sudip kumar paul
সুদীপ কুমার পাল

অনেক দিন ধরেই মৌসুমি তাগাদা দিচ্ছে তারাপীঠ যাওয়ার জন্য। ওখানে ও পুজো দেবে। চেষ্টা যে করছি না তা নয়। তিন বছর ধরেই চেষ্টা করছি, কিন্তু নানা কারণে যাওয়া হচ্ছে না। অনেকেই বলেছে, “তুমি চেষ্টা করলে হবে কী, তোমায় ঈশ্বর না টানলে তুমি যেতে পারবে না।” কথাটা কতটা সত্যি বা মিথ্যা তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে কিন্তু ছুটির লিস্ট ঘেঁটে একটা টানা ছুটির হদিস পেয়ে নড়েচড়ে বসলাম।

স্কুলে অপূর্বদাকে বললাম। রাজি হয়ে গেল। ঠিক হল তারাপীঠের সঙ্গে শান্তিনিকেতনও যাওয়া হবে। অপুর্বদা আমার শুধু সহকর্মী নন, আমার শিক্ষক, দাদা, বন্ধু, উপদেষ্টা সব কিছু। এ দিকে আমাদের আর এক সহকর্মী সৈকত সপরিবার ছুটি কাটাতে সপ্তাহশেষে যাচ্ছিল শান্তিনিকেতন। ওকেও জুটিয়ে নিলাম।

সময় এগিয়ে এল। হাওড়া থেকে রামপুরহাট এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম। ট্রেন ডানকুনিতে এসে ৪০ মিনিট বিশ্রাম নিল। জানি না কী হয়েছে। আমাদের বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে দিয়ে সে আবার যাত্রা শুরু করল। ট্রেন চলতে থাকুক সেই অবসরে তারাক্ষেত্র অর্থাৎ তারাপীঠ নিয়ে কিছু বলে নিই।সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেব প্রলয়নৃত্য শুরু করেন। ফলে জগৎ-সংসার ধ্বংসের মুখে গেল। সেই সময় ভগবান বিষ্ণু তাঁর চক্র দিয়ে সতীর দেহ ৫১টি খণ্ড করে ফেললেন। এই খণ্ডগুলি যেখানে যেখানে পড়ল সেই সব স্থানে গড়ে উঠল শক্তিপীঠ। লোকশ্রুতি, এই তারাপীঠে পড়েছিল সতীর ঊর্ধ্ব নয়ন অর্থাৎ জ্ঞানচক্ষু। তাই তারাপীঠকে বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিপীঠ। যদিও পুরাণাদি গ্রন্থে এর কোনো সমর্থন পাওয়া যায় না।

তবে শক্তিপীঠ নয়, এমন স্থানে কোনো সাধক সিদ্ধিলাভ করলে তাকে বলা হয় সিদ্ধপীঠ। এবং কোনো শক্তিপীঠে কোনো সাধক সিদ্ধিলাভ করলে সেটি হয় মহাপীঠ। তাই যাঁরা বিশ্বাস করেন তারাপীঠ শক্তিপীঠ, তাঁদের কাছে এই পীঠ হল মহাপীঠ।

তারাপীঠ বললেই মনে আসে বামাখ্যাপার কথা। বামাখ্যাপা হলেন সর্বশেষ সাধক যিনি এখানে সিদ্ধিলাভ করেন। কথিত আছে এখানে সর্বপ্রথম সিদ্ধিলাভ করেন স্বয়ং মহাদেব। পরে বশিষ্ঠ, শ্রীভৃগু ও দুর্বাসার মতো মুনি-ঋষিরা। কলিযুগে কবীন্দ্র কর্ণাভরণ, বিশেখ্যাপা, রাজা বিজয়কৃষ্ণ, কমলাকান্ত কৈলাসপতির মতো সাধক।

ট্রেন ছুটতে ছুটতে বর্ধমানে এসে গিয়েছে। আমাদের সঙ্গে যা ড্রাইফুড আছে তাই বার করে টুকটাক মুখ চলছে। ট্রেনে ওঠা শসা, ঝালমুড়িও খাওয়া হয়েছে। বর্ধমান ছেড়ে ট্রেন ছুটতে শুরু করেছে। এখনও অনেক পথ বাকি তাই আরও কিছু বলে নিই সেই ফাঁকে।

দেবী দুর্গার দশটি রূপ। একে বলে দশ মহাবিদ্যা। এগুলি হল কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা। এখন আমাদের চর্চার বিষয় তারা বা তারিণী। যিনি আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক, এই তিন প্রকার তাপ থেকে ত্রাণ করেন তিনিই হলেন তারা।

তারার সৃষ্টি কী ভাবে? সমুদ্রমন্থন থেকে যা কিছু উত্থিত হল তা সবই দেবতা বা অসুররা অধিকার করে নিল। কিন্তু সমুদ্রমন্থনে যে বিষ উঠেছিল তা কেউ গ্রহণ করল না। বিষের প্রভাবে জগৎ-সংসার ধ্বংসের উপক্রম হল। তখন সবাই শিবের শরণাপন্ন হল। শিব তখন ওই বিষ কণ্ঠে ধারণ করে হলেন নীলকণ্ঠ। বিষ ধারণ করে মহাদেব তো বিশ্বকে উদ্ধার করলেন কিন্তু নিজে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর হয়ে উঠলেন। তখন দেবতাদের কাতর আবেদনে মহামায়া তারা রূপে এসে মহাদেবকে স্তন্যপান করিয়ে তাঁকে জ্বালাযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেন। তারাপীঠের আসল তারামূর্তিটি হল এই স্তন্যদায়িনী রূপের।

তারিণীকে আবার নীল সরস্বতীও বলা হয়। কারণ তিনিই আমাদের বাক অর্থাৎ শব্দ শক্তিপ্রদায়িনী। যত প্রকার সাধনা আছে তার মধ্যে তারার সাধনা হল সর্বোচ্চ ও সর্বশেষ। তারার সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করা ভীষণ কঠিন।  তারার সাধনায় যিনি সিদ্ধিলাভ করবেন তিনি পূর্ণ ব্রহ্মজ্ঞানী, সর্ব পাপমুক্ত, নির্ভীক ও অসীম ক্ষমতার অধিকারী।

rampurhat station“এই ব্যাগ পত্রগুলো সব নামাও। আমরা এসে গেছি” — অপূর্বদার কথায় চমক ভাঙল। ট্রেন স্টেশনে ঢুকছে।

অটো বুক করা হল ২০০ টাকা দিয়ে। রামপুরহাট স্টেশন থেকে তারাপীঠ ৯ কিমি। অটো ছুটে চলেছে। বাড়িঘর শেষ হয়ে গেল। শুরু হল দু’ পাশে ফাঁকা মাঠ। সুন্দর রাস্তা। কিছুক্ষণ বাদে একটা চওড়া খালের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় অপূর্বদা বলল, “এই দেখো দ্বারকা নদী”।

“সেকি, এটাই দ্বারকা নদী? আমি তো ভেবেছিলাম এটা সেচের খাল” – আমি অবাক।

“এটা আগে অনেক চওড়া ছিল। এখন এমন হয়ে গেছে” – অপূর্বদার জবাব।

দ্বারকা নদীকে কেন্দ্র করেই তারাপীঠ গড়ে উঠেছিল। সেই মন্দির, সেই বিখ্যাত শ্মশান , জনপদ সব কিছু। গুপ্ত চীনাতন্ত্রে এই নদী সম্পর্কে বলা হয়েছে – পশ্চিমে চ শ্মশানং স্যাৎ দ্বারকোত্তর বাহিনী।/তত্রবৈ স্নানদানেন গঙ্গাস্নান ফলং লভেৎ।। অর্থাৎ তারাপীঠ শ্মশানের পশ্চিমে উত্তরবাহিনী দ্বারকা নদী। সেখানে স্নান করল গঙ্গাস্নানের ফল লাভ হয়।

তারাপীঠ চৌরাস্তায় পৌঁছোলাম। সবাইকে এক জায়গায় রেখে আমি আর অপূর্বদা চললাম হোটেল খুঁজতে। পেয়ে গেলাম সুশান্ত লজ। পাঁচতলা। খাওয়ার জায়গা, লিফট সবই আছে। ঘরগুলোও ভালো।

langchas of tarapith
তারাপীঠের ল্যাংচা।

তারাপীঠে দু’টি খাবার খুব বিখ্যাত। ল্যাংচা আর প্যাঁড়া। যদিও এ প্যাঁড়া দেওঘরের তুলনায় কিছুই না। ল্যাংচা-সহ কচুরি উদরস্থ করে এলাম মন্দিরের সামনে। হোটেলের এক কর্মী একটা দোকান দেখিয়ে দিল। সেখানেই জুতো খুলেছি। সন্ধ্যা এখনও নামেনি কিন্তু মন্দিরচত্বরে সব আলো জ্বলে গিয়েছে। উজ্জ্বল আলোয় মন্দির ঝলমল করছে। সুন্দর করে ফুল দিয়ে গেটটি সাজানো হয়েছে।অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরচত্বরে ঢুকলাম। তিন-চার দিন ছুটি। তাই আমাদের মতো বহু মানুষ এসেছেন তারাপীঠে। প্রবেশদ্বারে মেটাল ডিটেক্টর। দারোয়ানও আছে কয়েক জন। প্রসঙ্গত বলি, বড়োদের ক্ষেত্রে নারীপুরুষ নির্বিশেষে হাফ প্যান্ট, স্লিভলেস পোশাক, খালি গা বা অশালীন পোশাক পরে মন্দিরচত্বরে প্রবেশ নিষেধ।

গর্ভগৃহের সামনে নাটমন্দির। নাটমন্দিরের ঠিক সামনে যজ্ঞস্থল এবং তার ঠিক সামনে বলিক্ষেত্র ও শনিমন্দির। যজ্ঞস্থলের ডান দিকে রাস্তা গিয়েছে বশিষ্ঠ কুণ্ডে, যা তারামায়ের ঘাট নামে পরিচিত। এই রাস্তার ডান দিকে বামাখ্যাপা ও শিবের মন্দির। শিব এখানে চন্দ্রচূড় নামে খ্যাত। পার্বতীকে বিয়ের সময় শিব এই চন্দ্রচূড় রূপ ধারণ করেছিলেন। চন্দ্রচূড় এখানে তারামায়ের ভৈরব।

jivita kunda, tarapith
জীবিত কুণ্ড।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম বশিষ্ঠ কুণ্ডের দিকে। জলাশয়ের উপর একটা ছোটো পুল। এর উপর দিয়েই গিয়েছে ফ্রি টিকিটের লম্বা লাইন, পুজো দেওয়ার জন্য। এই জলাশয়ের জল দিয়েই তারামায়ের নিত্যসেবা হয়। কথিত আছে, এরই জলে জয়দত্ত বণিকের মৃত ছেলে জীবিত হয়েছিল। এই জলাশয়কে জীবিত কুণ্ডও বলে।

লম্বা লাইন দেখে গর্ভগৃহে প্রবেশের ইচ্ছা আমাদের চলে গিয়েছে। এখন ঢুকলে আসল তারামূর্তিটি দেখা যেত। মহাদেবকে স্তন্য পান করানো অবস্থার শিলামূর্তি। এই  মূর্তি সন্ধ্যারতির সময় উন্মোচিত হয়। পরের দিন সকালে প্রারম্ভিক পূজা পর্যন্ত এই মূর্তি উন্মোচিত থাকে। তার পর এটি রৌপ্যনির্মিত একটি অবয়ব দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। রুপোর এই মুখ ও মুণ্ডমালাটি তৈরি করে দিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের নসিপুরের রাজা উদ্মন্ত সিংহ ।

মন্দিরের ইতিহাসটা বলে নিই সংক্ষেপে।

বীরভূম জেলার রত্নাগর নিবাসী বণিক জয়দত্ত তারামায়ের কৃপালাভের পর এখানে একটি মন্দির তৈরি করেছিলেন। তারাপীঠ শ্মশানে একটি বিশালাকার শ্বেতশিমূল গাছ ছিল। ওই গাছতলাতেই ছিল এখনকার এই আদি শিলামূর্তিটি, যাকে স্বয়ম্ভু বলা হয়। জয়দত্ত ওই মন্দিরে শিলামূর্তিটি স্থাপন করে পূজা শুরু করেন। মহল্লা গ্রামের ভৈরব পৈতগুই নামক এক পুরোহিতকে নিত্যপূজার জন্য নিয়োগ করেন। আশ্বিন মাসের শুক্লা চতুর্থীর দিন তারামাকে দর্শন করেছিলেন জয়দত্ত, তাই ওই দিনে তারাপীঠে মহা উৎসব পালিত হয়।

এর বহু বছর পর মন্দির যখন ভগ্নপ্রায় তখন এগিয়ে এলেন বীরভূমের এরল গ্রামনিবাসী রাজা রামজীবন রায়চৌধুরী। তিনি এই মন্দির পুনর্নির্মাণ করেন। এ ছাড়াও তিনি পুকুর, বাসস্থল প্রভৃতি নির্মাণ করেন। নিত্যপূজার পুরোহিতদের থাকার জন্য তাঁদের ভূমি দান করেন। পূজায় প্রতি দিন খিচুড়ি ও পায়েসভোগের প্রচলন করেন তিনি।

রামজীবন রায়চৌধুরীর অনেক বছর পর এগিয়ে আসেন মুর্শিদাবাদ জেলার রানি জয়াবতী। তারামায়ের কৃপায় কন্যাসন্তান লাভের পর তিনিই সমস্ত পূজার ভার গ্রহণ করেন। এর পর মুসলমানরা রাজসিংহাসন দখল করে। তাঁদের অনুমতি নিয়ে সাপুরের জমিদার ও দিনাজপুরের মহারাজ মন্দিরের পূজার হাল ধরেন।

রানি ভবানীর দত্তকপুত্র রাজা রামকৃষ্ণ রায়ের কথা এখানে বলা প্রয়োজন। আনুমানিক ১৭৭৬ সালে তিনি প্রথম তারাপীঠ আসেন এবং মন্দিরের প্রধান পুরোহিত আনন্দনাথের কাছে দীক্ষা নেন। মন্দিরের নিত্যসেবার দুরবস্থা দেখে উনি কাতর হন। তারাপীঠ ছিল চণ্ডীপুর মহালের অন্তর্গত এবং সেটি আলিলকি খাঁর অধিকারে ছিল। রামকৃষ্ণ রায় তাঁর মহুলা মহালের বিনিময়ে আলিলকি খাঁর কাছ থেকে চণ্ডীপুর মহালটি নিয়ে নেন। চণ্ডীপুরের তখন বাৎসরিক আয় ছিল ২০০০ টাকা। এর সবটিই তিনি তারামায়ের সেবায় উৎসর্গ করেন।

১২২৫ বঙ্গাব্দে তৃতীয় বার এই মন্দির নির্মিত হয়। এটিই বর্তমান মন্দির। এটি নির্মাণ করেছেন শ্রী জগন্নাথ রায়। ১২ ফাল্গুন বামাখ্যাপার জন্মদিন। ওই দিনই এই মন্দির স্থাপন করা হয়।

ভিড়ের জন্য মূর্তি দর্শন হল না। কাল পুজো দেওয়ার সময়ই দেখে নেওয়া যাবে। যদিও তখন আদি মূর্তি দর্শন হবে না। (চলবে)

entrance of tarapith templeকী ভাবে যাবেন

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে রামপুরহাট। সেখান থেকে অটোয় তারাপীঠ। তারাপীঠ রোড স্টেশনে নেমেও যেতে পারেন। তবে সব ট্রেন তারাপীঠ রোডে থামে না। ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in ।

সড়কপথে কলকাতা থেকে দূরত্ব ২২৩ কিমি, পথ জাতীয় সড়ক ১৯ (পূর্বতন জাতীয় সড়ক ২, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে) হয়ে বর্ধমান, তার পর জাতীয় সড়ক ১১৪ বরাবর গুসকরা, শান্তিনিকেতন, সাঁইথিয়া হয়ে তারাপীঠ।

কোথায় থাকবেন

তারাপীঠে থাকার জন্য প্রচুর বেসরকারি হোটেল ও লজ আছে। আগাম সংরক্ষণের দরকার হয় না। তবু যদি চান খোঁজ পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here