ভারতীয় গণমাধ্যম জগতে এক বড়সড় কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। গত তিন বছরে দেশের প্রায় ৫০টি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের সম্প্রচার লাইসেন্স সমর্পণ করেছে। Ministry of Information and Broadcasting (তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই তালিকায় রয়েছে দেশের প্রথম সারির একাধিক সম্প্রচার গোষ্ঠী— জিওস্টার, জি এন্টারটেইনমেন্ট এন্টারপ্রাইজেস, ঈনাডু টেলিভিশন, টিভি টুডে নেটওয়ার্ক, এনডিটিভি এবং এবিপি নেটওয়ার্ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দর্শকের ক্রমাগত ডিজিটাল ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মমুখী হয়ে ওঠা, বিজ্ঞাপন আয়ের পতন, অপারেশনাল খরচ বৃদ্ধি এবং জটিল নিয়ন্ত্রক কাঠামোর চাপেই ঐতিহ্যবাহী টেলিভিশন ব্যবসা গভীর সংকটে পড়েছে।
সংবাদমাধ্যম The Economic Times–এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জিওস্টার তাদের একাধিক চ্যানেলের লাইসেন্স ফেরত দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কালার্স ওডিয়া, এমটিভি বিটস, ভিএইচ১ এবং কমেডি সেন্ট্রাল। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, এগুলি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের ফল।
অন্যদিকে জি এন্টারটেইনমেন্ট এন্টারপ্রাইজেস বন্ধ করে দিয়েছে জি সি চ্যানেলটি, যা কেবল আপলিঙ্ক লাইসেন্সের আওতায় ছিল। চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ হওয়ার পরই লাইসেন্স সমর্পণ করা হয়।
জনপ্রিয় হিন্দি জেনারেল এন্টারটেইনমেন্ট চ্যানেল ডাঙ্গাল-এর সম্প্রচারকারী এন্টার১০ মিডিয়াও কৌশলগত পুনর্মূল্যায়নের পর একাধিক লাইসেন্স ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংস্থাটি ডাঙ্গাল এইচডি এবং ডাঙ্গাল ওড়িয়া চ্যানেলের লাইসেন্স ফেরত দিয়েছে। এর ফলে সংস্থার উচ্চমান (HD) এবং আঞ্চলিক সম্প্রসারণ পরিকল্পনা কার্যত স্থগিত হয়ে যায়। এন্টার১০ মিডিয়ার দাবি, ব্যবসায়িক লক্ষ্য ও সংস্থান সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণেই এই সিদ্ধান্ত।
খবরের চ্যানেলগুলির ক্ষেত্রেও একই চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবিপি নেটওয়ার্ক উচ্চ অপারেশনাল খরচ ও দুর্বল আয়কে কারণ দেখিয়ে এবিপি নিউজ এইচডি চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়। একইভাবে এনডিটিভি তাদের প্রস্তাবিত গুজরাতি সংবাদ চ্যানেল এনডিটিভি গুজরাতি-র লাইসেন্স সমর্পণ করেছে।
মিডিয়া বিশেষজ্ঞ ও শিল্পমহলের মতে, এই প্রবণতা কোনও সাময়িক মন্দার প্রতিফলন নয়, বরং মিডিয়া ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণে তৈরি হওয়া এক দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দর্শকের দেখার অভ্যাস দ্রুত বদলাচ্ছে, কনটেন্ট গ্রহণের ধরন পাল্টাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রচলিত টেলিভিশন মডেল।
শিল্পমহলের একাংশের অভিযোগ, টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে নিয়ন্ত্রক ভারসাম্যহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সম্প্রচার সংস্থা, কেবল অপারেটর ও ডিটিএইচ পরিষেবা প্রদানকারীদের দাবি, টেলিভিশন মাধ্যমকে লাইসেন্স, কনটেন্ট নীতি ও মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত একাধিক স্তরের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করতে হয়। অথচ ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলি তুলনামূলক ভাবে অনেক কম নিয়ন্ত্রণের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
তবে এত লাইসেন্স সমর্পণের পরেও ভারতের টেলিভিশন ইকোসিস্টেম এখনও বড় আকারেই রয়ে গেছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৯১৬টি টিভি চ্যানেল ডাউনলিঙ্কিংয়ের অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ৫৭২টি ফ্রি-টু-এয়ার চ্যানেল, ৩৩৪টি পে চ্যানেল এবং ১০টি বিদেশমুখী (ওভারসিজ-এক্সক্লুসিভ) লাইসেন্স রয়েছে।
আর্থিক চাপের ছবিটাও স্পষ্ট। রেটিং সংস্থা Crisil জানিয়েছে, ভারতের পে-ডিটিএইচ গ্রাহক সংখ্যা ২০১৯ অর্থবর্ষে যেখানে ছিল প্রায় ৭ কোটি ২০ লক্ষ, ২০২৪ অর্থবর্ষে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ২০ লক্ষে। চলতি অর্থবর্ষে এই সংখ্যা ৫ কোটি ১০ লক্ষেরও নিচে নেমে যেতে পারে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন সংস্থা WPP-র অনুমান, ২০২৫ সালে টেলিভিশন বিজ্ঞাপন আয় ১.৫ শতাংশ কমে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৭ হাজার ৭৪০ কোটি টাকায়। যদিও সামগ্রিক ভাবে ভারতের বিজ্ঞাপন বাজার ২০২৬ সালের মধ্যে ২ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছনোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভারতীয় টেলিভিশন শিল্প এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যমের উত্থান, আর্থিক চাপ এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে আগামী দিনে দেশের সম্প্রচার মানচিত্র যে আরও বদলাবে, সে বিষয়ে একমত বিশেষজ্ঞ মহল।
