বন্দিদশা থেকে মুক্তির স্বাদ: পুজোয় চলুন কাশীরাম দাসের সিঙ্গি গ্রাম

0
সিঙ্গি গ্রাম।
সিঙ্গি গ্রামের প্রকৃতি।

এখন শরীর আর মন দুই-ই ঘরবন্দি। কিন্তু দু’টোই একটু হাঁফ ছাড়তে চাইছে। তার ওপর দোরগোড়ায় পুজো। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। ভ্রামণিক বাঙালি পুজোর ছুটিতে ঘরে থাকতে চায় না। কিন্তু এ বার করোনার আবহে বাড়ির বাইরে বেরোনো নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভুগছেন। করোনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তাই দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বেরিয়ে পড়ুন। দূরের ভ্রমণে না হোক, কাছেপিঠে তো যাওয়াই যায়, তিন-চার দিনের ভ্রমণে। শুধু মাথায় রাখবেন স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা।

এমনই কিছু জায়গার কথা বিশদে জানাচ্ছে খবরঅনলাইন। আজ দ্বিতীয় পর্বে পূর্ব বর্ধমান জেলার সিঙ্গি গ্রাম

সত্যি বলতে কী, ভ্রমণ-মানচিত্রে খুব একটা পরিচিত নয় এই সিঙ্গি গ্রাম। তবে বাংলায় মহাভারত রচয়িতা কাশীরাম দাসের জন্য এই গ্রামের খ্যাতি যথেষ্ট। এই গ্রামেই তাঁর জন্ম, রয়েছে তাঁর বসতবাটীও। যদিও তার ভগ্ন দশা।

কেন যাবেন এই গণ্ডগ্রামে

এখানকার শান্তিনিকেতন হোমস্টের কর্ণধার সম্রাট ব্যানার্জিকে যদি এই প্রশ্ন করেন, তাঁর জবাব: 

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, বা বন্ধুদের সঙ্গে অলস বিশ্রাম যাপন করতে অথবা নিজের কাছে একলা হতে; ফুসফুস ভরে বিশুদ্ধ অক্সিজেন নিতে; মুখরোচক অথচ ১০০% বিষমুক্ত খাবারের স্বাদ নিতে; আর বিভিন্ন ঋতুতে দু’ চোখ ভরে প্রকৃতির রূপ দেখতে। আর আশেপাশের অসংখ্য তথাকথিত ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ তো আছেই। তাই দু’-চারটে দিন অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যায় এই গ্রামে।

ঘোরাঘুরি

(১) কাশীরাম দাসের বসতবাটী – সিঙ্গি গ্রামেই। বাড়ির ভগ্নদশা হলেও এখানে একটি ছোট্ট পাতালঘর আছে। শোনা যায়, কবি এখানে তাঁর পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রায়ই আত্মগোপন করতেন।

ক্ষেত্রপাল ঠাকুরের থান।

২) ক্ষেত্রপাল ঠাকুরের থান – সিঙ্গি গ্রামেই। কোনো বিগ্রহ নেই। অতি প্রাচীন একটি বটগাছকে পূজা করা হয়। গ্রামের প্রান্তিক দেবতা।

(৩) শ্রীবাটী গ্রাম – সিঙ্গি থেকে ২ কিমি, এখানকার তিনটি অসাধারণ টেরাকোটার কারুকার্যসমৃদ্ধ মন্দির আপনার অপেক্ষায় আছে।

(৪) ক্ষীরগ্রাম – সিঙ্গি থেকে ১৮ কিমি, যোগাদ্যা সতীপীঠের জন্য বিখ্যাত, যে গ্রামকে স্মরণীয় করে রেখেছেন ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘যোগাদ্যা বন্দনা’য়। গ্রামে ঢুকতেই হাজার বিঘের ক্ষীরদিঘি, যেখানে পড়েছিল সতীর ডান পায়ের আঙুল। রয়েছে যোগাদ্যার মন্দির, অনুচ্চ টিলার টঙে দেবীর ভৈরব ক্ষীরকণ্ঠ শিবের মন্দির।

(৫) মুশারু-সহ চার গ্রাম – সিঙ্গি থেকে ২৬ কিমি, ক্ষীরগ্রাম থেকে ১২ কিমি। চলুন ঝাংলাই কেউটে সাপের গ্রাম মুশারু, ছোট পোষলা, বড়ো পোষলা এবং পলসোনায়। নিজের চোখে দেখবেন বিষধর সাপের সঙ্গে ওই চার গ্রামের বাসিন্দাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।

(৬) ওরগ্রাম – সিঙ্গি থেকে ৫১ কিমি, মুশারু থেকে ৩০ কিমি, নূতনহাট থেকে ২৬ কিমি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে তৈরি এক গোপন বিমানবন্দর দেখতে হলে চলুন ওরগ্রামের জঙ্গলে। রয়েছে কফি গাছের জঙ্গল।

শ্রীবাটীর মন্দিরগাত্রের কাজ।

(৭) নূতনহাট – সিঙ্গি থেকে ৩৫ কিমি, ক্ষীরগ্রাম থেকে ১৮ কিমি, ওরগ্রাম থেকে ২৬ কিমি। দেখে নিন হুসেনশাহি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ, মসজিদের গায়ে পোড়ামাটির কাজ, ‘বিক্রমাদিত্যের ডাঙা’ যেখান থেকে মিলেছে শুঙ্গ, কুষাণ ও গুপ্ত সংস্কৃতির নানা নিদর্শন।

(৮) কোগ্রাম – সিঙ্গি থেকে ৩৮ কিমি, নূতনহাট থেকে ৩ কিমি। ‘ভাঙন ধরা অজয় নদীর বাঁকে’ কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের ভিটে। চৈতন্যমঙ্গলের কবি লোচনদাসের শ্রীপাট ছিল এই কোগ্রামেই। এখানে রয়েছে লোচনদাসের সমাধিমন্দির।  আর এই হল মঙ্গলকাব্যের উজানিনগর, এখানেই ছিল ভ্রমরার দহ যেখানে নোঙর করা থাকত ধনপতি-শ্রীমন্তদের বাণিজ্যডিঙা। অজয় ও কুনুর নদীর সঙ্গমস্থলে এক ত্রিভুজাকৃতি ভূখণ্ড। কাছেই উজানি সতীপীঠ, দেবী সর্বমঙ্গলার মন্দির।  

(৯) জগদানন্দপুর – সিঙ্গি থেকে ১২ কিমি, পুরাতত্ত্বে আগ্রহ থাকলে জগদানন্দপুরের রাধাগোবিন্দ জিউর মন্দির দেখতেই হবে, অসাধারণ সুন্দর পাথরের মন্দির। ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে তৈরি, ৮২ ফুট উঁচু দ্বিতল পঞ্চচূড়া মন্দির।

(১০) নতুনগ্রাম – সিঙ্গি থেকে ১৫ কিমি, জগদানন্দপুর থেকে ৬ কিমি। কাঠের প্যাঁচা শিল্পীদের গ্রাম, দেখে আসুন কী ভাবে অত্যন্ত স্বল্প সময়ে তৈরি হয়ে যাচ্ছে এই অনবদ্য হস্তশিল্প।

(১১) দাঁইহাট – সিঙ্গি থেকে ১৪ কিমি, জগদানন্দপুর থেকে ৫ কিমি। ২৮০ বছরের পুরোনো, ‘মরাঠা দস্যু’ ভাস্কর পণ্ডিতের দুর্গাবাড়ি। প্রায় ধ্বংস হওয়ার মুখে এই ঐতিহাসিক স্থান।

নতুনগ্রামের হস্তশিল্প।

(১২) কাটোয়া – দাঁইহাট থেকে ১০ কিমি, সিঙ্গি থেকে ১৯ কিমি, ঐতিহাসিক শহর। নিমাইয়ের দীক্ষাস্থল গৌরাঙ্গবাড়িতে দেখে নিন নিমাইয়ের মস্তক মুণ্ডনের স্থান, পাশেই সন্ন্যাসগ্রহণ ও শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যগিরি তথা শ্রীচৈতন্য নামগ্রহণের স্থান, কেশব ভারতীর সমাধি, মন্দিরে গৌর-নিতাইয়ের বিগ্রহ। কাটোয়ায় আরও দেখুন জগাই-মাধাইয়ের অন্যতম মাধাইয়ের নামে মাধাইতলা; বাগানপাড়ায় ৩০০ বছরের শাহি মসজিদ, সাহেববাগানে উইলিয়াম কেরির দ্বিতীয় পুত্র জুনিয়ার উইলিয়ামের সমাধি। কাছেই ভাগীরথী ও অজয়ের সঙ্গম।

(১৩) কেতুগ্রাম – সিঙ্গি থেকে ৩৪ কিমি, কাটোয়া থেকে ১৬ কিমি। বহুলা সতীপীঠ, দেবীর বাম বাহু পড়েছিল এখানে।

(১৪) নিরোল – সিঙ্গি থেকে ৪২ কিমি, কেতুগ্রাম থেকে ৮ কিমি। ঈশানী নদীর পাড়ে অট্টহাস সতীপীঠ। দেবীর ওষ্ঠ তথা ঠোঁট পড়ে এখানে। সেই থেকে নাম ওষ্ঠহাস, সেখান থেকে অট্টহাস। এক নিরালা তপোবন, দেবীর কোনো মূর্তি নেই, ঘটে পুজো। রয়েছেন দেবীর ভৈরব বিশ্বেশ্বর শিব, পঞ্চমুণ্ডির আসনে রটন্তী কালী।  

(১৫) উদ্ধারণপুর – সিঙ্গি থেকে ৪৬ কিমি, কাটোয়া থেকে ২৩ কিমি, কেতুগ্রাম থেকে ১২ কিমি। সাধক সাহিত্যিক অবধূত যে স্থানকে অমর করে রেখেছেন তাঁর ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’-এ, সেই উদ্ধারণপুর ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ে। বাঁধানো ঘাটের পাশেই নৈহাটির রাজার দেওয়ান দিবাকর দত্ত, পরবর্তী কালে নিতাইয়ের প্রিয় শিষ্য উদ্ধারণ দত্ত প্রতিষ্ঠিত গৌরাঙ্গ মন্দির, তাঁর সমাধিমন্দির এবং বিখ্যাত মহাশ্মশান।

১০৮ শিবমন্দির, কালনা। ছবি উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া।

(১৬) চুপির চর – সিঙ্গি থেকে ২৫ কিমি। কাষ্ঠশালি পাখিরালয়ে পৌঁছে নৌকা নিয়ে ভেসে পড়ুন ভাগীরথীর বুকে, হরেক রকম পরিযায়ী পাখির সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য।  

(১৭) নবদ্বীপ-মায়াপুর – নবদ্বীপ, সিঙ্গি থেকে ২৯ কিমি, কাষ্ঠশালি পাখিরালয় থেকে ১৪ কিমি। নবদ্বীপ থেকে মায়াপুর ১২ কিমি। ফেরিতে গঙ্গা পেরিয়েও যেতে পারেন। বিষ্ণুপ্রিয়া-শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থান নবদ্বীপ-মায়াপুর অসংখ্য মন্দিরে শোভিত, ঘরে ঘরে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দির। মায়াপুর ইসকনের সদর কার্যালয়, রয়েছে চন্দ্রোদয় মন্দির।   

১৮) কালনা – নবদ্বীপ থেকে ২৬ কিমি, সিঙ্গি থেকে ৫১ কিমি। ভাগীরথী পাড়ের কালনায় দেখে নিন ভবা পাগলার আরাধ্যা দেবী ভবানীর মন্দির, অদূরে গৌরীদাস পণ্ডিতের শ্রীপাট তথা গৌরাঙ্গ মন্দির, লাগোয়া শ্রীশ্রীমহাপ্রভুর বিশ্রামস্থল অমলীতলা, দেবী অম্বিকাকে উৎসর্গ করা সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, চকবাজারে নবকৈলাস তথা ১০৮ শিবমন্দির, বিপরীতে টেরাকোটা-কাজে সমৃদ্ধ লালজি মন্দির, প্রতাপেশ্বর মন্দির ও ২৫ চুড়োর কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির, রাজবাটী, শ্যামরায়পাড়ায় অনন্ত বাসুদেব মন্দির ইত্যাদি।  

অন্য ভাবেও উপভোগ করতে পারেন সিঙ্গি

সূর্যাস্তে সিঙ্গি।

গ্রামের পথে হাঁটুন। পরিষ্কার রাতের আকাশে চন্দ্রোদয় আর ধানখেতের মধ্যে সূর্যাস্তের সাক্ষী থাকুন।

পাখি দেখায় আগ্রহ থাকলে ক্যামেরা আর বাইনোকুলার নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। সারা বছরই এখানে শামুকখোল (এশিয়ান ওপেন বিলেড স্টর্ক), মানিকজোড় (উলি নেকেড স্টর্ক), কাস্তেচড়া (ব্ল্যাক হেডেড আইবিস), বাঁশপাতি (গ্রিন বি ইটার) ছাড়াও তিন রকম মাছরাঙার দেখা পাওয়া যায়। ফিঙে, মৌটুসী, বুলবুলি, প্যাঁচা, খঞ্জন, ছাতারে আছেই।

আর তা না হলে পছন্দের বই আর গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে শান্তিনিকেতন হোমস্টের ওপেন টেরেস অথবা বাগানে বসে/শুয়ে শুধুমাত্র ছুটি কাটান।

কী ভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে সিঙ্গি পৌঁছোনোর অনেক উপায় আছে।

ট্রেনপথে – হাওড়া বা শিয়ালদা স্টেশন থেকে কাটোয়া লাইনের যে কোনো ট্রেন ধরে কাটোয়ার তিনটে স্টেশন আগে পাটুলি স্টেশনে (শুধুমাত্র লোকাল ট্রেন থামে, মেল/এক্সপ্রেসে এলে কাটোয়া জংশনে নামতে হয়) নেমে শেয়ারে ম্যাজিক/অটো/টোটোয় চড়ে আসতে পারেন, ভাড়া: জনপ্রতি ১৫/২০ টাকা। হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে পাটুলি স্টেশন পৌঁছোতে সময় লাগে পৌনে তিন ঘন্টা।

শিয়ালদা থেকে কাটোয়া লাইনের ট্রেনের সংখ্যা কম, তুলনায় হাওড়া থেকে অনেক বেশি।

বর্তমানে করোনার কারণে যাবতীয় লোকাল ট্রেন চলাচল বন্ধ।

সড়কপথে – গাড়িতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে মেমারি, সেখান থেকে সাতগাছিয়া, মন্তেশ্বর, মালডাঙা, মেঝিরি, সিঙ্গির মোড় হয়ে সিঙ্গি। কলকাতার এসপ্ল্যানেড থেকে এ পথে দূরত্ব ১৩৬ কিমির মতো। সময় লাগে মোটামুটি ৩ ঘন্টা।

এ ছাড়া ডানকুনি থেকে পুরোনো দিল্লি রোড ধরে মগরা হয়ে কালনা, নবদ্বীপ, পারুলিয়া ছুঁয়ে (এসপ্ল্যানেড থেকে মোটামুটি ১৪৭ কিমি) অথবা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বর্ধমান শহর, সেখান থেকে বলগোনা, কৈচর, কৈথন, সিঙ্গির মোড় ছুঁয়েও (এসপ্ল্যানেড থেকে মোটামুটি ১৫৮ কিমি) সিঙ্গি আসা যায়।

শান্তিনিকেতন হোমস্টে।

কোথায় থাকবেন   

সিঙ্গিতে থাকার জন্য রয়েছে শান্তিনিকেতন হোমস্টে। যোগাযোগ করুন Travelism-এর সঙ্গে: ৮২৭৬০০৮১৮৯/৯৯০৩৭৬৩২৯৬

অতিথির সঙ্গে আসা গাড়ির চালকবন্ধুদের থাকার জন্য বাড়ির একতলায় আলাদা ঘর আছে।

কী ভাবে ঘুরবেন

সিঙ্গি এবং আশেপাশের বিভিন্ন দ্রষ্টব্য ঘুরে বেড়ানোর জন্যে টোটো এবং বিভিন্ন ধরনের গাড়ির খোঁজ পাওয়া যায় শান্তিনিকেতন হোমস্টে-তেই। কী ভাবে ঘুরবেন সে ব্যাপারে শান্তিনিকেতন হোমস্টের কর্ণধার সম্রাট ব্যানার্জি আপনাকে সাহায্য করতে পারেন।

আরও পড়তে পারেন

বন্দিদশা থেকে মুক্তির স্বাদ: পুজোয় চলুন ঘাটশিলা

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন