Swiss players showing two headed eagle against Serbia match

ওয়েবডেস্ক: সার্বিয়ার বিরুদ্ধে গোল দেওয়ার পর দুই সুইস গোলদাতা শাকিরি ও জাকা যে বিশেষ ইঙ্গিত করেছেন, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছে। যদিও তাদের ওই ইঙ্গিতে সমর্থন রয়েছে সুইস অধিনায়ক লিখৎস্টাইনারের, তবু এ ধরনের আচরণের জন্য ফিফার শাস্তি তথা জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে শাকিরি ও জাকাকে। কারণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই দুই খেলোয়াড়ের ইঙ্গিতে রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট। এবং ফিফার আচরণবিধি অনুযায়ী, খেলায় কোনো রকম রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া একেবারেই নিষিদ্ধ।

শুক্রবার সুইৎজারল্যান্ড-সার্বিয়া ম্যাচে পাঁচ মিনিটে গোল করে এগিয়ে যায় সার্বিয়া। ৫২ মিনিটে সেই গোল শোধ করেন সুইস মিডফিল্ডার গ্রানিত জাকা। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হয়ে যাওয়ার পর খেলা যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় তখন সুইৎজারল্যান্ডের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেন জেরদান শাকিরি। জাকা এবং শাকিরি, দু’ জনেই গোল করার পর দুই হাত দিয়ে দু’ মাথাওয়ালা ঈগলের (ডাবল-হেডেড ঈগল) প্রতীক দেখান। উল্লেখ্য, এই প্রতীক আলবানিয়ার জাতীয় পতাকায় রয়েছে।

কিন্তু সার্বিয়ার বিরুদ্ধে গোল করে দু’ মাথাওয়ালা ঈগলের প্রতীক দেখিয়ে কী রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছিলেন গ্রানিত জাকা এবং জেরদান শাকিরি?

আসলে দু’ মাথাওয়ালা ঈগল ক্ষমতা, শক্তি আর আধিপত্যের প্রতীক, জাতিসত্তার প্রতীক। অতি প্রাচীন কাল থেকেই এই প্রতীকের ব্যবহার চলে আসছে। তবে এর ব্যবহার বাড়ে বাইজানটাইন তথা রোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকে। একাদশ ও দ্বাদশ শতক থেকে ইসলামিক স্পেন, ফ্রান্স এবং সার্বিয়ার অধীনে থাকা রাস্কা অঞ্চলে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতক থেকে আরও এর বিস্তার ঘটে। ইসলামি বিশ্বের সেলজুক ও মামলুক সুলতানশাহি, রোমান সাম্রাজ্য এবং খ্রিস্টান বিশ্বে রাশিয়া ও সার্বিয়া দু’ মাথাওয়ালা ঈগল প্রতীকের ব্যবহার শুরু করে। চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতক থেকে আলবানিয়ার বেশ কিছু রাজপরিবার এই প্রতীক গ্রহণ করে। আধুনিক যুগে আলবানিয়া, সার্বিয়া, মন্টেনেগ্রো ও রাশিয়া তাদের জাতিসত্তার চিহ্ন হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে এই দু’ মাথাওয়ালা ঈগলের প্রতীকটি। কালক্রমে ইউরোপের আরও বহু দেশ জাতিসত্তার প্রতীক হিসাবে এই চিহ্নের ব্যবহার শুরু করে। তবে আলবানিয়ায় স্থায়ী হয়েছে এই প্রতীক। তাদের জাতীয় পতাকায়ও স্থান পায় এই প্রতীক। সময় গড়িয়েছে, শাসক বদলেছে, পতাকায় অনেক কারিকুরি এসেছে, কিন্তু দু’ মাথাওয়ালা ঈগল চিহ্নটি মূল প্রতীক হিসাবে থেকে গিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হল এই  দু’ মাথাওয়ালা ঈগল প্রতীকের সঙ্গে জাকা আর শাকিরির কী সম্পর্ক?

এঁরা দু’ জনেই আলবানীয় বংশোদ্ভূত। জাকার বাবা সার্বিয়ায় বন্দিজীবন কাটিয়েছেন। কসোভোয় কমিউনিস্ট যুগোস্লাভ শাসনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সার্বিয়ায় তিন বছর জেলবন্দি ছিলেন তিনি। জাকার জন্মের আগেই তাঁর বাবা-মা সুইৎজারল্যান্ডে চলে আসেন। সার্বিয়ায় না জন্মেও পিতৃভূমির প্রতি বিপুল টান থেকে গিয়েছে জাকার।

আর শাকিরি? তাঁর জন্ম কসোভোর শহর গিলইয়ানে। শাকিরির চার বছর বয়সে তার কসোভান বাবা ও আলবানীয় মা পুত্রকে নিয়ে সুইৎজারল্যান্ডে চলে আসতে বাধ্য হন। তার পর কসোভোর যুদ্ধ শুরু হতে তাঁরা আর স্বদেশে ফিরতে পারেননি। ইতিমধ্যে সুইৎজারল্যান্ডে থাকার সুবাদে শাকিরি সুইস নাগরিকত্ব পেয়েছেন।

২০০৮ সালে কসোভো আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পেলেও কসোভোর স্বাধীনতা মেনে নিতে অস্বীকার করে সার্বিয়া। সেই থেকে সার্বিয়া ও কসোভোর মধ্যে উত্তেজনা থেকেই গিয়েছে। শুক্রবার কালিনিনগ্রাদে ম্যাচের আগে বিষয়টি নিয়ে খেলোয়াড় আর কোচেদের মধ্যে বিশদে আলোচনা হয়। সুইস অধিনায়ক স্টেফান লিখৎস্টাইনার মনে করেন, এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই শুক্রবারের ম্যাচটাকে তাঁর সতীর্থদের কাছে কঠিন করে তুলেছিল। “আমাদের ওপর বিপুল চাপ ছিল। আমাদের কাছে এই গেমটা খুব সহজ ছিল না। আমাদের মধ্যে প্রচুর আলবিনীয় আছে। আর আলবানিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যে অনেক ইতিহাস আছে। তাই মানসিক ভাবে ওদের কাছে এই ম্যাচটা ছিল খুবই কঠিন”- বলেন লিখৎস্টাইনার।

সম্প্রতি আর্সেনালে সই করেছেন সুইস অধিনায়ক লিখৎস্টাইনার। গোল করার পর তাঁর দুই সতীর্থের আচরণে কোনো রকম অন্যায় দেখছেন না তিনি। বরং তিনি মনে করেন, গোল করে ও জিতে এ ভাবে সাফল্য উদযাপন করার পূর্ণ অধিকার তাঁদের রয়েছে। যদিও তিনি জানেন ফিফার নিয়ম অনুযায়ী এর জন্য তাঁর দুই সতীর্থকে জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here