বন্দিদশা থেকে মুক্তির স্বাদ: পুজোয় চলুন ঘাটশিলা

0
ঘাটশিলা।
বুরুডি ড্যাম, ঘাটশিলা।

দোরগোড়ায় পুজো। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। ভ্রামণিক বাঙালি পুজোর ছুটিতে আর ঘরে থাকতে চায় না। তার পায়ের তলায় তখন সরষে। কিন্তু করোনার আবহে বাড়ির বাইরে বেরোনো নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভুগছেন। করোনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বেরিয়ে পড়ুন। তিন-চার দিনের জন্য চলুন কাছেপিঠে কোথাও। শুধু মাথায় রাখবেন স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা।

এমনই কিছু জায়গার কথা বিশদে জানাচ্ছে খবরঅনলাইন। আজ প্রথম পর্বে ঘাটশিলা

বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে কিছুটা গেলেই ঝাড়খণ্ডের ঘাটশিলা। ঘাটশিলার সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আর সেই সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছেন ‘পথের পাঁচালী’র স্রষ্টা বিভূতিভূষণ। ঘাটশিলা স্টেশনে নেমে যখন স্টেশনের মাইকে বাংলায় ঘোষণা শুনবেন, অটো বা টোটোর সারথি যখন বাংলা ভাষাতেই আপনাকে ডাকবেন, হোটেলের রিসেপশনে যখন আপনাকে বাংলা ভাষাতেই আপ্যায়ন জানানো হবে, তখন আপনার মনে হবে আপনি বাংলাতেই আছেন।

ধারাগিরি ফলস্‌।

আসুন আপনার জন্য সাজিয়ে দিই ঘাটশিলা ভ্রমণ পরিকল্পনা। এই ভ্রমণসূচি চার দিন তিন রাতের।     

প্রথম দিন – কলকাতা থেকে সকালেই রওনা হয়ে চলুন ঘাটশিলা। একটু বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের খাওয়া একটু তাড়াতাড়ি সেরে ১টা নাগাদ বেরিয়ে পড়ুন। চলুন –

(১) ধারাগিরি ফলস্‌ – শহর থেকে ১৪-১৫ কিমি। শেষ কিলোমিটার খানেক পদব্রজে যেতে হবে। পাহাড়-জঙ্গলের মাঝে সুন্দরী ঝরনা।

(২) বুরুডি ড্যাম – ধারাগিরি থেকে ফেরার পথে ৫ কিমি এলে পাহাড়ে ঘেরা বুরুডি ড্যাম।

(৩) ফুলডুংরি পাহাড় – বুরুডি থেকে শহরে ফেরার পথে জাতীয় সড়কের ধারে বিভূতিভূষণের স্মৃতিধন্য ফুলডুংরি পাহাড়। টিলার টং থেকে ঘাটশিলা শহরের দৃশ্যটি ভারী সুন্দর।

গৌরীকুঞ্জ।

(৪) ঘাটশিলা শহর দর্শন – শহরে ফিরে চলুন ঘাটশিলা রাজবাড়ি, স্টেশন থেকে দু’ কিমি। দেখে নিন রাজ এস্টেটের দুর্গা মন্দির, রঙ্কিণী দেবীর মন্দির। ফিরে আসুন স্টেশনের কাছে। এ বার ডাহিগোড়ামুখী রাস্তায় দেখুন শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ। একটু এগিয়ে বাঁহাতি ‘অপুর পথ’-এ দেখে নিন কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণের বসতবাড়ি ‘গৌরীকুঞ্জ’। এ বার চলুন সুবর্ণরেখা পেরিয়ে আরও ১ কিমি দূরে রাতমোহনা। পাহাড়ি টিলায় সূর্যাস্ত দেখার মতন।

দ্বিতীয় দিন – তাড়াতাড়ি প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়ুন। হোটেলে ফিরে মধ্যাহ্নভোজ সারবেন। একটু না হয় দেরি করেই হবে এ দিনের দুপুরের খাওয়া। তা হলে চলুন – 

(১) রঙ্কিণীদেবীর মন্দির – ঘাটশিলা থেকে ২৩ কিমি দূরে জাদুগোড়ায়। আগে জঙ্গলের মাঝে ছিল এই মন্দির, রীতিমতো গা ছমছম করত। এখন সে সব জঙ্গল উধাও।

রঙ্কিণীদেবীর মন্দির, জাদুগোড়া।

(২) গালুডি ড্যাম – রঙ্কিণীদেবী দর্শন করে চলে আসুন সুবর্ণরেখা নদীর উপর ২১টি স্লুইসগেট সমন্বিত গালুডি ড্যামে – ১০ কিমি। স্থানীয় মানুষজন ব্রিজ থেকে নদীতে জাল ঝুলিয়ে মাছ ধরে। সে এক দেখার মতো ব্যাপার।

(৩) দুয়ারসিনি – গালুডি ড্যাম দেখে চলুন পুরুলিয়ার দুয়ারসিনি, ১৬ কিমি। পাহাড় আর শাল, পিয়াল, শিমূল, পলাশ, বহেড়ার জঙ্গলে ঘেরা। এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে সাতগুড়ুং নদী।

(৪) ভালোপাহাড় – দুয়ারসিনি থেকে ৫কিমি, মেনিঝুরি, সোনাঝুরি, শিমুল, পলাশে ছাওয়া টিলা টিলা পাহাড় – আদিবাসীদের বাস। স্থাপত্য-ভাস্কর্য-চারুকলায় এক অতীত সভ্যতার নিদর্শন প্রাচীরে ঘেরা ভালোপাহাড়। ফিরে আসুন ঘাটশিলায়, ৩০ কিমি।

তৃতীয় দিন – প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়ুন সারা দিনের ভ্রমণে। এ দিন দুপুরের খাওয়াটা বাইরেই হোক।

দলমা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের প্রবেশ ফটক।

(১)  জুবিলি পার্ক – জামশেদপুর শহরে, ঘাটশিলা থেকে ৪৭ কিমি। চিলড্রেন্স পার্ক,  অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, গোলাপ বাগিচা, ঝিলে হাউসবোট, গাছগাছালির নার্সারি, ওপেন এয়ার জু তথা চিড়িয়াখানা।

(২) ডিমনা লেক – জুবিলি পার্ক থেকে ১৩ কিমি, দলমা পাহাড়ের কোলে। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ।

(৩) দলমা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও হিলটপ – ডিমনা লেক দেখে ফের জাতীয় সড়ক ৩৩-এ। ডান দিকে চান্ডিলমুখী পথে ১৭ কিমি গিয়ে সহরবেরায় ডান দিকে দলমা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের প্রবেশফটক। এখান থেকে দলমা হিলটপ ১৯ কিমি। ৩ কিমি গিয়ে পথ ডান দিকে ঘুরেছে। আরও ১ কিমি গিয়ে চাকুলিয়ায় ঝাড়খণ্ড বন দফতরের চৌকি। সেখানে দর্শনী দিয়ে প্রবেশ বনপথে। রাস্তা কোথাও কংক্রিটের, কোথাও মোরামের, কোথাও মাটির। পথ বেশ খাড়াই। দু’ দিকে ঘন জঙ্গল। দলমার হাতিদের বেশ খ্যাতি আছে। পথ উঠেছে ঘুরে ঘুরে। ১০ কিমি যাওয়ার পর ফরেস্ট রেস্টহাউস। এর পর পথ আরও খাড়াই। আরও ৫ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছোবেন দলমা পাহাড়ের শীর্ষে, উচ্চতা ৩০৬০ ফুট। গা ছম ছম পাহাড়ি গুহায় শিবমন্দির। একেবারে পাহাড়-টঙে হনুমান মন্দির। ভাঙতে হবে বেশ কিছু খাড়াই সিঁড়ি। অনেক নীচে সিংভূমের মালভূমি, অনেক ছোটো ছোটো পাহাড়। স্মরণীয় হয়ে থাকবে এই ভ্রমণ।

দলমা শীর্ষে যাওয়ার পথ।

(৪) চান্ডিল ড্যাম – পাহাড় শীর্ষ থেকে নেমে আসুন একেবারে জাতীয় সড়কে। ডান দিকে ঘুরে চলুন চান্ডিল ড্যাম। দলমা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের প্রবেশফটক চান্ডিল ড্যাম ২০ কিমি। পাহাড়ে ঘেরা চান্ডিল ড্যাম। চান্ডিল ড্যামে সূর্যাস্ত দেখে ফিরে চলুন ঘাটশিলায়, দূরত্ব ৭৫ কিমি।

চতুর্থ দিন – একেবারে সকালে বা দুপুরের খাওয়া সেরে ঘরে ফিরুন।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে ঘাটশিলা যাওয়ার দু’টি ট্রেন সকালে – (১) হাওড়া-বরবিল সুপারফাস্ট স্পেশাল সকাল ৬.২০-এ ছেড়ে ঘাটশিলা পৌঁছোয় সকাল ৯.১০-এ; (২) হাওড়া-টিটলাগড় সুপারফাস্ট স্পেশাল সকাল ৬.৩৫-এ ছেড়ে ঘাটশিলা পৌঁছোয় সকাল ৯.৩৪-এ।

চান্ডিল ড্যামে সূর্যাস্ত।

কী ভাবে ফিরবেন

ঘাটশিলা থেকে হাওড়ায় ফেরার ট্রেন – (১) টাটা-হাওড়া স্পেশাল সকাল ৬.৫২-য় ঘাটশিলা ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় সকাল ১০.২০-তে; (২) টিটলাগড়-হাওড়া সুপারফাস্ট স্পেশাল দুপুর ২.৩৭-এ ঘাটশিলা ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় সন্ধ্যা ৬.১৫-য়; (৩) বরবিল-হাওড়া সুপারফাস্ট স্পেশাল বিকেল ৫.৩১-এ ঘাটশিলা ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় রাত ৮.৫৫-য়।

কোথায় থাকবেন

ঘাটশিলায় থাকার মতো অনেক হোটেল আছে। গুগুল সার্চ করলে তার সন্ধান পেয়ে যাবেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতীয় সড়কের ধারে ফুলডুংরি পাহাড়ের কাছে হোটেল বিভূতি বিহার। যোগাযোগ: ৯৭৭১০ ৩৪১৫১, ৯০৯৭৭ ২২৬০০। দেখুন: https://hotel-bibhuti-vihar-ghatsila.business.site/

কী ভাবে ঘুরবেন

কাছেপিঠের দর্শনীয় স্থানগুলো অটো বা টোটো চেপে ঘুরে নিতে পারেন। দূরের জায়গাগুলো গাড়িতে। যেখানে থাকবেন সেখানেই কথা বলে নেবেন গাড়ি বা অটো-টোটোর জন্য।

মনে রাখবেন

(১) টিকার দু’টো ডোজ হয়ে গেলে তার সার্টিফিকেট অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন। সঙ্গে রাখবেন ভোটার কার্ডের ফোটোকপি। আর টিকা না হলে আরটি-পিসিআর নেগেটিভ রিপোর্ট।

(২) ঘাটশিলা যাওয়ার ট্রেনের বিস্তারিত জানতে হলে দেখে নিন erail.in।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন