খবর অনলাইন ডেস্ক: ইরানে চলমান দেশব্যাপী বিক্ষোভে মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইট্স অ্যাক্টিভিটিস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ, HRANA) জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৯০ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে অন্তত ২ হাজার ৮৮৫ জন বিক্ষোভকারী। এ তথ্য সংবাদসংস্থা রয়টার্সের সূত্রে জানা গিয়েছে।
রয়টার্স জানায়, কঠোর দমন-পীড়নের ফলে আপাতত বিক্ষোভ অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নতুন করে গ্রেফতারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ দিকে, প্রায় আট দিন ধরে দেশ জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পর সংযোগে ‘খুব সামান্য উন্নতি’ দেখা গিয়েছে বলে জানিয়েছে ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘নেটব্লকস’।
বিরোধী গোষ্ঠী ও একজন ইরানি কর্মকর্তার হিসাব অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ২ হাজারেরও বেশি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটিই ইরানের সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সহিংসতা। গত ২৮ ডিসেম্বর অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা দ্রুতই ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলনের রূপ নেয়। গত সপ্তাহের শেষ দিকে সহিংসতা চরম আকার ধারণ করে।
শাসকের ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ
প্রথম দিকে অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামেন। পরে এই আন্দোলন সরাসরি শাসক ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়। তেহরান, মাশহাদ ও ইসফাহান-সহ বড়ো বড়ো শহরে ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও শহুরে বাসিন্দারা বিক্ষোভে যোগ দেন।
বিক্ষোভকারীরা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইকে লক্ষ্য করে স্লোগান দেন। তেহরান থেকে পাওয়া ছবিতে খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে গ্রাফিতি ও তার মৃত্যুর আহ্বান জানানো স্লোগান দেখা গিয়েছে।
বিক্ষোভ কিছুটা স্তিমিত
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েক জন বাসিন্দা জানিয়েছেন, গত চার দিন ধরে তেহরান তুলনামূলক ভাবে শান্ত। শহরের কিছু এলাকায় ড্রোন উড়তে দেখা গেলেও বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বড় ধরনের কোনো বিক্ষোভ হয়নি। ক্যাস্পিয়ান সাগরের কাছাকাছি একটি উত্তরের শহরের বাসিন্দাও একই রকম পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন।
তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও মারাত্মক ভাবে সীমিত। নেটব্লকস এক্স-এ (সাবেক টুইটার) জানায়, প্রায় ২০০ ঘণ্টার ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পর সংযোগে ‘খুব সামান্য উন্নতি’ হয়েছে। তবুও ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিকের মাত্র প্রায় ২ শতাংশে রয়েছে।
ট্রাম্পের খবর, ইরান মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছে
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের প্রতিক্রিয়ায় দাবি করেন, ইরানের নেতৃত্ব পরিকল্পিত ফাঁসি কার্যকর স্থগিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, “যে সব ফাঁসি গতকাল হওয়ার কথা ছিল (৮০০টিরও বেশি), ইরানের নেতৃত্ব তা বাতিল করেছে, এই খবর পেয়েছি। এই খবরকে আমি গভীর ভাবে সম্মান করি।” তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথা ঘোষণা বা বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
এর আগে বিবিসির সূত্রে জানা যায়, ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, “হত্যার মাত্রা উল্লেখযোগ্য বলে মনে হচ্ছে, তবে আমরা এখনও নিশ্চিত নই।” তিনি আরও বলেন, সংখ্যা নিশ্চিত হলে “আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।”
এ দিকে, ইরানে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকরাও সংকটে পড়েছেন। ইরান থেকে ফিরে আসা ভারতীয় শিক্ষার্থী ও তীর্থযাত্রীরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা বেশির ভাগ সময় নিজ নিজ আবাসনে আটকে ছিলেন এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।


