈকতের কিছুটা আগেই ঘটে তাদের যাত্রাবিরতি।

সৈকতে নেমে দোকানদানির মধ্য দিয়ে পথ করে নিয়ে পৌঁছে গেলাম একেবারে জলের কিনারায়। এখন বোধহয় ভাটার টান, হাওয়াও তেমন জোরালো নয়। তাই ঢেউগুলোর তেমন জোশ নেই। অনেক আগেই ভাঙছে তারা। আপাতত তিরতির করে এসে পা ধুয়ে দিতেই তাদের আনন্দ।uday2

আনন্দের যেন হাট বসেছে এই সৈকতে। দিঘার সৈকতে একটা ভয়ের ভাব থাকে, অনেক বাধা, অনেক নিয়ম। এখানে এসে যেন সকলেরই প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে, ভয়-ভাবনার বাধা টুটেছে। এই শেষ বিকেলেও সমুদ্রে অবগাহনের আনন্দে মেতেছে অনেকে। মন ভরে জলকেলি করে পেট পুরে খাওয়া আর আড্ডা। সৈকতের দোকানগুলোর বেশির ভাগই নানা ধরনের খাবার সাজিয়ে বসে আছে। পৃষ্ঠপোষকের অভাব হচ্ছে না।

সৈকতে এখন মাছমারাদের কোনও কর্মকাণ্ড নেই। নানা বাহারের মাছধরা নৌকাগুলোর এখন বিশ্রামের সময়। সমুদ্রযাত্রা সাঙ্গ করে তারা ফিরে এসেছে দুপুরের পরেই। গভীর আলস্যে গা এলিয়ে পড়ে আছে সৈকতে। আবার তো বেরিয়ে পড়তে হবে শেষ রাতে, আলো ফোটার অনেক আগেই। জালে ধরা পড়া মাছের ঝাড়াই-বাছাই হয়ে গিয়েছে। মাছমারারা তাঁদের পসরা নিয়ে ফিরে গেছেন নিজেদের আস্তানায়।uday2

এই দোকানপাটের হাট ছাড়ালেই মাছধরা নৌকাগুলোর পার্কিং লট। তার পরেই, যে দিকে যাই, ডাইনে বা বাঁয়ে, কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। আর মোটরবাইকে সওয়ার হয়ে কিছুটা অন্তত উধাও হয়ে যাওয়ার জন্য এই সৈকতে রয়েছে বাইকবাহিনী। বাইকবাহিনী শুনলেই গা কেমন যেন ছমছম করে ওঠে না ? না, সে ভয় এখানে নেই। এখানে ওঁরা আছেন বিচ ড্রাইভিং-এ আপনাকে সঙ্গী করে তালসারি নিয়ে যাবেন বলে। বাঁ দিকে বিপুল জলরাশি আর ডান দিকে কুঠারাঘাত বা প্রকৃতির রোষ থেকে এখনও বেঁচে থাকা ঝাউবনকে সাক্ষী রেখে বাইকে সওয়ার হয়ে আপনি হবেন চলতি হাওয়ার পন্থী।        

ধীরে ধীরে বিকেলের আলো নরম হয়ে এল। কোস্টাল থানার গা ঘেঁষে যে ঝাউবন তার আড়ালে লুকিয়ে পড়ার তোড়জোড় শুরু করে দিলেন সূর্যদেব। আমরাও ক্যামেরা তাক করলাম। এক সময় টুক করে ডুব দিলেন তিনি। একটু একটু করে অন্ধকার নামল ওড়িশার প্রান্তে। আর বাংলার ভাগে যে ঝাউয়ের জঙ্গল তার ধার বরাবর পায়ে চলা পথে জ্বলে উঠল নিয়নের আলো। সৈকতের দোকানদানি সেজে উঠল বিদ্যুতের অস্থায়ী সংযোগে।

উদয়পুর কিন্তু খুব একটা পালটায়নি।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া, সাঁতরাগাছি, আসানসোল, মালদা টাউন, নিউ জলপাইগুড়ি, পুরী, বিশাখাপত্তনম থেকে ট্রেনে দিঘা। কলকাতা, হাওড়া-সহ রাজ্যের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে দিঘার বাস-সংযোগ আছে। কলকাতা থেকে গাড়িতে জাতীয় সড়ক ৬, মেচেদা, নন্দকুমার, কাঁথি বাইপাস হয়ে দিঘা। স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস, ভ্যানো বা গাড়িতে উদয়পুর, দূরত্ব ৩-৪ কিলোমিটার।  

কোথায় থাকবেন

উদয়পুরেই থাকার জন্য আছে পশ্চিমবঙ্গ বন দফতরের ওশিয়ানা টুরিস্ট কমপ্লেক্স। অনলাইন বুকিং wbsfdc.com । তবে দিঘায় থেকে সহজেই ঘুরে আসতে পারেন উদয়পুর। দিঘায় থাকার জায়গা অঢেল।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here