Home খবর বিদেশ বিশ্বের সর্বাধিক তেল মজুত ভেনেজুয়েলায়, তবু কেন উৎপাদনে পিছিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি?

বিশ্বের সর্বাধিক তেল মজুত ভেনেজুয়েলায়, তবু কেন উৎপাদনে পিছিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি?

বিশ্বে প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। এই বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ গত কয়েক দশক ধরে দেশটির অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্ব নির্ধারণ করে এলেও বাস্তবে তেল উৎপাদন এখনও সম্ভাবনার তুলনায় অনেকটাই কম। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা এবং OPEC-এর তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল— যা বিশ্ব মোট তেল মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই হিসেবে সৌদি আরব, ইরান, কানাডা ও ইরাককেও পিছনে ফেলেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি।

অরিনোকো বেল্টেই তেলের আসল ভাণ্ডার

ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ তেল রয়েছে দেশের পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অরিনোকো অয়েল বেল্ট অঞ্চলে। এই এলাকায় মূলত ভারী ও অতিভারী অপরিশোধিত তেল পাওয়া যায়, যা মধ্যপ্রাচ্যের হালকা তেলের তুলনায় ভিন্ন প্রকৃতির। এই ধরনের তেল ব্যবহারের আগে আপগ্রেডিং, মিশ্রণ অথবা বিশেষ পরিশোধন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। ফলে উৎপাদন খরচ এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা অনেক বেশি।

তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, অরিনোকো বেল্ট বিশ্বের বৃহত্তম হাইড্রোকার্বন ভাণ্ডারগুলির অন্যতম। এই অঞ্চলই কাগজে-কলমে ভেনেজুয়েলাকে বিশ্বের সবচেয়ে তেলসমৃদ্ধ দেশে পরিণত করেছে।

অর্থনীতির মেরুদণ্ড তেল

দীর্ঘ সময় ধরেই তেল ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিংশ শতাব্দীর বড় অংশ জুড়ে পেট্রোলিয়াম রফতানি থেকেই সরকারের অধিকাংশ রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় হত। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা PDVSA একসময় বিশ্বের অন্যতম দক্ষ জাতীয় তেল সংস্থা হিসেবে পরিচিত ছিল। সর্বোচ্চ সময়ে সংস্থাটি দিনে ৩০ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি তেল উৎপাদন করত।

কিন্তু সেই ছবি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের ঘাটতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, পরিকাঠামোর অবক্ষয়, দক্ষ কর্মীদের দেশত্যাগ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার জেরে উৎপাদন ভয়াবহ ভাবে কমে গেছে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন দৈনিক ১০ লক্ষ ব্যারেলেরও নিচে বলে অনুমান, যা অতীতের তুলনায় নগণ্য।

মজুত থাকলেও উৎপাদন কম কেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেলের ‘বৈপরীত্য’ লুকিয়ে রয়েছে মজুত আর বাস্তব উৎপাদনের ব্যবধানেই। ভারী তেল উত্তোলন ও পরিশোধনে খরচ বেশি, ফলে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও স্থিতিশীল বাজার না থাকলে তা লাভজনক নয়। তার উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বিদেশি অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং রফতানির পথ সীমিত করে দিয়েছে। এর ফলেই PDVSA বড় পরিসরে উৎপাদন বাড়াতে পারছে না।

এই কারণে অনেক দেশ, যাদের তেল মজুত তুলনায় কম, কিন্তু পরিকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত— তারা ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক বেশি তেল উৎপাদন ও রফতানি করতে পারছে।

ভূ-রাজনীতিতে এখনও গুরুত্বপূর্ণ

তবুও ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে। OPEC-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ভেনেজুয়েলার প্রতীকী গুরুত্ব এখনও রয়েছে, যদিও উৎপাদন সেই মর্যাদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট, তেলের দামের হঠাৎ বৃদ্ধি বা নিষেধাজ্ঞা নীতিতে পরিবর্তনের সময় ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়— যা তার অপ্রয়োজিত মজুতের কৌশলগত মূল্যকে সামনে আনে।

সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল ভাণ্ডার একদিকে যেমন সীমাহীন সম্ভাবনার প্রতীক, তেমনই অন্যদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিফলন। যত দিন না বিনিয়োগ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একসঙ্গে আসে, তত দিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার উৎপাদন ও অর্থনৈতিক লাভ সীমিতই থেকে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সস্ত্রীক বন্দি করে দেশছাড়া করার দাবি ট্রাম্পের, চলছে সামরিক অভিযান

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Exit mobile version