sudip kumar paul
সুদীপ কুমার পাল

ভেবেছিলাম ৫টায় উঠে আমি আর অপূর্বদা শান্তিনিকেতন রোডে একটু পদচারণা করব। কিন্তু উঠতে উঠতে প্রায় ৬টা। তড়িঘড়ি দরজা খুলে দেখি অপূর্বদাও বেরোচ্ছে।  দু’জনেই হেসে ফেললাম। পদচারণা হল না। উদয় আসবে সাড়ে ৭টায়। যা কিছু আছে আজই দেখে নিতে হবে। কাল তো ফেরা।

উদয় সময়মতো এল। আমরাও চা খেয়ে টোটোয়। প্রথম গন্তব্য কঙ্কালীতলা। যেতে যেতে একটা জঙ্গল দেখিয়ে উদয় জানাল এটা ডিয়ার পার্ক। অনেক বড়ো এলাকা, কিন্তু কোনো হরিণ চোখে পড়ল না।

আরও পড়ুন: তারাক্ষেত্র থেকে রবিক্ষেত্র ১ / আদি মূর্তি দর্শন হল না আজ

শান্তিনিকেতন থেকে কমবেশি ৭ কিমি রাস্তা পেরিয়ে এলাম কোপাই নদীর তীরে কঙ্কালীতলায়। অনেকে বলেন, কঙ্কালীতলা সতীপীঠ। তাঁদের মতে এখানে দেবীর কাঁকাল বা কোমরের হাড় পড়েছিল। বীরভূমের সতীপীঠ নিয়ে অবশ্য অনেক বিতর্ক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান ডঃ দীনেশচন্দ্র সরকারের মতে, কঙ্কালীতলা সতীপীঠ নয়। ডঃ হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্নের মতে, বক্রেশ্বর ছাড়া বীরভূমে কোনো সতীপীঠ নেই। বাকিগুলোয় হয় দেবীর আভরণ পড়েছে কিংবা কোনো সিদ্ধ সাধকের জন্য বিখ্যাত।

আপাতত এই বিতর্ক থাক। পুজোর ডালা কিনে কঙ্কালীতলার মন্দিরে এলাম। ছোটোখাটো অনাড়ম্বর মন্দির। মন্দিরটি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন বোলপুর শ্রীনিকেতন ব্লকের বিডিও তারকচন্দ্র ধর মহাশয়। এই মন্দিরে দু’জন সিদ্ধ সাধক ছিলেন, একজন সতীশ মুখোপাধ্যায়, অপর জন জগদীশ মুখোপাধ্যায় বা জগদীশ বাবা। এখানে বামাখ্যাপাও কখনও কখনও আসতেন।

এই মন্দিরে মূর্তি নেই, শিলাও নেই। কালীঠাকুরের বাঁধানো ফটোয় পুজো করা হয়। চৈত্র সংক্রান্তিতে এখানে বিশেষ পুজো হয় ও সেই উপলক্ষে মেলা বসে। এখানে পুজো দেওয়ার জন্য পাণ্ডা লাগে না। গর্ভগৃহে পুরোহিত আছেন, তিনিই মন্ত্র পড়ে পুজো করে দেন। দক্ষিণা যা খুশি দিলেই হয়।

মন্দিরের পাশেই ছোটো বর্গাকার কুণ্ড। এই কুণ্ডর জলেই পুজো হয়। কথিত আছে, এই কুণ্ড সংস্কার করার সময় বিশাল সাদা কোমরের হাড় পাওয়া যায়। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর। এ নিয়ে আর বাক্যব্যয় করব না।

kopai river
কোপাই নদী।

পুজোর শেষে মন্দিরের পিছনের দিকে কোপাই নদীর ধারে গেলাম। সরু নদী। খাল বলে ভুল হতে পারে। আঁকাবাঁকা নদীর পাড়ে মাঝে মাঝে সোনাঝুরি গাছ। বড়ো  সুন্দর দৃশ্যপট। মনের মধ্যে রবি ঠাকুরের “আমাদের ছোট নদী চলে আঁকেবাকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে…” কবিতাটা নিজে থেকেই চলে আসে।

নদীর পাশে শ্মশান। ছোট্টো ছোট্টো মন্দিরের আদলে প্রচুর স্মৃতিফলক। না জানলে এটা সমাধিক্ষেত্র বলে ভুল হতে পারে।

পায়ে পায়ে টোটোতে ফিরে এলাম। কার পার্কিং-এর ময়দানে গাছের তলায় বসে দু’জন বাউল গান গাইছে। বড়ো সুন্দর গাইছে। মোহিত হয়ে কিছুক্ষণ শুনলাম। উদয়ের তাড়ায় ফের যাত্রা শুরু।

আরও পড়ুন: তারাক্ষেত্র থেকে রবিক্ষেত্র ২ / অবশেষে তাঁর দর্শন হল

এ বার পেটপুজো করা দরকার। উদয় প্রস্তাব দিল বিশ্বভারতীর ক্যান্টিনে খাওয়ার। ফাঁকা ক্যান্টিন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এটি মূলত বিশ্বভারতীর কর্মী ও ছাত্রদের জন্যই। ট্যুরিস্টরাও আসেন খেতে। সেলফ সার্ভিস। সত্যিই ভালো খাবার। দামও বেশি নয়।

আবার যাত্রা শুরু। রবীন্দ্র মিউজিয়াম যাওয়ার পথে দেখলাম তালধ্বজ। একটা তালগাছকে কেন্দ্রে রেখে একটি মাটি ও খড়ের গোল বাড়ি।

টিকিট কেটে রবীন্দ্র মিউজিয়ামে ঢুকলাম। উপরের একটি ঘরে রবীন্দ্রনাথের পাওয়া উপহার সামগ্রী, রবীন্দ্রনাথ ও ঠাকুরবাড়ির ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখা। ঘরের এক কোণে রবীন্দ্রনাথের পাওয়া নোবেল পুরস্কারের প্রতিরূপটি রাখা আছে। কয়েক বছর আগে আসল নোবেলটি চুরি যায়। তার কিনারা আজও হয়নি। নীচের তলায় একটা ফোটো গ্যালারি দেখে বেরিয়ে এলাম।

এই কম্পাউন্ডের নাম উত্তরায়ণ। এখানে অনেকগুলো ভবন আছে — ‘বিচিত্রা’, ‘উদয়ন’, ‘শ্যামলী’, ‘কোণার্ক’, ‘পুনশ্চ’, ‘উদীচী’। শান্তিনিকেতনে অবস্থানকালে এ বাড়িগুলোতে রবীন্দ্রনাথ এক এক সময় এক একটা বাড়িতে ছিলেন। সাজানোগোছানো বিশাল চত্বর। কম্পাউন্ডে বিভিন্ন ভাস্কর্য। মন চাইছে সব ঘুরে দেখি কিন্তু ঠাঠা রোদে আর পেরে উঠলাম না আমরা।

srijonee shilpa gram
সৃজনী শিল্পগ্রাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সৃজনী শিল্প গ্রামে পৌঁছে গেলাম। টিকিট কেটে ঢুকলাম। এখানে বাংলা, বিহার, ওড়িশা, কেরল, আন্দামান, সিকিম প্রভৃতি রাজ্যের বাড়িঘর, শিল্প-সংস্কৃতি প্রভৃতি তুলে ধরা হয়েছে। গেট থেকে সোজা লাল মাটির রাস্তা ভিতরে ঢুকেছে। রাস্তার দু’পাশে এক একটি প্রদেশের জন্য ছোটো ছোটো ঘর করে রাখা। বিভিন্ন প্রদেশের সাধারণ মানুষের যেমন বাড়ি হয়, এখানকার বাড়িগুলো সেই আদলেই তৈরি। বাড়ির দেওয়ালে সেখানকার আলপনা। ভিতরে পোশাক, বাদ্যযন্ত্র, অস্ত্র, ব্যবহারের জিনিসপত্র ইত্যাদি। বেসরকারি ব্যাবস্থাপনায় একটি উদ্যোগ। উদ্যোগটি ভালো কিন্তু অযত্নের ছাপ ফুটে উঠতে শুরু করেছে।

সিউড়ি সড়ক ধরে আমরা এ বার ‘আমার কুটির’-এ চললাম। গান্ধীজির অনুপ্রেরণায় বিপ্লবী সুষেণ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল এই ‘আমার কুটির’। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে আর এক স্বাধীনতা সংগ্রামী পান্নালাল দাশগুপ্তও এখানে থেকেই সমাজসেবার নানা কাজকর্ম চালিয়ে গিয়েছেন। প্রাথমিক ভাবে এর উদ্দেশ্য ছিল সদ্য মুক্তি পাওয়া বিপ্লবীদের একটি আশ্রয়স্থল গড়ে তোলা। তাঁদের তৈরি জিনিস এখান থেকে বিপনন করে খরচ তোলা হত। ১৯৩৮-এ নেতাজি ‘আমার কুটীর’ পরিদর্শনে আসেন। পরবর্তীকালে স্থানীয় তাঁত, চামড়া, ডোকরা ও বিভিন্ন হস্তশিল্পীর শিল্পসামগ্রী এখান থেকে বিক্রি করা শুরু। বর্তমানে এটি স্থানীয় বেশ কিছু পরিবারের অন্নসংস্থানের ক্ষেত্র। এখানে একটা ছোট্টো মিউজিয়াম আছে। সেখানে ‘আমার কুটির’কে কেন্দ্র করে কিছু ছবি ও শিল্পসামগ্রী প্রদর্শন করা হয়।

amar kutir
আমার কুটির।

২টো বাজছে।  এ বার তো খাওয়াদাওয়া করতে হবে। ঠিক হল খোয়াইয়ে যাব, ‘শকুন্তলা ভোজে’ খাব। বাউল গান শুনতে শুনতে পদ্মপাতায় বাসমতী চালের ভাত, ডাল …. আহা।

টোটো সোজা চলতে চলতে হঠাৎ বাঁ দিকে একটা মাটির রাস্তায় ঢুকে গেল। একটা গ্রাম। ডান দিকে আঙুল দেখিয়ে উদয় বলল, ওই যে প্রকৃতি ভবন। আর একটু এগিয়ে বাঁ দিকে দেখাল বুদ্ধদেবের বিশালাকৃতি সাদা মূর্তি। উদয় জানাল, এর উচ্চতা ৩৪ ফুট।

গাড়ি ঘুরিয়ে কিছুটা এসে উদয় দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রকৃতি ভবনটা দেখে নিতে বলল। আমরা রাজি না। খেয়েদেয়ে ফিরে এসে প্রকৃতি ভবন দেখে ফের খোয়াই যাওয়া যাবে। উদয় নাছোড় – স্যার ৫ মিনিট লাগবে দেখতে। এইটুকুর জন্য আবার আসবেন?

উদয়ের প্রস্তাবে সম্মত হলাম। তখন কি জানতাম কি ফাঁসা ফাঁসলাম। প্রকৃতি যে কত বড় শিল্পী তা এখানে এলেই বোঝা যায়। তাই তো সে ভাস্করসম্রাট। ‘প্রকৃতি ভবন’ প্রাকৃতিক ভাস্কর্যের সংগ্রহশালা।

statue of lord buddha
বুদ্ধমূর্তি।

১৯৭৬ সাল, কুমিরের মতো দেখতে একটা কাঠ সংগ্রহ করলেন সুব্রত বসু। এটিই হল এই সংগ্রহশালার প্রথম সংগ্রহ। সেই শুরু। এর পর সুব্রতবাবুর চোখে একের পর এক প্রাকৃতিক ভাস্কর্য ধরা দিতে শুরু করল। কখনও খুঁজে পেলেন পাথরের মধ্যে, কখনও বা গাছের ভাঙা ডালের মধ্যে। কিছুই বাদ গেল না। আজ ভাস্কর্যের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে।

১৯৯৫ সালে ‘প্রকৃতি ভবন’ নেচার আর্ট গ্যালারি হিসাবে রেজিস্টার্ড হয় এবং সুব্রত বসু হন প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৭-এ পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখানে এক একর জায়গা সংস্থাকে লিজ দেয়। ১৯৯৯-এ  কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি দফতরের অর্থানুকূল্যে শিলান্যাস হয়। ২০০৩-এ জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় ‘প্রকৃতি ভবন’।

মুখোমুখি দু’টো ভবনে দু’টো ইনডোর গ্যালারি, যেখানে রয়েছে কাঠের ভাস্কর্য। বাইরে ফাঁকা জায়গায় ছোটো ছোটো পিলারে পাথরের ভাস্কর্যগুলি রাখা। আমরা প্রথমে সেগুলোই দেখতে শুরু করলাম। কোনটা কী তা ছোটো ছোটো ফলকে লেখা। দোয়েল পাখি, ব্যাং, প্রজাপতি, প্যাঁচা প্রভৃতি প্রচুর প্রাকৃতিক ভাস্কর্য দেখলাম।

প্রথমে বিশেষ গুরুত্ব দিইনি কিন্তু এখন নেশা লেগে গেছে। খাওয়া মাথায় উঠল। এ বার ঢুকলাম একটি ইনডোর গ্যালারিতে। সেখানে গাছের ডাল, কাঠের ভাস্কর্যগুলো রাখা আছে। ঢুকেই চোখে পড়ল শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’। অসাধারণ!। আমি একের পর এক দেখে চলেছি গরু, ছাগল, বক, কাকাতুয়া….. । মৌসুমি ক্লান্ত হয়ে গ্যালারির মেঝেতে বসে পড়েছে। আমি দেখে চলেছি হনুমান, হাঁস, আদম-ইভ, মৈত্রী, গণেশ ও পার্বতী, প্যাঁচা প্রভৃতি।

উদয় এসে মনে করিয়ে দিল খেতে যাওয়ার কথা। ধুত্তোর!! একটা গ্যালারিও ছাড়া যাবে না। চলে গেলাম পাশের গ্যালারিতে। সেখানে রয়েছে ময়ূর, উটপাখি, ঘোমটা দেওয়া মহিলা, পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ, কুমির প্রভৃতি। অসাধারণ! বিশ্বভারতীর থেকে কোনো অংশে কম আকর্ষণীয় নয় এই ‘প্রকৃতি ভবন’।

natural sculpture at prakriti bhavan
প্রকৃতি ভবনে গাছের ডালের ভাস্কর্য।

মন চায় আরও কিছুক্ষণ দেখি। কিন্তু উপায় নেই। গেটের কাছে এগিয়ে আসতে আসতে আরও কয়েকটি পাথরের ভাস্কর্য দেখে নিলাম। একটা টেবিল পেতে দু’ জন বসে আছেন। আমরা ঢুকেছিলাম পিছন দিয়ে, তাই টিকিট কাটা হয়নি। এঁদের কাছে প্রয়োজনীয় প্রবেশ-দক্ষিণা দিলাম।

‘প্রকৃতি ভবন’ নিয়ে ওঁদের সঙ্গে কিছু কথা হল। আমার আগ্রহ দেখে ওঁরাও খুব উৎসাহ নিয়ে আমায় অনেক কথা জানালেন। একজন এরই মাঝে বলে উঠলেন, রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন?

রবীন্দ্রনাথ? কই না তো?

ওই তো। এগিয়ে যান… আর একটু বাঁ দিক থেকে দেখুন…. হ্যাঁ হ্যাঁ…।

অসাধারণ! এটারই অভাব ছিল মনে। সেটাও পূর্ণ হয়ে গেল। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে কি কিছু হয়?

আরও পড়ুন: তারাক্ষেত্র থেকে রবিক্ষেত্র ৩ / শান্তিনিকেতনের ভুবনে

খোয়াইতে ‘শকুন্তলা’য় যখন খেতে বসলাম তখন ৪টে বাজে। অনেক খাবারই তখন শেষ। আমার সাধের পদ্মপাতাও! শুধু ভেজ মিল। বাসমতী চালের ভাত, আলু ভাজা, শুক্ত, সোনা মুগ ডাল, আলু-পটলের তরকারি। কানে ভেসে আসছে বাউলগান। খাবার পরিবেশন করছেন সাঁওতাল যুবক-যুবতীরা। হোটেলের ইন্টেরিওর ডেকোরেশন বাঁশ, কাঠ ও খড়ের দিয়ে। মন ভরে গেল। (চলবে)

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে বোলপুর শান্তিনিকেতন। সেখান থেকে অটো, টোটো বা রিকশায় হোটেল বা লজে। ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in

সড়কপথে কলকাতা থেকে দূরত্ব ১৬২ কিমি, পথ জাতীয় সড়ক ১৯ (পূর্বতন জাতীয় সড়ক ২, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে) হয়ে বর্ধমান, তার পর জাতীয় সড়ক ১১৪ বরাবর গুসকরা হয়ে।

কোথায় থাকবেন

শান্তিনিকেতনে থাকার জন্য রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের টুরিস্ট লজ। অনলাইন বুকিং www.wbtdcl.com । রয়েছে যুব দফতরের যুব আবাস। অনলাইন বুকিং youthhostelbooking.wb.gov.in । এ ছাড়াও রয়েছে প্রচুর বেসরকারি হোটেল ও লজ আছে। খোঁজ পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে।

ছবি: লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here