Home খবর বিদেশ শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের ঢাকার অনুরোধ কি ফিরিয়ে দিতে পারে ভারত? কী বলছে...

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের ঢাকার অনুরোধ কি ফিরিয়ে দিতে পারে ভারত? কী বলছে প্রত্যর্পণ চুক্তি

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মানবতা বিরোধী অপরাধে’ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাঁকে অবিলম্বে ভারতে প্রত্যর্পণের আহ্বান জানাল ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছর ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই হাসিনা দিল্লিতে নির্বাসনে আছেন। আদালত তাঁকে এবং প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে পলাতক ঘোষণাও করেছে।

হাসিনার বিরুদ্ধে পাঁচটি মানবতা-বিরোধী অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং গত বছরের ৫ আগস্ট রাজধানী ঢাকার চাঁখারপুলে ছ’জন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। প্রধান সরকারি কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম বলেন, আন্দোলন চলাকালীন সকল অপরাধের কেন্দ্রে ছিলেন হাসিনা নিজেই। তবে রায়কে “পক্ষপাতদুষ্ট” এবং “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করেছেন হাসিনা। তাঁর বক্তব্য, তিনি ও কামাল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ঘটনাকে ‘পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ’ হিসেবে দেখানো ভুল ব্যাখ্যা।

হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ রায়কে প্রতিবাদ জানিয়ে মঙ্গলবার দেশব্যাপী হরতালের ডাক দিয়েছে। রায় ঘোষণার পর তিনি আপিল করতে পারবেন না, যদি না ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ করেন বা গ্রেফতার হন।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রক ভারতকে আহ্বান জানিয়ে বলেছে, দু’দেশের মধ্যে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী হাসিনা ও কামালকে ফেরত পাঠানো “ভারতের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব”। মন্ত্রক আরও বলেছে, মানবতা-বিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া ‘অবন্ধুত্বপূর্ণ’ আচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ভারত আপাতত প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে সরাসরি কিছু বলেনি। বিদেশ মন্ত্রক শুধু জানিয়েছে, ঢাকা আদালতের রায় তারা নোট করেছে এবং প্রতিবেশী দেশের শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার স্বার্থেই সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক যোগযোগ বজায় রাখবে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় আইন এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির নানা ধারা দিল্লিকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক বিবেচনাসূত্র দেয়, বিশেষত যখন কোনও অনুরোধ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত ভারত–বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী দু’দেশের মধ্যে অপরাধী বিনিময়ে ‘ডুয়াল ক্রিমিন্যালিটি’ বা উভয় দেশে অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার শর্ত বাধ্যতামূলক। যদিও হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এই শর্ত পূরণ করে, তবুও চুক্তির বিভিন্ন ধারায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা, অস্বচ্ছ তদন্ত বা পক্ষপাতমূলক অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ৮ বলছে, আবেদন ‘অন্যায় বা দমনমূলক’ হলে প্রত্যর্পণ নাকচ হতে পারে। অনুচ্ছেদ ৬-এ ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির অপরাধে’ প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ থাকলেও হত্যাকাণ্ড, সন্ত্রাস, অপহরণ—এ জাতীয় গুরুতর অপরাধ সেই ব্যতিক্রমের বাইরে।

এ ছাড়া অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী, ভারত চাইলে অভিযুক্তকে নিজ দেশে বিচার করতে পারে—এ ক্ষেত্রেও প্রত্যর্পণ বাতিল হতে পারে। একইভাবে ভারতের Extradition Act, 1962–এর ২৯ নম্বর ধারা বলছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তুচ্ছ, বা অন্যায্য মনে হলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করতে পারে কেন্দ্র। প্রয়োজনে প্রক্রিয়া স্থগিত বা অভিযুক্তকে মুক্তিও দিতে পারে সরকার।

ঢাকার অনুরোধের পরও বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আইনি কাঠামো এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বিচার করলে ভারতের শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করা অত্যন্ত অসম্ভব। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশের সম্পর্ক আগামী দিনে আরও জটিলতা ও কূটনৈতিক চাপের সম্মুখীন হতে পারে।

আরও পড়ুন: হাসিনার ফাঁসির রায় ঘোষণার পরই প্রত্যর্পণের দাবি ঢাকার; কী বলল ভারত

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Exit mobile version