ইরানে সরকার-বিরোধী বিক্ষোভ বৃহস্পতিবার থেকে একেবারে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছেন। সংঘর্ষে অন্তত ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি। বহু সরকারি ভবন ও মূর্তি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা সামনে এসেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গোটা দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। রাজধানী তেহরান-সহ একাধিক বড় শহরে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
এই বিক্ষোভের সূত্রপাত ২৮ ডিসেম্বর, যখন তেহরানের ঐতিহাসিক বাজারে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট শুরু হয়। সরকারি হিসেবে ডিসেম্বর মাসে ইরানে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪২.৫ শতাংশে। ক্রমশ এই আন্দোলনে যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। এখন পর্যন্ত দেশের ৩১টি প্রদেশের ৩৪৮টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৪৬টি প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি। বিক্ষোভকারীরা সরাসরি ধর্মীয় নেতৃত্বের পতনের দাবি তুলেছেন এবং স্লোগানে বারবার উঠে এসেছে নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি-র নাম।
বিক্ষোভ নতুন মাত্রা পায়, যখন পাহলভি রাত আটটায় রাস্তায় নামার ডাক দেন। তাতে তেহরান, মাশহাদ-সহ একাধিক শহরে রাতভর স্লোগান ওঠে—“পাহলভি ফিরবে”, “খামেনেইয়ের পতন চাই”। দক্ষিণ ইরানের ফার্স প্রদেশে প্রাক্তন রেভলিউশনারি গার্ড কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি-র মূর্তি ভাঙার ঘটনাও সামনে এসেছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মহল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, প্রতিবাদকারীদের উপর দমন চললে আমেরিকা কঠোর পদক্ষেপ নেবে। অন্যদিকে, রেজা পাহলভি ইউরোপীয় দেশগুলিকে ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানে চলমান গণবিক্ষোভকে শুধুমাত্র সাম্প্রতিক হিংসা ও জনরোষ বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। এই আন্দোলনের মূল শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক দমননীতির মধ্যে। ডিসেম্বরের শেষে তেহরানের বাজার বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে যে প্রতিবাদ শুরু হয়, তা আসলে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযন্ত্রণার প্রকাশ। ৪২.৫ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি ইরানের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সমাজকে কার্যত কোণঠাসা করে দিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে, অথচ আয় বাড়েনি—এই অসামঞ্জস্যই ক্ষোভকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। তেমনটা মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক প্রতিবাদ থেকে সরাসরি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখাচ্ছে যে তরুণ প্রজন্ম বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে অসন্তুষ্ট। বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ এবং নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি-র নামে স্লোগান উঠে আসা ইঙ্গিত দিচ্ছে, যে দেশে বিকল্প শাসনব্যবস্থার ভাবনা আর গোপনে নেই। রাতের বেলা সংগঠিত বিক্ষোভ এবং প্রতীকী ভাঙচুর—যেমন কাসেম সোলেইমানির মূর্তি অপসারণ—শাসকগোষ্ঠীর প্রতীকী শক্তিকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
অন্যদিকে, সরকারের প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করা এবং কড়া দমননীতি প্রয়োগ আন্দোলন থামানোর বদলে ক্ষোভকে আরও তীব্র করছে।
ইতিহাস বলছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা সাময়িক নিয়ন্ত্রণ আনলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আস্থার সংকট বাড়ায়। আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি এবং ইউরোপের দিকে পাহলভির আহ্বান, এই আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিসরেও টেনে এনেছে। সব মিলিয়ে, ইরানের বর্তমান বিক্ষোভ একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন, যা সহজে দমন করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিক্ষোভ ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক গতিপথকে আমূল বদলে দিতে পারে।
আরও পড়ুন: ইরানে রিয়ালের রেকর্ড পতনে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক প্রধানের পদত্যাগ


