twf seminar
আলোচনাসভায় বক্তৃতা করছেন শ্রেয়সী লাহিড়ী। মঞ্চে রয়েছেন অভিজিৎ পাল, রতনলাল বিশ্বাস, রজত চক্রবর্তী এবং অমিত আইচ।

শম্ভু সেন

আজকের দিনে ভ্রমণ হল আধিক্য আর আধিপত্যের উগ্র প্রদর্শন। এবং সেই আধিক্যের প্রতিযোগিতায় আমরা হারাচ্ছি অনেককেই, কিন্তু হারিয়ে ফেলছি অনেক কিছু। যেমন ধরা যাক, বিস্মিত হওয়ার বোধ। এমনটাই মনে করেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক রজত চক্রবর্তী।

রজতবাবু বক্তৃতা দিচ্ছিলেন এক আলোচনাসভায়। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি হলে (Paschimbanga Bangla Akademi) সেই আলোচনাসভার আয়োজক ছিল ট্রাভেল রাইটার্স ফোরাম (টিডব্লিউএফ)।

ত্রয়োদশ বার্ষিক ‘ভ্রমণ বিষয়ক আলোচনা ও স্লাইড প্রদর্শন’-এর সূচনায় উদ্‌বোধন সংগীত পরিবেশন করেন সুকল্পা গুহমজুমদার। তাঁর গাওয়া  ‘আনন্দেরই সাগর হতে এসেছে আজ বান’ শ্রোতা-দর্শকদের মুগ্ধ করে।

প্রারম্ভিক ভাষণে ট্রাভেল রাইটার্স ফোরামের (Travel Writers Forum) সম্পাদক রথীন চক্রবর্তী তাঁদের সংস্থার সারা বছরের কাজের খতিয়ান দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ১৬ বছরে টিডব্লিউএফ (twf) অনেক গভীরে গিয়েছে এবং তার এই সাফল্যের অংশীদার ফোরামের সব সদস্য এবং ভ্রামণিক ও ভ্রমণ-লেখকরা।

ফোরামের সভায় শ্রোতা-দর্শকরা।

এর পর শুরু হয় আলোচনাসভা। প্রথম আলোচক ছিলেন ফোরামের সদস্য শ্রেয়সী লাহিড়ী। তাঁর বিষয় ছিল মেয়েদের ভ্রমণ। ‘মেয়েদের ভ্রমণ’ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি চলে যান উনিশ শতকের কথায়, যখন ঠাকুরবাড়ির মেজ বউ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী গর্ভবতী অবস্থায় কোনো পুরুষসঙ্গী ছাড়াই তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে বিলেত পাড়ি দিয়েছিলেন। তাঁর এই সাহসিকতা সে দিন বঙ্গসমাজে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। পুরুষশাসিত সমাজের ফতোয়ার তোয়াক্কা না করে বেরিয়ে পড়েছিলেন ‘ইংল্যান্ডে বঙ্গমহিলা’র লেখিকা কৃষ্ণভাবিনী দাস। ভ্রমণই ছিল তাঁর কাছে স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ। শ্রেয়সীর বক্তৃতায় চলে আসে জাপানযাত্রী প্রথম ভারতীয় মহিলা হরিপ্রভা তাকেদার কথাও।

এ ভাবেই ইতিহাস থেকে বর্তমান সময়ে চলে আসেন শ্রেয়সী। চলে আসেন মেয়েদের নানা অভিযানের প্রসঙ্গে। গত শতকের ষাটের দশকে রন্টি অভিযান মেয়েদের প্রথম পর্বত অভিযান। মেয়েদের দলবদ্ধ ভ্রমণের সূত্রপাত। দিন যত এগোচ্ছে, মেয়েরা তত স্বাবলম্বী হচ্ছে ভ্রমণে। বেরিয়ে পড়ছে একাকী ভ্রমণে বা অভিযানে। পাহাড়ে চড়া থেকে শুরু করে সাইকেল নিয়ে দেশ-বিদেশ পাড়ি, বাকি নেই কিছুই। কিন্তু একুশ শতকের দু’টি দশকে পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মেয়েরা একাকী ভ্রমণে বেরোলে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। শ্রেয়সী নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সেই কাহিনিও শোনালেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, সমাজ যেন এখনও পুরুষদের ছায়াতেই মেয়েদের দেখতে ভালোবাসে এবং ভ্রমণও তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁর মতে, মেয়েদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে আগে ছিল স্বাধীনতাহীনতা, এখন নিরাপত্তাহীনতা। তবে এই নিরাপত্তাহীনতা বিদেশে নয়, আমাদের দেশেই।   

শ্রেয়সীর পর আলোচনাসভায় দ্বিতীয় বক্তা ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক অমিত আইচ। তাঁর বিষয় ছিল, ভ্রমণপত্রিকার সুলুকসন্ধান। স্বাধীনতার পর এই বাংলায় কখন ভ্রমণপত্রিকার আবির্ভাব ঘটেছে এবং কী ভাবে ভ্রমণপত্রিকা পত্রিকা জনপ্রিয় হয়েছে সে সম্পর্কে সবিস্তার আলোচনা করেন অমিতবাবু। তাঁর বক্তৃতার সূত্রেই আমরা জানতে পারি, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম ভ্রমণপত্রিকা প্রকাশিত হয় স্বাধীনতার ২০ বছর পরে – মনোজ দাস সম্পাদিত ‘ভ্রমণ কাব্য’ পত্রিকা। ১৯৬৭ সালের ১ অক্টোবর প্রথম এই মাসিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

বক্তৃতা করছেন অমিত আইচ।

অমিতবাবুর তথ্য অনুযায়ী একটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকা হল ‘বনমহল’। এই পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ ছিল উত্তরবঙ্গের কাঠ ব্যবসায়ীদের। ১৯৭০ সালে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৯৭১ সালের অক্টোবর থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে ‘ভ্রমণ বার্তা’। চুঁচুড়া থেকে প্রকাশিত ওই পত্রিকায় লেখা থাকত ‘পর্যটন বিষয়ক পাক্ষিক সংবাদপত্র’।

এর পর একে একে প্রচুর ভ্রমণ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। সে সবের যতটা সম্ভব উল্লেখ করেন অমিতবাবু – যেমন শ্যামলী সেন ও নিবেদিতা ঘোষ সম্পাদিত ‘মুসাফির’, মিহির সেনগুপ্ত সম্পাদিত ‘হিমালয়’, কমল গুহ সম্পাদিত ‘হিমবন্ত’ পত্রিকা, বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘চল যাই’ ইত্যাদি। অমিতবাবু জানালেন, ‘হিমবন্ত’ ছিল হিমালয় নিয়ে প্রথম বিশুদ্ধ গবেষণামূলক পত্রিকা।

অমিতবাবু ভেবেছেন, দেশ স্বাধীনতা পাওয়ার পর অন্তত ২০ বছর কেন লাগল, বাংলায় ভ্রমণপত্রিকা প্রকাশিত হতে? এর উত্তরও খুঁজেছেন তিনি। তিনি বলেন, আসলে এই সব পত্রিকার প্রকাশের ব্যাপারে যাঁরা উদ্যোগী হয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগ ছিলেন দেশভাগে জর্জরিত ছিন্নমূল পরিবারের। সেই সব পরিবারের থিতু হতে ২০টা বছর সময় তো লাগতেই পারে।

অমিতবাবু বলেন, ভ্রমণপত্রিকার প্রাণকেন্দ্র কলকাতা, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। গঙ্গার ও পার থেকেও ভালো ভালো ভ্রমণপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে।

আলোচনাসভায় শেষ বক্তা ছিলেন রজত চক্রবর্তী। বিষয় ছিল ‘বর্তমানে ভ্রমণ আধিক্য ও আধিপত্যের আখ্যান’। মূলত ভ্রমণপিপাসুদের সভায় প্রথাবিরোধী বিষয়বস্তু এবং বক্তৃতার ভঙ্গিমার সৌজন্যে শ্রোতা-দর্শকদের মাত করে দেন রজতবাবু। নিজেকে অভ্রামণিক আখ্যা দিয়ে রজতবাবু বলেন, ভ্রমণের প্রতুলতার আধিক্যে বিস্ময়বোধ চলে যাচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, যে অনুভূতিগুলো আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে পাচ্ছি না সেগুলো কি ভ্রমণে পাচ্ছি? তাঁর জবাব, পাচ্ছি না। তাঁর প্রশ্ন, আমাদের ভ্রমণে বিস্ময় কি সঞ্চয় হয়ে থাকছে? তাঁর উত্তর, থাকছে না।

বক্তৃতা করছেন রজত চক্রবর্তী।

রজতবাবুর কথায়, আজ যে বেড়াতে যাচ্ছে, সে অনুভূতি হারিয়ে যাচ্ছে। ভ্রমণ আজ শিল্পে পরিণত হয়েছে – পর্যটন শিল্প। হোম স্টে-তে গিয়ে টক দই খুঁজছি, বেগুন ভার্তা খুঁজছি। এই আধিপত্যে ভ্রমণ কোথায় থাকছে? রজতবাবু মনে করেন, ভ্রমণে দরকার অনুভূতি। যে ভ্রমণে নিজের সঙ্গে কথা বলা যায়, যে ভ্রমণে নিজেকে বের করে আনা যায়, যে ভ্রমণে নিজেকে নিভৃতে খুঁজে পাওয়া যায়, সেটাই হল ভ্রমণ। নিজের অনুভূতিগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্যই ভ্রমণ।

এ দিনের সভার শেষ অনুষ্ঠানটি ছিল স্লাইড শো। বিশিষ্ট আলোকচিত্রী অভিজিৎ পাল তাঁর ক্যামেরায় ধরেছেন লাদাখ ও হিমাচলের স্পিতি উপত্যকার বেশ কিছু বিশেষত্ব। এই অঞ্চলের জনজীবন, প্রকৃতি, উৎসবের নানা দিক ফুটে উঠেছে সেই সব ছবিতে। অভিজিৎবাবু তাঁর তোলা সেই সব ছবি দিয়ে বানানো ‘টাইমলেস মোমেন্টস’ উপহার দেন দর্শকদের। লাদাখ ও স্পিতির সেই সব সাদাকালো ছবিতে প্রায় আধ ঘণ্টা বুঁদ হয়ে থাকেন দর্শকরা।

আরও পড়ুন: ট্রাভেল রাইটার্স ফোরামের ভ্রমণ লিখনশৈলী কর্মশালা

ট্রাভেল রাইটার্স ফোরামের মুখপত্র ‘ভ্রমী’র সর্বশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত যে পাঁচ জনের লেখা তিন বিচারকের বিচারে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়েছে, এ দিনের অনুষ্ঠানে সেই পাঁচ জনকে সম্মানিত করা হয়। তা ছাড়া ফোরাম আয়োজিত আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে যে তিন জনের ছবি দর্শকদের বিচারে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়েছে, তাঁদেরও সম্মানিত করা হয়। সব শেষে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ দেন ফোরামের সভাপতি রতনলাল বিশ্বাস।

এ দিনের অনুষ্ঠানের সূচনা করেন ফোরামের সদস্য প্রতাপ মণ্ডল। তিনি অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব তুলে দেন শক্তিপদ ভট্টাচার্যের হাতে। শক্তিপদ ভট্টাচার্যের হৃদয়গ্রাহী সঞ্চালনায় সমগ্র অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

ছবি: শ্রয়ণ সেন

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন