অজন্তা চৌধুরী
কেষ্টপুরের সুকান্ত পার্কে ‘নহলী’র নিজস্ব অন্তরঙ্গ প্রাঙ্গণ ‘বেলাভূমি’তে হয়ে গেল ‘নহলী’র একাদশ অন্তরঙ্গ নাট্যোৎসবের দ্বিতীয় পর্যায়। উৎসব চলেছিল ২৩ থেকে ২৫ ডিসেম্বর। তিনদিন ব্যাপী ওই উৎসবে আমন্ত্রিত পাঁচটি নাটকের দল সর্বমোট ছয়টি নাটক পরিবেশন করে। উদ্বোধনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নৃত্য, নাটক, সঙ্গীত ও দৃশ্যকলা আকাদেমির সচিব হৈমন্তী চট্টোপাধ্যায়।
প্রথম দিন ‘মেঘমুলুকে’ নাট্যগোষ্ঠী পর পর দু’টি ছোটো নাটক পরিবেশন করে। প্রথমটি ‘সাধু কালাচাঁদ’। এই নাটকে দেখানো হয়েছে, সময়ের জাঁতাকলের ইঁদুরদৌড়ের বাইরে গুটিকয় মানুষ আমাদের আশেপাশে থেকে যায় যাঁদের শিক্ষা বিদ্যালয় বা পাঠ্যবইয়ের পাতায় নয়, তাঁদের শিক্ষা আকাশ, বাতাস, মাঠ, ঘাট, প্রকৃতির বাস্তবতা থেকে ও জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে।
‘মেঘমুলুকে’র দ্বিতীয় প্রযোজনা ছিল একটি ‘মূক’ নাটক ‘টুকরো গল্প’। এই নাটকে দেখানো হয়েছে, মোবাইল নামক যন্ত্রটি মানুষকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। ফলস্বরূপ, মানুষ হারিয়ে ফেলছে তার আন্তরিকতা এবং ভুলে যাচ্ছে তার সামাজিক কর্তব্য। মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে নানা উত্তেজনা। মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হতে শুরু করছে প্রতি নিয়ত। বিন্যাস ও বিনির্মাণে ছিলেন সুবীর মিস্ত্রী।
প্রথম দিনের তৃতীয় নাটক ছিল ‘বালিগঞ্জ অন্তর্মুখ’-এর ‘ব্রহ্মশির’। রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন সৌমিত্র বসু। এখানে মহাভারতের প্রসঙ্গ টেনে দেখানো হয়, অর্জুন ও অশ্বত্থামা পরস্পরের উদ্দেশে ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ করার ফলে উত্তরার গর্ভের সন্তান নিহত হয় এবং কৃষ্ণ তাকে বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু আপনার আমার ঘরে যে সন্তান বেড়ে উঠছে, তাদের প্রতিনিয়ত আঘাত করছে এমনই হাজার হাজার ব্রহ্মশির অস্ত্র, তাই ছোটো বয়সে তাদের চোখে উঠেছে চশমা, বইয়ের ভরে তাদের শিরদাঁড়া যাচ্ছে বেঁকে। উত্তরার গর্ভের সন্তানকে বাঁচিয়ে দেয় কৃষ্ণ। কিন্তু আমার আপনার সন্তানকে বাঁচাবে কে? প্রশ্ন তোলে এই নাটক।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন ২৪ ডিসেম্বর, প্রথমে মঞ্চস্থ হয় কালিদাসের জীবনী নিয়ে ‘বারেন্দ্রপাড়া কথকতা’র নাটক ‘কালিদাস’। রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন বিশ্বনাথ বসু। এর পর পূর্ব কলকাতা ‘বিদূষক নাট্যমণ্ডলী’ মঞ্চস্থ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে নাটক ‘শাস্তি’। নির্দেশনায় ছিলেন শুভজিৎ মাইতি। এই নাটক ভারতীয় সমাজে অবিচার, পিতৃতন্ত্র এবং নারীদের নীরব দুর্ভোগকে তুলে ধরে।
২৫ ডিসেম্বর, উৎসবের শেষ দিন প্রথমেই ‘সুর-বাণী মিউজিক একাডেমি’ লোকসংগীত পরিবেশন করে। পরিচালনায় ছিলেন সীমা কর। পরিচিত লোকগানের সুর এই নাট্যোৎসবের আসরকে আরও বৈচিত্রময় করে তোলে। উৎসবের শেষ প্রযোজনা মঞ্চস্থ করে ‘শ্যামবাজার অন্যদেশ দৃষ্টিহীন নাট্যসংস্থা’। যা ছিল এই উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ। নাটকটি নির্দেশনায় ছিলেন শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়। একদল দৃষ্টিহীন অভিনেতা-অভিনেত্রী কী অসম্ভব প্রতিভা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চণ্ডালিকা’ অবলম্বনে মঞ্চস্থ করে নাটক ‘যখন অন্ধ প্রকৃতি চণ্ডালিকা’, যা বিস্মিত করে উপস্থিত সবাইকে।
উৎসবের এই তিন দিন কেষ্টপুর এবং আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে অসংখ্য নাট্যপ্রেমী মানুষ এসেছিলেন এই উৎসবে শামিল হতে। প্রতি বছর ঠিক এই সময়েই ‘নহলী’ এই অন্তরঙ্গ নাট্যোৎসবের আয়োজন করে। প্রতি বছরের মতোই এই বছরও চা, আড্ডা আর নাটক নিয়ে জমে উঠেছিল ‘নহলী’র একাদশ অন্তরঙ্গ নাট্যোৎসব। প্রতি বছরের মতোই শেষ দিন অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর, বড়দিনে ‘নহলী’ এই উৎসব উদযাপন করে দর্শকদের কেক ও মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করে।
