‘নতুন আলোয় রাজ্যকে দেখুন’, ভ্রমণপিপাসুদের উৎসাহে টিটিএফে সুপারহিট কাশ্মীর

0
3116
শ্রয়ণ সেন

“ভাইয়া, শ্রীনগর জানে মে কই দিক্কত তো নেহি হোগা।”

বছর তিরিশের ভ্রমণপিপাসু সুপর্ণা দাশগুপ্ত প্রশ্নটি করলেন কাশ্মীর প্যাভিলিয়নে থাকা শ্রীনগরের একটি বেসরকারি হোটেলের কর্মীকে। ওই কর্মী সুপর্ণাদেবীকে বোন সম্বোধন করে বললেন, “আপনি নির্দ্বিধায় চলে আসুন কাশ্মীর। শ্রীনগরে নামার পর আপনার নিরাপত্তার সব দায়িত্ব আমাদের।”

বর্তমান পরিস্থিতিতে কাশ্মীর যাওয়ার পরিকল্পনা সুপর্ণাদেবী সত্যি করবেন কি না সেটা তিনিই ঠিক করবেন, কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যা আগ্রহ দেখলাম সেটা কল্পনাও করতে পারিনি।

নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়াম এবং ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে আয়োজিত হয়েছে ট্র্যাভেল ট্যুরিজম ফেয়ার (টিটিএফ)। সাংবাদিক হওয়ার পাশাপাশি একজন ভ্রমণপিপাসু হিসেবে আমিও চলে এসেছি টিটিএফে। বিভিন্ন রাজ্যের পর্যটন নিগমের সঙ্গে অনেক বেসরকারি ভ্রমণ সংস্থাও হাজির। রয়েছে বাংলাদেশ, নেপাল, তাইল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কার মতো বিদেশি পর্যটন নিগমও।

তাইল্যান্ডের প্যাভিলিয়ন।

মানুষ ঘুরছেন, ভ্রমণের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। অনেক পর্যটন সংস্থাই তৎক্ষণাৎ বুকিং-এর ব্যবস্থাও করে রেখেছে। সেখানে চলছে দেদার বুকিং। পুজোর বুকিং প্রায় সাঙ্গ হয়ে গিয়েছে, অনেকে এখন থেকেই শীতের ভ্রমণের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন।

বাঙালি পর্যটকদের কাছে ভ্রমণের সেরা সময় পুজোর ছুটি, কিন্তু গুজরাতের ক্ষেত্রে শীতকালই ভ্রমণের আদর্শ। আবহাওয়া যে মূল কারণ, সেটা বলে দেন গুজরাত প্যাভিলিয়নে থাকা বেসরকারি ভ্রমণ সংস্থার কর্ণধার দর্শক গান্ধী।

তাঁর কথায়, “এ বার দুর্গাপুজো যখন রয়েছে, মানে অক্টোবরের শুরুতে, তখন গুজরাতে বেশ গরম থাকবে। বিশেষ করে কচ্ছ অঞ্চল। ওই সময়টা কচ্ছ ঘোরার আদর্শ নয়। তাই গুজরাত যাওয়ার আদর্শ সময় শীত।” তখন কচ্ছে রন উৎসব চলবে, সেটাও বলেন দর্শকবাবু।

গুজরাতের পর হিমাচল, মধ্যপ্রদেশ, কেরল, ত্রিপুরা ঘুরে এসে দাঁড়ালাম কাশ্মীরের সামনে। বাকিদের তুলনায় প্যাভিলিয়নে বেশি চাকচিক্য নেই, কিন্তু ভ্রমণপিপাসুদের যেন ঢল নেমেছে প্যাভিলিয়নের সামনে। সুপর্ণাদেবীর মতোই কাশ্মীর সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন আরও বহু মানুষ। তেমনই একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব সুকুমার পাল। গত বছর থেকে কাশ্মীরে যে অশান্তি চলছে সে ব্যাপারে বেশ চিন্তিত লাগল সুকুমারবাবুকে। তাঁর কথায়, “কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি খুব উদ্বেগজনক সন্দেহ নেই, কিন্তু পর্যটকরা যদি একদম যাওয়া বন্ধ করে দেন তা হলে ওদের ব্যবসার খুব ক্ষতি হবে। এক জন পর্যটক হিসেবে আমি চাই না সে রকম কিছু হোক, সেই কারণেই চলে এসেছি খোঁজখবর নিতে।”

সংবাদমাধ্যমে যতটা প্রচার হচ্ছে পরিস্থিতি আদৌ ততটা খারাপ নয় বলে মনে করেন সুকুমারবাবু। তাঁর এই কথাটাই কার্যত ছোঁ মেরে নিয়ে নিলেন কাটরার এক হোটেল ব্যবসায়ী। তাঁর কথায়, “আপনারা কাশ্মীর আসুন। পরিস্থিতি যতটা খারাপ দেখানো হচ্ছে ততটা খারাপ নয়।” মূল গণ্ডগোল যেখানে হচ্ছে সেখানে এমনিতেই পর্যটকদের খুব একটা পা পড়ে না বলে মত তাঁর। অমরনাথ হোক, কী সুফি সার্কিট, খোঁজখবর চলছে সব কিছু নিয়েই।

কাশ্মীরের প্যাভিলিয়নের সামনে ভিড়।

আরও একটা অসাধারণ মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করলাম এই কাশ্মীর প্যাভিলিয়নে। অমরনাথ যাত্রা নিয়ে একজনের কৌতূহল মেটাচ্ছেন শ্রীনগরের মুসলিম হোটেল ব্যবসায়ী। তাঁর পাশেই সুফি সার্কিট নিয়ে একজনকে বলছেন জম্মুর ভ্রমণ সংস্থার হিন্দু কর্মী। তাঁদের পাশেই বসে রয়েছেন একটি কার রেন্টাল সংস্থার শিখ ব্যবসায়ী। আজকের দিনে এই সহাবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

“একটি অভিযোগ রয়েছে আমাদের।” প্রায় সমস্বরে বলে উঠলেন ওই প্যাভিলিয়নে থাকা তিন-চারজন। আমি কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম “কী অভিযোগ?”

এর পর সব থেকে অবাক করে দেওয়া উত্তর দিলেন শ্রীনগরের ওই ব্যবসায়ী — “অভিযোগটি টিটিএফের বিরুদ্ধে। কেন মাত্র তিন দিন হয় এই মেলা! কেন আরও কয়েকটি দিন বাড়ানো যায় না।” তিনি বলেন, কলকাতার মানুষের কাছে তাঁরা যা ভালোবাসা পান, তাতে তাঁদের আরও কয়েকটা দিন এখানে থেকে যেতে ইচ্ছে করে। রবিবারের পরেই তাঁদের চলে যেতে হবে কলকাতা ছেড়ে হায়দরাবাদ, তাই মনটা খারাপ ওই ব্যবসায়ীর।

ফিরে আসার সময় কাটরার ওই ভদ্রলোক আমাকে আবেদন করলেন, “সবাইকে বলবেন কাশ্মীর আসতে এবং অন্য আলোয় রাজ্যটাকে দেখতে।” সত্যিই কাশ্মীর পর্যটনের স্লোগানই তো ‘সি জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর ইন আ নিউ লাইট।’

ছবি: রাজীব বসু

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here