ওয়েবডেস্ক: ঘটনার শুরু বিশ্বকাপের আগে। লন্ডনের একটি অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে সেলফি তোলেন দুই জার্মান ফুটবলার মেসুট ওজিল ও ইকে গুনদোগান। সেই নিয়ে সমালোচনায় মুখর হন জার্মান সমর্থকদের একাংশ। জার্মানির প্রতি ওজিল ও গুনদোগানের দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। কারণ তাঁরা দুজনেই তুর্কি বংশোদ্ভূত। গুনদোগান প্রেস বিবৃতি দিয়ে জানান অনুষ্ঠানে দেখা হওয়ায় স্রেফ ভদ্রতা করেই ওই সেলফি তুলেছেন তিনি। যদিও ওজিল ওই ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

চলতি বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিয়েছে জার্মানরা। ওজিলের পারফরম্যান্সও খুবই খারাপ। এমনকি সুইডেনের বিরুদ্ধে ম্যাচে প্রথম এগারোতেই ছিলেন না তিনি। তারপরই বাড়ে বিতর্ক। জার্মান দলের ম্যানেজার অলিভার বিয়েরহফ গত সপ্তাহে বলেন, ওজিল যেহেতু এরদোগানের সঙ্গে ছবি তোলার ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা দেননি, তাই তাঁকে বিশ্বকাপের দলে রাখাটাই ভুল হয়েছিল। পরে অবশ্য নিজের বক্তব্য ফিরিয়ে নিয়ে ক্ষমা চান তিনি। এর পরেই ঘটে আরও মারাত্মক ঘটনা। জার্মান ফুটবলের শীর্ষকর্তা রেইনহার্ড গ্রিন্ডেল কার্যত বিয়েরহফের মতোই বলেন, “ওজিল এখন ছুটি কাটাচ্ছে। ছুটি থেকে ফিরে নিজের স্বার্থেই ওর উচিত ওই ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া। কারণ সাধারণ মানুষ সেটা জানতে চায়”। যদিও বিশ্বকাপের জার্মান দল তৈরির সময় ওজিলকে দলে রাখারই পক্ষে ছিলেন গ্রিন্ডেল। বোঝাই যাচ্ছে, দল জঘন্য পারফরম্যান্স করায় নিজের পিঠ বাঁচাতেই নয় বছর ধরে জার্মান জাতীয় দলের হয়ে ৯২টি ম্যাচ খেলা ওজিলকে বলির পাঁঠা করছেন তিনি। অন্যদিকে কোচ জোয়াকিম লোর চুক্তি চার বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে।

এরপর মুখ খোলেন ওজিলের বাবা। তিনি বলেন, এই অপমানের পর ওজিলের জার্মান দল থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত। তাঁর মতে ওজিল অত্যন্ত সিনিয়র। ওর নিজের কোনো আচরণের ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ জার্মানির প্রতি ওর দায়বদ্ধতা প্রমাণিত। গুনদোগানের প্রেস বিবৃতি প্রসঙ্গে সিনিয়র ওজিলের বক্তব্য, যেহেতু গুনদোগান জার্মান দলে এখনও ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাই সে নিজেকে রক্ষা করতে বিবৃতি দিয়েছে। ওজিলের বাবা পরিষ্কার বলেন, ওজিলকে ‘বলির পাঁঠা’ করা করা হচ্ছে।

এর মধ্যেই স্কাই জার্মানি টিভি চ্যানেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ছুটি কাটানো হয়ে গেলেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর ঘোষণা করবেন মেসুট ওজিল। এখন থেকে তিনি লন্ডনেই থাকবেন। ২৯ বছর বয়সি এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বর্তমানে ইপিএলে আর্সেনালের হয়ে খেলেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে হারের পর ওজিল, অ্যান্তোনিও ও রুদিগার

 

এরদোগানকে নিয়ে কেন আপত্তি জার্মানদের?

তরস্কের প্রসিডেন্ট এরদোগান বরাবরই বিতর্কিত। জার্মানি সহ পশ্চিম দুনিয়ার অনেকেই মনে করেন তিনি গণতান্ত্রিক ভাবে দেশ চালান না। তাঁর আমলে বারবার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি হয়েছে। দেশের মধ্যে বিরোধীদের দমন করেছেন অগণতান্ত্রিক ভাবে। ২০১৬ সালে সে দেশে এরদোগানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান হয়। অভ্যুত্থানের আগে ও পরে বিরোধীদের ওপর নানা অত্যাচার চালান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। যার প্রতিবাদ জানায় জার্মানি। এরদোগান ক্ষমতায় থাকলে তুরস্ককে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যুক্ত হতে দেওয়ার জার্মানি। প্রতিবাদে জার্মানির গত নির্বাচনে তুরস্ক বংশোদ্ভূত জার্মানদের সে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলিকে বয়কট করতে বলেন এরদোগান। জার্মানিতে ৩০ লক্ষ তুর্ক-জার্মান থাকেন। যাদের অর্ধেকের ভোটাধিকার রয়েছে। এরদোগানের দাবি, জার্মানি তুরস্কে তাঁর বিরুদ্ধে অস্থিরতা তৈরি করছে। সে জন্যই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়াচ্ছেন তিনি। ন্যাটোর অন্তর্ভূক্ত এই দুই দেশের দ্বন্দ্বের কোপেই পড়লেন ওজিল। নয় বছর স্বদেশের হয়ে খেলার পরও তাঁকে বলা হল, দুই দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে জার্মানির হয়ে খেলা যাবে না।

জার্মানি যদি বিশ্বকাপে ভাল খেলত, যদি তিনি ভাল খেলতে পারতেন, তাহলে কি এই বিতর্ক হত? প্রশ্ন সেটাই।

ওজিল সম্পর্কে একটি তথ্য না জানালেই নয়। ব্রাজিল বিশ্বকাপে জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ৪ লক্ষ ডলার পুরস্কার অর্থ পেয়েছিলেন তিনি। যার সবটাই তিনি দান করেন ব্রাজিলের ২৩জন দুর্গত শিশুর জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here