কোদুনগাল্লুর, এখনও পর্যটকদের কাছে সে ভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। কিন্তু কোচি থেকে মাত্র ৪৫ কিমি দূরে এই জায়গাটিতে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায়।

প্রায় ৩০০০ বছর আগের কথা। এই কোদুনগাল্লুরেই ছিল তখনকার মুজিরিস শহর। স্থানীয় ভাষায় যার নাম মুরচ্চিপট্টনম। তখনকার দিনে বিশ্বের বৃহত্তম শহরগুলির মধ্যে একটি ছিল এই মুজিরিস। পেরিয়ার নদী আর আরব সাগর সংলগ্ন মালাবার উপকূলে গড়ে উঠেছিল মুজিরিস বন্দর যা দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে গ্রিক, রোমান, মিশরীয় আর পার্সিয়ানদের ব্যবসাবাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এই বন্দর থেকে দামি পাথর, মশলা, ডায়মন্ড, সোনা, মুক্ত, নীলকান্তমণি, চিনা সিল্ক, হাতির দাঁত ও আরও অনেক কিছু আমদানি-রফতানি হত। সঙ্গম সাহিত্য এবং কিছু কিংবদন্তি ইউরোপীয় সাহিত্যে এই মুজিরিসের উল্লেখ পাওয়া যায়। সঙ্গম সাহিত্যের অন্তর্গত একটি তামিল কবিতায় লেখা আছে, “পেরিয়ার নদীতে ঢেউ তুলে মুরচ্চিপট্টনমে নঙর ফেলল একটি বড়ো জাহাজ। নিয়ে এসেছে সোনাদানা। এখান থেকে নিয়ে যাবে মশলা। এখানে সমুদ্রের গর্জন কখনও থামে না। পাহাড়, সমুদ্রের এক অব্ধুত মেলবন্ধন অতিথিদের উপহার দিচ্ছেন আমাদের রাজা”।

ইতিহাসবিদ ও লেখক মনু পিল্লাই বলেন “মশলা আমদানির জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই মুজিরিস যে আরবরা এই জায়গাটির সন্ধান অন্য কাউকে জানায়নি। খ্রিস্টজন্মের ৪০ বছর পর গ্রিক নাবিক হিপালুস এখানে আসেন, এর পর পা পড়ে রোমানদের।”

কিন্তু ১৩৪১ সালের পেরিয়ার নদীতে ভয়াবহ বন্যা আর ঘূর্ণিঝড়ে পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য মুছে যায় এই শহরটি। এর পরই জন্ম নেয় আধুনিক বিশ্বের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর কোড়িকোড় আর কোচি। কিন্তু পিল্লাইয়ের মতে, “মুজিরিসের যা সম্পদ ছিল কোনও দিনও তার ধারেকাছে পৌঁছতে পারবে না এই দুই কোচি আর কোড়িকোড়”।

গত ৬ বছর ধরে কোদুনগাল্লুরের উত্তরে পট্টনম গ্রামে বিশাল ভাবে খনন কাজ করছে কেরল কাউন্সিল অফ হিস্টোরিকাল রিসার্চ (কেসিএইচআর)। খনন থেকে উঠে এসেছে এমন কিছু, যা প্রমাণ করে ৩০০০ বছর আগে এখানেই ছিল মুজিরিস বন্দর। মুজিরিসের ঐতিহ্যকে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে আসরে নেমেছে কেরল পর্যটন। খরচ করা হচ্ছে ৯৪ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের নাম রাখা হয়েছে মুজিরিস হেরিটেজ প্রজেক্ট।     

কোদুনগাল্লুর এবং তার আশেপাশে ২৫টিরও বেশি সংগ্রহশালায় খননে উদ্ধার হওয়া জিনিসগুলিকে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে বিশেষ বোট সার্ভিসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়াও সার্কিট ট্যুরেরও ব্যবস্থা থাকছে পর্যটন দফতরের তরফ থেকে। শুধু সংগ্রহশালা দর্শনই নয়, এই প্রকল্পে দেখানো হবে ১৫২৩-এ পর্তুগিজদের হাতে নির্মিত কোট্টাপুরম দুর্গ, চেরামান জামা মসজিদ আর কোদুনগাল্লুর মন্দির।

তা হলে এখন থেকে আপনার কেরল ভ্রমণে জায়গা করে নিতেই পারে কোদুনগাল্লুর।

মুজিরিস হেরিটেজ প্রোজেক্ট নিয়ে আরও বিশদে জানতে লগ-ইন করুন: www.muzirisheritage.org

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here