tarapith temple
sudip kumar paul
সুদীপ কুমার পাল

তারাপীঠ আসব আর মহাশ্মশানে যাব না, তা কি হয়? কয়েক মিটার দূরেই তারাপীঠ মহাশ্মশান। ২/৩ মিনিটের মধ্যে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম। একটিও বৈদ্যুতিক বাতি নেই। মোমবাতির আলোয় তৈরি হয়েছে এক মায়াবী পরিবেশ। যেন অকাল দীপাবলি। ঢুকেই কয়েকটি দোকানে মোমবাতি, ধূপ বিক্রি হচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে দু’খানা হাঁড়িকাঠ। সেখানে সবাই ধুপ ও বাতি দিচ্ছে। জানি না সেগুলি কার উদ্দেশে। আমরাও দিলাম।

Tarapith burning ghat pic 1পাশেই একটু উঁচুতে একটি মন্দিরে বেশ ভিড়। ধূপ-বাতি-আলতা-সিঁদুর নিয়ে মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। শুনলাম সেখানে একটা পাথরে তারামায়ের পদচিহ্ন আছে।  আমরা ও দিকে আর গেলাম না, শ্মশানের গভীরে এগিয়ে চললাম।

এখন এই শ্মশান আকারে খুবই ছোটো। আগে দ্বারকার তীরে এই শ্মশান ছিল  কয়েক মাইল জুড়ে। রাতে তো ত দূরের কথা, দিনের বেলাতেও অতি দুঃসাহসী ছাড়া আর কেউ এই শ্মশানে প্রবেশ করত না, এমনই ভয়ংকর ছিল এই স্থান। কেউ মারা গেলে তার দেহ সৎকারের জন্য মানুষ দলবদ্ধ ভাবে আসত। অনেক সময় দেহ ভালো করে পোড়ার আগেই তারা চলে যেত। অনেক সময় দরিদ্র মানুষরা আর্থিক সঙ্গতির অভাবে মৃতদেহের মুখাগ্নি করে মাটি চাপা দিয়ে চলে যেত। এই সব দেহ নিয়ে শিয়াল, কুকুররা কামড়াকামড়ি করত, ছিঁড়ে খেত। যত্রতত্র দেহাবশেষ ছড়িয়ে রাখত।

কথিত আছে, তারাপীঠ শ্মশানে দাহ করলে মৃত ব্যাক্তির আর পুনর্জন্ম হয় না। এই শ্মশানেই বামাখ্যাপা-সহ আরও অনেক সাধক সিদ্ধিলাভ করেছে। এই শ্মশানই ছিল তাঁদের সাধনক্ষেত্র। এখনও প্রচুর সন্ন্যাসী এই শ্মশানে থাকেন। যদিও তাঁদের মধ্যে ক’ জন সৎ আর ক’ জন শঠ তা নিয়ে আলোচনা চলতে পারে।tarapith burning ghat pic 2হালকা চাঁদের আলোয় পথ চলতে অসুবিধা হচ্ছে না। পথের পাশে মাঝে মাঝে মোমবাতি জ্বেলে বসে আছেন সন্ন্যাসীরা। তাঁদের আখড়াও আছে। চারিদিকে একটা অপার শান্তি। আমাদের মতো ছোটো ছোটো অনেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিরাজ করছে শ্মশানের নীরবতা।

মায়াবী আলোআঁধারিতে হাঁটতে হাঁটতে একটা ঘেরা জায়গায় এলাম। এখানে শবদাহ হচ্ছে। দাহ করার জায়গাটা বেশ উঁচু একটা ঢিপিতে। অগ্নিশিখা যেন আকাশকে চুম্বন করতে চাইছে। নীচে থেকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে।

সামনে এগিয়ে চললাম। কিছুটা গিয়েই রাস্তার বাঁ দিকে দেখি দু’-তিন জন সাধু যজ্ঞ করছেন। তাঁদের ঘিরে বসে আছেন কয়েক জন ভক্ত এবং যাঁরা যজ্ঞ করাচ্ছেন তাঁরা।

এগিয়ে গিয়ে রাস্তার ডান দিকে দেখি একটি গাছকে ঘিরে বেশ উঁচু  চওড়া বেদি। সেখানে পনেরো–বিশ জনের জমায়েত। কেউ ধূপ দিচ্ছেন। কেউ বা শুধুই বসে আছেন। কয়েক জন সাধুসন্ন্যাসীও আছেন। এঁদের মধ্যে জটাজুট রুদ্রাক্ষ পরিহিতা এক সন্ন্যাসিনীকেও দেখলাম। মোমবাতির আলোয় জায়গাটা আলোকিত। এতটাই যেন মনে হয় একটা ১০০ ওয়াটের বালব্‌ জ্বলছে।

sadhanpith of bamakhyapaএটাই বামাখ্যাপার সাধনাস্থল। কেন্দ্রস্থলে এক সময় ছিল একটি বিশালাকার শ্বেতশিমূল বৃক্ষ। এই গাছতলাতেই তারামায়ের অধিষ্ঠান ছিল। এখানে পাওয়া যায় তাঁর আদি শিলামূর্তি, যেটি এখন মন্দিরে অধিষ্ঠিতা। এ ছাড়াও চন্দ্রচূড় শিবলিঙ্গটিও এখানে ছিল। শিমূলগাছটি এতই বিশাল ছিল যে এর গুঁড়িটা তিন জনেও বেড় দিয়ে ধরতে পারত না। মৃতপ্রায় হয়ে যাওয়ায় ১২৭৪ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে বামাখ্যাপা গাছটি পুড়িয়ে দেন। তিন দিন ধরে সেই দিব্যগাছ পুড়েছিল।

এই বেদিটি ছিল পঞ্চমুণ্ডী আসন। জনশ্রুতি, বশিষ্ঠদেব এটি তৈরি করেছিলেন, তাই এর নাম বশিষ্ঠাশন। এই আসনে বসে বামা ছাড়াও আরও অনেক সাধক সিদ্ধিলাভ করেছেন।

আরও কিছুক্ষণ ঘুরে বেরিয়ে এলাম শ্মশান থেকে। মনের মধ্যে বিরাজ করছে এক অদ্ভুত রকম শান্তি ও তৃপ্তি। শ্মশান থেকে বেরিয়ে আলোকোজ্জ্বল, কোলাহলমুখর রাস্তায় আসতেই ছন্দপতন হল। বড়ো বিরক্তিকর লাগতে লাগল এই পরিবেশ।

এগিয়ে চললাম মন্দিরের দিকে। আগের বার ভিড়ের কারণে মূর্তিদর্শন হয়নি, এ বার যদি হয় সেই আশায়। এখনও বেশ ভিড়। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর অনেকে হতোদ্যম  হয়ে নাটমন্দির থেকে চলে যাচ্ছে। আমিও বিফল। তাই ছেলে রূপকে নিয়ে নাটমন্দিরের এক ধারে বসে তার সঙ্গে খেলা শুরু করে দিয়েছি। দলের বাকিরা অবশ্য চেষ্টা চালাচ্ছে দেখার। এমন সময় ভক্তদের আবেদনে সাড়া দিয়ে পাণ্ডারা গর্ভগৃহের দ্বার ফাঁকা করে দিলেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য। আমি বাদে দলের বাকিরা আদি মূর্তি দর্শন করতে সক্ষম হল।

আরও পড়ুন তারাক্ষেত্র থেকে রবিক্ষেত্র ১ / আদি মূর্তি দর্শন হল না আজ

ওঁদের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে আমিও আদি মূর্তি দর্শনের চেষ্টায় লেগে পড়লাম। একটি পিলার ফাঁকা আছে দেখে সেটির ডেটোর খাঁজে পা রেখে পিলার ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। মাছশিকারি যেমন ছিপ ফেলে ফাতনার দিকে তাকিয়ে থাকে আমিও ঠিক সেই ভাবে তাকিয়ে। মিনিট দশেক পিলার ধরে প্রায় ঝুলে থাকার পর হঠাৎ করে গর্ভগৃহের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হল এবং আমিও মূর্তি দর্শনলাভে সক্ষম হলাম।

সবাই মিলে তৃপ্ত হৃদয়ে নাটমন্দিরে বসে গল্প জুড়ে দিয়েছে। আমি দ্বিতীয় বার দর্শনলাভের আশায় একদম সামনের দিকে চলে গিয়েছি। মিনিট পনেরো দাঁড়িয়ে থাকার পর আবার একবার দর্শনলাভে সমর্থ হলাম।

তৃপ্ত মন নিয়ে সবাই লজের পথে হাঁটা লাগালাম। কাল তো ভোর ভোর পুজো দিতে হবে।

ভোর পাঁচটায় অপূর্বদার ডাকে ঘুম ভাঙল। যত সকালে সম্ভব পুজো দিয়ে তারাপীঠ ছাড়ব। ডালা নিয়ে পাণ্ডার সঙ্গে মন্দিরে এসে দেখি আমাদের আগেই অনেক ভক্ত চলে এসেছেন।

নিখরচায় দর্শনের লাইন ধরিয়ে দেওয়ার মতো। লাইনে চার-পাঁচশো লোক। পাণ্ডার সঙ্গে গেলাম মাথাপিছু ৩০০ টাকার লাইনের কাছে। সেখানে জনা চল্লিশেক দাঁড়িয়ে। আমরা ২০০ টাকার লাইনেই দাঁড়িয়ে গেলাম। সে লাইনে শখানেক লোক। এখন সকালের প্রারম্ভিক পূজা চলছে। এই পূজা শেষ হলেই ভক্তরা পুজো দিতে পারবে। অর্থাৎ লাইন অন্তত আধ ঘণ্টা অনড় থাকবে।

টাকার খেলা যে কোনো ধর্মের তীর্থস্থানেই চলে। যত বেশি টাকা দেবে তত তাড়াতাড়ি দর্শন। হিন্দুদের অধিকাংশ বড়ো বড়ো মন্দিরেই এই টাকার খেলা চলে। তবে সব কিছুর যেমন ভালো-মন্দ দিক থাকে টাকা দিয়ে পুজো দেওয়ার ক্ষেত্রেও একটা ভালো দিক আছে। সেটা হল যাঁদের হাতে সময় খুব কম, অথচ মন ভরে পুজো দিতে চান তাঁরা অবশ্যই উপকৃত হনয়। আমরাও এ ক্ষেত্রে টাকা দিয়ে সময় কিনলাম বলা যায়।

সত্যি কথা বলতে কী, বাঙালির কাছে তারাপীঠ আর বামাখ্যাপা সমার্থক। লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই সাধকের কথাই ভাবছিলাম। মনে মনে ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম তাঁর জীবনকথা। কী ভাবে আটলা গ্রামের সর্বানন্দ ও রাজকুমারীর দ্বিতীয় সন্তান বামা সাধক হলেন সেই সব কথা। মনে দাগ কেটে যাচ্ছিল তাঁর জীবনের নানা লৌকিক-অলৌকিক ঘটনার কথা।

মঙ্গলারতি শেষ হয় হল। লাইন ধরে কাউন্টারে এলাম। সেখানে মাথাপিছু ২০০ টাকা করে নিয়ে রসিদ ধরিয়ে দেওয়া হল আমার হাতে।feet of taramaএক সময় গর্ভগৃহের মূল দ্বারের কাছে এসে পড়লাম। পাণ্ডা আমাদের দিয়ে মন্ত্রচারণ করালেন। মন্ত্র বলা শেষ করে গর্ভগৃহে প্রবেশ করলাম। সামনেই রৌপ্যনির্মিত চরণযুগল যা তারামায়ের চরণযুগলের প্রতিভূ। মৌসুমি আর বউদি ডালায় রাখা আলতা ছিপি খুলে ঢেলে দিল ওই চরণ যুগলে। রৌপ্যনির্মিত তারামূর্তি সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো। পুজো সম্পন্ন হল যথাবিহিত প্রথায়।

গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে এলাম। ঘড়িতে সাড়ে আট। ফিরে এলাম লজে। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে লজ ছাড়লাম। চেপে বসলাম অটোয়। রামপুরহাট স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেন ধরে বোলপুর। (চলবে)

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে রামপুরহাট। সেখান থেকে অটোয় তারাপীঠ। তারাপীঠ রোড স্টেশনে নেমেও যেতে পারেন। তবে সব ট্রেন তারাপীঠ রোডে থামে না। ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in ।

সড়কপথে কলকাতা থেকে দূরত্ব ২২৩ কিমি, পথ জাতীয় সড়ক ১৯ (পূর্বতন জাতীয় সড়ক ২, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে) হয়ে বর্ধমান, তার পর জাতীয় সড়ক ১১৪ বরাবর গুসকরা, শান্তিনিকেতন, সাঁইথিয়া হয়ে তারাপীঠ।

কোথায় থাকবেন

তারাপীঠে থাকার জন্য প্রচুর বেসরকারি হোটেল ও লজ আছে। আগাম সংরক্ষণের দরকার হয় না। তবু যদি চান খোঁজ পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here