Home প্রবন্ধ শতবর্ষে সিপিআই: নতুন শতকে লড়াইটা আদর্শের না অস্তিত্বের?

শতবর্ষে সিপিআই: নতুন শতকে লড়াইটা আদর্শের না অস্তিত্বের?

চিরঞ্জীব পাল

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি শতবর্ষে। ১৯২৫ থেকে ২০২৫—এই দীর্ঘ পথচলা শুধুই কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের বয়স নয়; এক আদর্শের বিবর্তন, এক আন্দোলনের সামাজিক শিকড়, এবং স্বাধীনতার আগুন থেকে আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোর ভিতরকার টানাপোড়েনের বিবরণ। প্রশ্ন যতটা ইতিহাসের, তার চেয়ে বেশি – এই শতবর্ষ বাম রাজনীতিকে ভারতীয় সমাজে কোথায় রেখে গেল?

উপনিবেশ থেকে আদর্শের জন্ম

রুশ বিপ্লবের অভিঘাত যখন সারা বিশ্বের বৌদ্ধিক মহলে আলোড়ন তুলছে, তখন ভারতের তরুণ বিপ্লবীরাও খুঁজছিলেন নতুন দিশা। এম এন রায়, অবনী মুখার্জি, সুভাষ মুখার্জি–সহ নির্বাসিত বুদ্ধিজীবীরা প্রথম যে চিন্তার ভ্রূণ রোপণ করেন, তারই পরিণতি ১৯২৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (CPI) গঠনের মধ্যে। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, শ্রমজীবী আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ এবং নতুন সামাজিক ন্যায়বোধের প্রশ্ন—এগুলোই শুরুতে দলকে আলাদা ভাষা দিয়েছিল।

কিন্তু শুরু থেকেই পথ ছিল বিরোধে ও রক্তাক্ততায় ভরা। ব্রিটিশ সরকার দলটিকে রাষ্ট্রবিরোধী বলে চিহ্নিত করে। গ্রেফতার, দেশান্তর এবং দমন-পীড়নের ধারায় কমিউনিস্ট সংগঠন গোপন পরিমণ্ডলে টিকে থাকার চেষ্টা চালায়।

সূত্রপাতের তিনটি ধারা

ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্ম আসলে একই উৎস থেকে নয় – তিনটি সমান্তরাল স্রোত মিলিত হয়েছিল এক সময়ে।

প্রথম স্রোত – আন্তর্জাতিক বিপ্লবী পরিমণ্ডল

মার্ক্সবাদী বিপ্লবী এম এন রায়, যিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, বার্লিন ও পরে সোভিয়েত রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজেছিলেন, ভারতীয় স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা, অর্থ, ও অস্ত্র জোগাড়ে সক্রিয় ছিলেন। ১৯২০ সালে তিনি সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন কমিন্টার্ন–এর সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধি হন। সেই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় — ঔপনিবেশিক দেশের কমিউনিস্টদের প্রথম লক্ষ্য হবে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম; অস্থায়ীভাবে সব বিরোধী শক্তিকে একজোট করতে হবে। তাসখন্দে এশীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্তও সেখানেই হয়। এই প্রেক্ষাপটে এম এন রায়, অবদুল রাব, এম পি টি আচার্য প্রমুখ মিলে ১৯২০ সালে তাসখন্দে একটি কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের ঘোষণা করেন এবং তা কমিন্টার্নের অনুমোদনও পায়।

সেই সময়ে একই সঙ্গে বার্লিনে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও কাবুলে রাজা মহেন্দ্র প্রতাপের নেতৃত্বে আরেকটি বিপ্লবী উদ্যোগ গড়ে উঠছিল। তবে এই তিন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র একে অন্যের সঙ্গে সুসংহতভাবে যুক্ত ছিল না।

দ্বিতীয় স্রোত – ভারতের অভ্যন্তরের স্বাধীন বামচিন্তা

একই সময়ে দেশের ভেতর কোনো আন্তর্জাতিক নির্দেশ ছাড়াই লাহোরে গুলাম হুসেন, বোম্বাইয়ে এস.এ ডাঙ্গে, কলকাতায় মুজফ্ফর আহমদ, মাদ্রাজে সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার – এঁরা স্বতন্ত্র মার্ক্সবাদী বৃত্ত তৈরি করতে শুরু করেছিলেন। তাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন একটি জাতীয় সমন্বয়ের, যাতে সংগঠিত রাজনৈতিক কাজ গড়ে ওঠে।

সিপিআই-এর শতবর্ষ উপলক্ষে মিছিল। ছবি সংগৃহিত

তৃতীয় স্রোত – শ্রমিক ও কৃষক সংগঠন

১৯২০ সালেই লালা লাজপাত রায়ের নেতৃত্বে এআইটিইউসি (AITUC) গঠিত হয়। সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন ভারতীয় বাম রাজনীতির জমি প্রস্তুত করে দেয় –যেখানে কমিউনিস্ট পার্টির মতো একটি রাজনৈতিক দল জন্মগ্রহণ করতে পারে। এই তিন ধারাই, ধীরে ধীরে, ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার পর: গণতন্ত্রকে গ্রহণ, কিন্তু দ্বিধা কোথায়

স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ছিল দ্বিধায় ভরা – রাষ্ট্র কি শত্রু, নাকি রাষ্ট্রই সংগ্রামের ক্ষেত্র? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই দল সংসদীয় গণতন্ত্রে যোগ দেয়। ১৯৫৭ সালে কেরলে ই এম এস নাম্বুদিরিপাদের নেতৃত্বে বিশ্বের অন্যতম প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয়। এর ফলে ভারতীয় বাম রাজনীতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।

কিন্তু ১৯৬২ সালের চিন-ভারত যুদ্ধ নতুন আঘাত হানে। দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান, মতাদর্শিক সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাম রাজনীতির বিভাজন – সব মিলিয়ে ১৯৬৪-তে সিপিআই (CPI) ভেঙে জন্ম নেয় সিপিআইএম (CPIM)। এই বিভাজন আজও ভারতীয় বামপন্থার আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।

এই সময়েই নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষিতে র‍্যাডিক্যাল বামপন্থার উত্থান ও সিপিআইএমএল (CPIML) ধারা দৃশ্যমান হতে শুরু করে।

উত্থান: যখন বাম ছিল রাজনীতির দিকদর্শক

১৯৭৭ থেকে ২০১১—পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের টানা ৩৪ বছরের শাসন বিশ্বের নজরে এক অনন্য নজির। ভূমি সংস্কার, অপারেশন বর্গা, পঞ্চায়েত বিকেন্দ্রীকরণ – এই পদক্ষেপগুলি ভারতীয় রাষ্ট্রনীতিতে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। একই সময় কেরলে বাম সরকার মানবোন্নয়ন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে নিজের ‘মডেল’ দাঁড় করায়। ত্রিপুরায় জনজাতি প্রশ্নে বামপন্থার লড়াই বাড়ে।

এই সময়টায় বাম রাজনীতি শুধু ভোট নয় – এ ছিল ধারণা, আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস ও এক বিকল্প পথ প্রস্তাবের সময়।

যে প্রশ্নগুলো উত্তরহীন রয়ে গেল

লিবারালাইজেশন, গ্লোবালাইজেশন, প্রযুক্তি-নির্ভর উন্নয়ন মডেল, ধর্মীয় মেরুকরণ, পরিচয়-রাজনীতি – এই নতুন বাস্তবতায় বাম রাজনীতি তাল রাখতে পারেনি। নতুন প্রজন্মের প্রশ্ন ছিল – “আপনারা শুধু নিষেধে বিশ্বাস করেন, নাকি বিকল্প উন্নয়ন মডেল দেখাতে পারবেন?”

এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মিলেনি। বাম দলগুলোর ভিতরে প্রজন্মান্তরের নেতৃত্ব গঠন, সংগঠন আধুনিকীকরণ, আন্দোলনের ভাষা বদলানো –এই জায়গাগুলোয় পিছিয়ে পড়াই রাজনৈতিক মাটির ক্ষয় ডেকে আনে।

নতুন শতকে নতুন প্রশ্ন

শতবর্ষে দাঁড়িয়ে কমিউনিস্ট পার্টির এখন প্রধান লড়াই অস্তিত্বের নয়, প্রাসঙ্গিকতার।
পুঁজিকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেলের বিপরীতে বিকল্প আছে কি?
ধর্মীয় মেরুকরণে বিভক্ত সমাজে শ্রেণিনির্ভর রাজনীতি কীভাবে দাঁড়াবে?

ডিজিটাল যুগে নতুন শ্রমনীতি, গিগ ইকোনমি, বেকারত্ব – এই প্রশ্নে বাম কি নতুন ব্যাখ্যা দিতে পারবে?
যদি না পারে, তা হলে ইতিহাস স্মৃতি হয়ে থাকবে, আদর্শ নয়। যদি পারে, তবে হয়তো পরবর্তী সময়ে লড়াইয়ের ভাষা আবার নতুনভাবে ফিরে আসবে।

শেষ কথা

ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির ১০০ বছর এক দ্বৈত উত্তরাধিকার – এক দিকে সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা; অন্য দিকে বিভাজন, ভুলপথ, আত্মসমালোচনার অভাব।

তবুও স্বীকার করতে হবে, এই শতাব্দী জুড়ে বামপন্থা ভারতের রাজনৈতিক মেরুদণ্ডে একটি প্রশ্ন রেখে গেছে: “রাষ্ট্র কাদের জন্য? উন্নয়ন কাদের নামে? স্বাধীনতা কার হাতে?” উত্তর হয়তো স্পষ্ট নয়। কিন্তু এই প্রশ্নগুলোই বাম রাজনীতিকে আবারও জীবিত রাখে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Exit mobile version