payel samanta
পায়েল সামন্ত

ফরাসিরা শৌখিন বলে পরিচিত। ছবি ও কবিতার দেশের মানুষেরা নান্দনিক ভাবনায় অনেক উন্নত। কিন্তু, তারাও যে বিশ্বজয়ের পর বেলাগাম আনন্দ করতে জানে, তার প্রমাণ দিল রবিবারের প্যারিস।

ফ্রান্সের সময় অনুসারে খেলা শুরু হয়েছিল সন্ধের আগে। ইউরোপের গ্রীষ্মে রাত নামে ১০টার পর। আলো ঝলমলে দিনে সারা শহর এদিন কাজ ভুলে মেতেছিল বিশ্বকাপ উৎসবে। জার্মানি হোক বা ফ্রান্স, বেলজিয়াম হোক বা পোল্যান্ড, কোথাও বিশ্বকাপ নিয়ে বাড়বাড়ি রকমের উচ্ছ্বাস দেখিনি। পানশালা ও পথের ধারে রেস্তোরাঁয় জায়ান্ট স্ক্রিন এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে তারকা খেলোয়াড়দের কাট-আউট, এটুকুতেই শেষ। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর কোনও কোনও বাড়ির বারান্দায় পতাকা ঝোলাতে দেখেছি। কিন্তু, যারা বিশ্বকাপে খেলতে নামছে, তাদের মধ্যে বাংলা পাড়ায় পাড়ায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে যে মাতামাতি, তার লেশমাত্র নেই।

বিশ্বকাপ জেতার পর অবশ্য ফরাসিরা সেই খোলস থেকে বেরিয়ে এল। ইউরোপের কোনও শহরে গাড়ি হর্ন দেয় না। কিন্তু, এদিন যেন সব হর্ন শেষবারের জন্য বেজে উঠেছে! পানীয়ের ফোয়ারায় ভিজেছে মানু্ষ। জাতীয় পতাকা নিয়ে হেঁটে চলেছে অনন্ত মিছিলে। রাজনৈতিক মিছিল নয়, বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ-মিছিলে। অগুণতি পতাকার ভিড়ে সাদা-কালো ফরাসিরা একাকার, কারও হাতের ভেঁপু বাজছে উচ্চনিনাদে, কারও শরীর ঢাকা জাতীয় পতাকায়। কেউ পরেছেন ত্রিবর্ণরঞ্জিত টুপি, কারও হাতে বিয়ারের ক্যান। তবে সকলের কণ্ঠেই গান, ফরাসি ফুটবল দলের জয়গান। ২০ বছর পর জিদানের পাশে বসেছেন গ্রিজম্যান, পোগবা এমবাপেরা। এই দুই প্রজন্মের যোগসূত্র হয়ে রয়েছেন দিদিয়ের দেশঁ। এ তো নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সাম্রাজ্য অধিকার নয়, বিনা রক্তপাতে, কোনও বৈরিতা ব্যতিরেকে বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্বের আসন লাভ। তাই এও এক ধরনের নান্দনিক জয়, ফরাসিদের উদযাপন যার সঙ্গে দিব্যি মানানসই।

প্যারিসে ভারতীয়দের পাড়া গারদু নোরদে। এটা একেবারে মিনি ইন্ডিয়া, বলা ভালো উপমহাদেশ। মুদিখানা থেকে রেস্তোরাঁ, কী নেই সেখানে। সেখানে দেখা হয়েছিল বিজয়েন্দ্র, মুস্তাফিজুরদের সঙ্গে। দীর্ঘদিন ফ্রান্সে মাথা গুঁজে পড়ে থেকে, এঁরাও মনেপ্রাণে ফরাসি হয়ে উঠেছেন। এই দেশ তাঁদের আশ্রয় ও কর্মসংস্থান দিয়েছে, পরিবারকে লালন-পালনের মতো উপার্জন দিয়েছে। তাই রবিবার রাতের আতসবাজির রোশনাইয়ে বিজয়েন্দ্র ও মুস্তাফিজুরের মুখও হাসিতে উদ্ভাসিত হয়েছিল, এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here