Homeপ্রবন্ধস্মরণ করি ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়ে যাওয়া শহিদ প্রদ্যোত ভট্টাচার্যকে

স্মরণ করি ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়ে যাওয়া শহিদ প্রদ্যোত ভট্টাচার্যকে

প্রকাশিত

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

জন্ম তাঁর ১৩ নভেম্বর (মতান্তরে ৩ নভেম্বর), ১৯১৩। বয়স তখন তাঁর ১৮ পেরিয়ে ১৯-এ ছুটছে। সদ্য সাবালক হওয়া ছেলেটা সেই সময়ে একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল।

১৯৩২ সাল। ৩০ এপ্রিল। মেদিনীপুর জেলা বোর্ডের মিটিং-এ এসেছেন প্রচণ্ড দাম্ভিক আর অত্যাচারী ডিস্ট্রিক্ট ম্যজিস্ট্রেট রবার্ট ডগলাস। চারিদিকে এমন কড়াক্কড়ি যে মাছি গলবার উপায় নেই। থিকথিক করছে সশস্ত্র প্রহরীর দল। ডগলাস তাঁর নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলেন। কোমর থেকে নিজের গুলিভরা রিভলবারটা বার করে রাখলেন সামনের টেবিলে। মিটিং শুরু হল। হঠাৎ আক্রমণ। কোথা থেকে ধুমকেতুর মতো উদয় হল দুটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, আর সঙ্গে সঙ্গেই একটানা গুলিবর্ষণ। ডগলাস ঝাঁঝরা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। নিজের রিভলবার ব্যবহার করার সুযোগই পাননি অত্যাচারী জেলাশাসক ডগলাস। উপস্থিত সকলেই বিমূঢ়, বিহ্বল, বিস্মিত। তার পরই ব্রিটিশ পুলিশের চিৎকার – “ধর ধর, ওই যে, ওই যে পালাচ্ছে ওরা, ধর ধর…।”

দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার মহান ব্রতে মহাব্রতী প্রদ্যোত কুমার ভট্টাচার্য এবং প্রভাংশুশেখর পাল, সে দিনের এই দুই বিপ্লবী ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের অগ্নিমন্ত্রে স্বদীক্ষিত।

তখনও এই দু’জন সবে ১৮ বছর বয়স পেরিয়েছেন। কিন্তু আগ্নেয়গিরির মতো কী তেজ, বজ্রকঠিন বলিষ্ঠতা, কিন্তু বহিরঙ্গে এক শান্ত ধীরস্থির ভাব, মুখে শুধু বিপ্লবের স্তোত্রবাণী – ‘বন্দেমাতরম’, ‘বন্দেমাতরম’।

কয়েকজন পুলিশ সেই দু’জনের পেছনে রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে। কিন্তু তাঁরা আরও বেগে পেরিয়ে যাচ্ছেন একের পর এক রাস্তা। একবার থমকে দাঁড়িয়ে প্রভাংশু রিভলবার থেকে ফায়ারিং করলেন, যারা ছুটছিল তাদের অনেকেই পালিয়ে গেল। কিন্তু কেউ কেউ তাঁদের পেছনে লেগে রইল।

এবার প্রদ্যোত ফায়ারিং করতে গেলেন, কিন্তু তাঁর রিভলবারের ট্রিগার জ্যাম হয়ে গিয়েছে। তাই তিনি ঊর্ধ্বশ্বাসে এ-গলি, সে-গলি ছুটতে লাগলেন। একটা সময়ে প্রদ্যোতের ধুতি আটকে গেল রাস্তার ধারের জংলা গাছের কাঁটায়। তিনি পড়লেন মুখ থুবড়ে রাস্তার নর্দমায়, আর পালাতে পারলেন না, ঘিরে ধরল পুলিশ – ধরা পড়ে গেলেন প্রদ্যোত। শুরু হল তাঁর ওপর অকথ্য অত্যাচার।

প্রদ্যোতের পকেটে পাওয়া গেল দুটি চিরকুট। তার একটিতে লেখা – “হিজলি হত্যার প্রতিবাদ – ইহাদের মরণেতে ব্রিটেন জাগুক। আমাদের আত্মাহুতিতে ভারতবর্ষ জাগুক – বন্দেমাতরম।” অপর চিরকুটে ইংরাজিতে লেখা – “A fitting reply to premeditated and prearranged barbarous and cowardly attempt on the patriotic sons of Bengal – Bengal Revolutionary…”।

যথারীতি এর পর শুরু হয়েছিল বিচারের নামে প্রহসন। কারণ প্রদ্যোতের রিভলবার থেকে সে দিন গুলি বেরোয়নি, প্রভাংশুর গুলিতে ডগলাস মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রদ্যোতের উপর অকথ্য অন্যায় অত্যাচার চালানো হয়েছিল, তাঁর সহ-বিপ্লবীর নাম-ধাম জানার জন্য, আর যাঁরা এই কাজের মূল হোতা তাঁদের হদিস পাওয়ার জন্য। অত্যাচার ছিল কী রকম তা এবার জানা যাক – এলোপাথাড়ি লাঠি দিয়ে মারা, হাত-পায়ে আঙুলের নখে পিন ফোটানো, চেন দিয়ে পিঠে চাবুকের মতো করে মারা, বরফের চাঁইয়ের ওপরে খালি গায়ে হাত-পা বেঁধে শুইয়ে রাখা, প্রচণ্ড তেষ্টায় খাবার জল চাইলে মুখে প্রস্রাব করে দেওয়া, মাথা নীচের দিকে আর পা-দুটো বেঁধে ওপর থেকে ঝুলিয়ে লাঠি দিয়ে মারা ইত্যাদি ইত্যাদি। এহেন সমস্ত রকমের অত্যাচার চালাতে চালাতে ব্রিটিশ পুলিশের একটাই প্রশ্ন ছিল – “কে বা কারা এই কাজের পেছনে রয়েছে? প্রদ্যোতের আর-এক সঙ্গীর নাম কী? কোথায় থাকে সে?”, ইত্যাদি ইত্যাদি। মুখ বুজে থাকতেন প্রদ্যোত, তখন আবার শুরু হত মার, মার আর মার।

হে আমার ৭৫ বছর অতিক্রান্ত স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বস্তিতে থাকা, শান্তিতে থাকা জনগণ, এই সব বীর বিদ্রোহী বিপ্লবীর আত্মাহুতিকে ভুলে থাকা এবং তাদের কাহিনি না-জানা জনগণ, তোমরা জেনে রাখো, এত অত্যাচার সহ্য করেও প্রদ্যোত কিন্তু বিপ্লবী সংগঠন সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি, বলেননি সঙ্গী প্রভাংশুর নাম। শুধু মুখ বুজে রক্তাক্ত মৃতপ্রায় হয়ে সহ্য করে গিয়েছেন ব্রিটিশ পুলিশের অকথ্য অত্যাচার।

সেই সব নৃশংস অত্যাচারের কথা অতি গোপন সূত্র মারফত জানতে পেরেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, দীনেশ গুপ্ত (রাইটার্সে অলিন্দ যুদ্ধের ত্রয়ী বিনয়-বাদল-দীনেশের দীনেশ গুপ্ত)। সে দিন এঁরা আড়ালে চোখের জল মুছেছিলেন।

দীনেশের মনে পড়ছিল কত কথা। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স-এর মেদিনীপুর জেলার সংগঠনের অন্যতম দায়িত্বে ছিলেন বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত। প্রথম পরিচয়ের পরে ধীরে ধীরে একটু একটু করে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পরে দীনেশ বলেছিলেন প্রদ্যোতকে – “জেনে রাখো, ধরা পড়লে ফাঁসি, দ্বীপান্তর, অকথ্য অত্যাচার, ভাগ্যে যা খুশি জুটতে পারে। সে সব হাসিমুখে সইতে হবে।” দীনেশ জানতে চেয়েছিলেন ‘মন্ত্রগুপ্তি’ রক্ষা করতে পারবে কি না। সে দিন ১৭ বছরের দামাল ছেলে বলেছিল, সে পারবে, অবশ্যই পারবে।   

pankaj pradyot 1 13.11 1

মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানার রাজনগরের গোকুলনগরে ১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর (মতান্তরে ৩ নভেম্বর) প্রদ্যোতের জন্ম। ডাকনাম ছিল ‘কচি’। ধীরস্থির স্বভাবের, মেধাবী, শান্ত-ভদ্র এক গ্রাম্যসন্তান। ছোটোবেলা থেকেই পাশের বাড়ির পিসিমার কাছে গিয়ে সেই সময়ের দেশের নানা কথা শুনতে ভালোবাসতেন। এই পিসিমার নাম ছিল অপরূপা দেবী। ইনিই ছিলেন শহিদ ক্ষুদিরাম বসুর জননীসমা দিদি। ক্ষুদিরামের কথা যত শুনতেন, তত প্রদ্যোতের বুকের মধ্যে এক অন্য অনুভুতি জন্ম নিত। সেই অনুভবের হোমানলে জ্বলে উঠেছিল স্বামী বিবেকানন্দের জাতীয়তাবোধের সেই অমোঘ বাণী – “হে বীর, সাহস অবলম্বন করো…,ভুলিও না তুমি জন্ম হতেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত…”।

১৯৩০ সালে মেদিনীপুর হিন্দু স্কুল থেকে ফার্স্ট ডিভিশনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন প্রদ্যোত। তার পর বিজ্ঞান নিয়ে মেদিনীপুর কলেজে স্নাতকশ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। এই সময়েই প্রদ্যোত বিপ্লবীদের গোপন সংগঠন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স-এর সংস্পর্শে আসেন এবং সেখানেই তিনি দীনেশ গুপ্তের সঙ্গে পরিচিত হন। প্রদ্যোত ভট্টাচার্যের পরিবারের কেউই সেই সময়ে স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। প্রদ্যোতের বাবা ভবতারণ ভট্টাচার্য  ছিলেন সরকারি রাজস্ব অফিসার। বড়োদাদা ছিলেন ডাক্তার, মেজোদাদা ছিলেন সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়েতে উচ্চপদে চাকরি করতেন।

১৭ বছরের প্রদ্যোতের তেজোদ্দীপ্ত বলিষ্ঠতা, প্রাণোচ্ছলতা এবং স্বামী বিবেকানন্দের বাণী, ‘বন্দেমাতরম’ আর রবীন্দ্রনাথের প্রতি প্রীতি মুগ্ধ করেছিল দীনেশকে। কাছে টেনে নিয়েছিলেন প্রদ্যোতকে, ডেকে নিয়েছিলেন দেশমাতৃকার পুত-পবিত্র মহান যজ্ঞে। তখন প্রদ্যোত ১৭ বছরের, আর দীনেশ গুপ্ত ২০ বছরের।

তার পর সে এক ঐতিহাসিক কাহিনির অবতারণা। বিচারে প্রদ্যোত কুমার ভট্টাচার্যের ফাঁসির হুকুম হল। আসলে দেখনদারিতে ব্রিটিশ শাসক বীরপুঙ্গব হলে কী হবে, ভেতরে ভেতরে তারা তখন ভয়ে সন্ত্রস্ত। তাই এ দেশের কেউ তখন ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে গেলেই, বিচারের নামে হয় তাঁর ফাঁসি হত, না হয় যাবজ্জীবন অথবা দ্বীপান্তর। এই ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

১৯৩৩ সালের ১২ জানুয়ারি। মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলের ঘড়িতে তখন ভোর পাঁচটা। দেওয়ালঘড়ির পেন্ডুলামের ঢং ঢং শব্দে হল কারাগারের ভোর। শীতকাল, দিনটা ছিল কনকনে ঠান্ডার। চারিদিকে ঘন কুয়াশা। আগের দিন সারা রাত মেদিনীপুর-সহ এই বাংলার ঘরে ঘরে বিনিদ্র রাত্রিযাপন করেছে সাধারণ দেশপ্রেমিক জনগণ। সকলের মনে প্রদ্যোত, ২০ বছরের তরতাজা এক তরুণের নাম, তাঁর লড়াইয়ের কাহিনি।

সে দিন অত শীতের ঠান্ডাতেও ভোর ৫টা বাজার অনেক আগেই প্রদ্যোতের স্নান সারা হয়ে গিয়েছিল। তার পর তিনি পাঠ করেছিলেন শ্রীমদ্ভাগবত গীতার কিছু অংশ, উচ্চারণ করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের সেই বাণী – “হে বীর, সাহস অবলম্বন করো, সদর্পে ডাকিয়া বলো…”। গেয়ে উঠেছেন রবীন্দ্রনাথের গান, কাজী নজরুলের গান, উদাত্ত কন্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণ করে শেষবারের মতো প্রণাম জানিয়েছেন জননী জন্মভূমিকে। সেই মুহূর্তে প্রদ্যোতের সেই উদার আহ্বানে সমস্বরে কন্ঠ মিলিয়েছিলেন মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলের অন্য বন্দিরা, বলে উঠেছিলেন ‘বন্দেমাতরম’।

বিপ্লবী ভুপাল পন্ডা তখন একই জেলে বন্দি। তিনি লিখেছেন, “হঠাৎ শোনা গেল প্রদ্যোতের সুমধুর কন্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান ‘তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে, তা ব’লে ভাবনা করা চলবে না’,  কখনও বা কাজী নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’। ঠিক ৬টা বাজতে তিন মিনিট বাকি। প্রদ্যোতকে নিয়ে যাওয়া হলো ফাঁসির মঞ্চে। কারাগারের সমস্ত বন্দি সমস্বরে গর্জন করে উঠেছিল সে দিন সেই ভোরে ‘বন্দেমাতরম’, ‘জননী জন্মভুমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী’, ‘প্রদ্যোত কুমার ভট্টাচার্য জয় হোক, তোমার জয় হোক’।”

প্রদ্যোত ফাঁসির মঞ্চের ওপরে দাঁড়ালেন। নিহত ডগলাসের পরবর্তী জেলাশাসক মিঃ বার্জ প্রদ্যোতকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “Are you ready?” শান্ত কন্ঠে প্রদ্যোত সে দিন বলেছিলেন, “One minute please Mr. Burge, I have something to say”।

বার্জ সে দিন প্রদ্যোতকে অনুমতি দিয়েছিলেন। তখন প্রদ্যোত হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “We are determined, Mr.Burge, not to allow any European to remain at Midnapore. Yours is the next turn. Get yourself ready.”। (সে দিন বার্জ চমকে উঠেছিলেন। নিশ্চিত মৃত্যু যাঁর সামনে, ফাঁসিতে প্রাণ যাওয়া এখন যাঁর মুহূর্তের ব্যাপার, সেই ২০ বছরের তরুণ তাঁকে আসন্ন মৃত্যুর পরোয়ানা দিয়ে যাচ্ছে। প্রদ্যোতের সেই ভবিষ্যৎবাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়েছিল। মাসসাতেক বাদেই বার্জকে হত্যা করেছিলেন মেদিনীপুর জেলারই দুই বীর বিপ্লবী অনাথবন্ধু পাঁজা আর মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত। সে ইতিহাস জানা যাবে অন্য একদিন।)

সে দিন একটু থেমে প্রদ্যোত বলেছিলেন, “I am not afraid of death. Each drop of my blood will give birth to thousands of Prodyuts in all homes of Bengal. Do your work please.”

তার পর? কালো কাপড়ে ঢাকা পড়ল তাঁর মুখ। ফাঁসির দড়ি পরানো হল প্রদ্যোতের গলায়। তিনি শেষ বারের মতো দৃপ্তকন্ঠে উচ্চারণ করলেন ‘বন্দেমাতরম’।

সরে গেল পাটাতন। প্রদ্যোতের নশ্বর দেহ ফাঁসির মঞ্চের নীচের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল। ফাঁসির দড়িটা কিছুক্ষণ ছটফট করে উঠল, তার পর একদম স্থির হয়ে গেল। অবশেষে সব শেষ। সে দিন সেখানে অশ্রুসিক্ত নয়নে উপস্থিত ছিলেন প্রদ্যোতের দুই দাদা – প্রভাতভূষণ এবং শক্তিপদ।

pankaj pradyot 2 13.11 1

এখানে একটি করুণ ইতিহাসের উল্লেখ প্রয়োজন। সেটি হল, প্রদ্যোতের পরের ভাই ছিলেন শর্বরীভূষণ, যিনি বিপ্লবী কাজ বা দলের সঙ্গে আদৌ যুক্ত ছিলেন না। হ্যাঁ, প্রদ্যোতের কাছ থেকে কিছু কথা হয়তো শুনেছিলেন বা জেনেছিলেন। ব্রিটিশ পুলিশ নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তাঁকেও গ্রেফতার করে জেলবন্দি করেছিল। এবং এত মর্মান্তিক লাগাতার অত্যাচার করেছিল যে, শেষমেশ তিনি পাগল হয়ে যান। তার পর তাঁকে রাঁচির উন্মাদাশ্রমে দেওয়া হয়। সেখানেই ১৯৮০ সালের ২৮ মার্চ তিনি মারা যান। তখনও তিনি জানতেন না, ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে। এই মর্মষ্পর্শী ঘটনায় সেই অর্থে এই শর্বরীভূষণও একজন প্রণম্য শহিদ।

আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রদ্যোত ভট্টাচার্য এক নক্ষত্রের নাম। ফাঁসির কয়েক দিন আগে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে থাকাকালীন জেল কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে প্রদ্যোত কুমার ভট্টাচার্য চিঠি পাঠিয়েছিলেন তাঁর মা মনোরমা দেবীকে। সেই চিঠির কিছু অংশ –

“শ্রীচরণেষু মা,

মাগো আমার, তুমি কাঁদবে না। আমি কষ্ট পাবো তাহলে।…আমার মা-কে যদি কেউ আমার চোখের সামনে অত্যাচার করে, কেটে টুকরো টুকরো করতে চায় এবং আমি যদি পাগলের মতো না লাফিয়ে, বিচার করতে বসি, যে এতে আদৌ সুরাহা হবে কি না, আইন এর মান্যতা দেয় কিনা, এ নিয়ে খবরের কাগজে তীব্র প্রবন্ধ লেখা যায় কি না – তবে আমি হয়তো অনেকের কাছে ধীর মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেবো ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে তোমার মাতৃহৃদয়টা কি ছিঃ ছিঃ করে জ্বলে উঠবে না মা? তোমার অন্তরাত্মা কি বলবে না মা – যে ছোটোবেলায় বুকের দুধের সাথে বিষ মিশিয়ে কেনো এই ক্লেদের পিন্ডটাকে মেরে ফেলিনি?…

…তোমার কোলের ছেলে কচি কিন্তু চিরকাল তোমারই থাকবে।…আজ একটা আদর্শের জন্য প্রাণ বিসর্জন করছি। তাতে আনন্দ আমার মনের কানায় কানায় ভরে উঠেছে। ফাঁসির কাঠটা আমার কাছে ইংরেজদের রসিকতা বলে মনে হচ্ছে।

আমার এই অন্তরের কথা তোমারই অন্তরের প্রতিধ্বনি।

আমি চিরদিনই জানি যে, আমি বাঙালী তথা ভারতবাসী, আর তুমি আমার বাংলা তথা ভারতবর্ষ – একই পদার্থ। একথা আমাকে শিখিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল। যুগ যুগ ধরে তুমি যে অপমান, লাঞ্ছনা ও নির্যাতন সহ্য করে এসেছো, মাটিতে মুখ থুবড়ে বোবা গরুর মতো মার খেয়েছো, তারই বিরুদ্ধে তোমার মনে যে বিদ্রোহ অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো বয়ে যাচ্ছিল, সেই পুঞ্জীভূত বিদ্রোহ–ই আমি। বিপ্লব জিনিসটা শুধু আমাদের নয়, মানবজাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যুগে যুগে এটার প্রয়োজন হয়েছে। যাদের প্রতিটি রক্তবিন্দু দাসত্বের কলঙ্কে কলঙ্কিত হয়ে গেছে, তাদের কথা ভাবি না।…কিন্তু যারা মধ্যপন্থী, আপস মীমাংসায় এখনো বিশ্বাসবান, তাদের জন্য দুঃখ হয়…।”

প্রদ্যোত কনডেমন্ড সেল থেকে ১৯৩২ সালের ২২ নভেম্বর তাঁর বড়োবৌদিকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন – “…তাছাড়া পুনর্জন্মে মৃত্যুর পরে অন্য দেহ পরিগ্রহে বিশ্বাস তো আছে এবং শ্রীমদ্গীতাতে শ্রীকৃষ্ণের বাণী ‘ন হি কল্যানকৃৎ কশ্চিদ্দুর্গতিং তাত গচ্ছতি’। তাই আমার জন্য চিন্তা করবেন না…।”

মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলের রাজবন্দি কৃষ্ণলাল চট্টোপাধ্যায় প্রদ্যোতের ফাঁসির আগের দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁর কানে কানে বলেছিলেন, “ভাই, কাউকে কিছু বলার আছে কি?” এই জিজ্ঞাসার উত্তরে সে দিন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিপুত্র প্রদ্যোত কুমার ভট্টাচার্য দিয়েছিলেন এক চিরন্তন ঐতিহাসিক জবাব – “আমার প্রতিটি রক্তবিন্দুতে যেন একটি করে শহিদের জন্ম হয়। আমার চিতাভষ্মের ছাইয়ের মধ্যেই যেন থাকে বিপ্লবের অগ্নিকণা, বিদ্রোহের অগ্নিতেজস্বিতা…।”

তথ্যসূত্র:

জেলে ত্রিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম – ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী।

আমি সুভাষ বলছি – শৈলেশ দে।

শহীদ প্রদ্যোত কুমার ভট্টাচার্য স্মৃতিরক্ষা কমিটি, দাসপুর।

সাম্প্রতিকতম

হরিয়ানার নুহতে পুণ্যার্থী ভর্তি বাসে আগুন, ৯ জনের মৃত্যু, আহত ২০-র বেশি

চণ্ডীগঢ়: কুণ্ডলী-মানেসার-পালওয়াল এক্সপ্রেসওয়েতে নুহ জেলার ধুলাভাত গ্রামের কাছে একটি চলন্ত বাসে আগুন লেগে মৃত্যু...

ভোট শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভোটের হিসেব প্রকাশ: ২৪ মে-র মধ্যে কমিশনের জবাব চায় সুপ্রিম কোর্ট

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঠিক কত ভোট পড়ল তার প্রকৃত তথ্য ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে...

বর্ষাকে ভারতীয় ভূখণ্ডে নিয়ে আসার জন্য চলতি গরম খুব গুরুত্বপূর্ণ, সোমবার থেকে ফের ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা

শ্রয়ণ সেন বর্ষার দামামা বেজে গিয়েছে। দক্ষিণ আন্দামান সাগরে ১৯ মে, রবিবার বর্ষা প্রবেশ করে...

কানহাইয়া কুমারের উপর হামলা, ভিডিও প্রকাশ করে চাঞ্চল্যকর দাবি হামলাকারীর

নয়াদিল্লি: শুক্রবার উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে নির্বাচনী প্রচারের সময় 'ইন্ডিয়া' জোট প্রার্থী কানহাইয়া কুমারের ওপর হামলা...

আরও পড়ুন

বাংলার নববর্ষের সঙ্গে রয়েছে পুণ্যাহের যোগ

মুর্শিদকুলি খা পয়লা বৈশাখের সময় রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করেন। এই সময় ধান উঠত খামারে। আর তখনই রাজস্ব আদায়ের দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়। সেটাই পুণ্যাহ উৎসব।

তৃণমূলের সঙ্গে ফের আসন ভাগাভাগিতে কংগ্রেস, কার ভাগে ক’টা

৪২-এর মধ্যে কোন আসনগুলি চাইছে কংগ্রেস? ক'টি আসন ছাড়তে রাজি তৃণমূল? জয়ন্ত মণ্ডল ২০২৪-এ বিজেপির বিরুদ্ধে...

সুড়ঙ্গ থেকে শ্রমিকদের উদ্ধার করে মুন্না, ফিরোজরা মনে করিয়ে দিলেন জন হেনরিকে – ‘শ্রমিকের জয়গান কান পেতে শোন ওই…’

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায় ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না,...