পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
এই ২০২৬ সালের শুরুতেই ৩রা জানুয়ারি স্থানীয় সময়ের ভোরবেলায় ভেনেজুয়েলার কারাকাস, মিরান্ডা, আরাগুয়া, লা-গুয়াইরা প্রদেশের একাধিক সামরিক এবং বেসামরিক পরিকাঠামোয় মারাত্মক বোমাবর্ষণ করে হামলা চালাল সাম্রাজ্যবাদের শিরোমণি আমেরিকা। হতাহত অসংখ্য, থরথরিয়ে উঠল ছোট্ট সেই দেশটা। আর সেই বীভৎস আক্রমণের কিছু মুহূর্তের পরেই বিশ্ববাসী জানল যে ভেনেজুয়েলার মানুষের দ্বারা নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মার্কিন ঘাতকবাহিনী অপহরণ করে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে আমেরিকার ওয়াশিংটনে। স্তম্ভিত সারা দুনিয়া। এ কী? এ কোন সভ্যতা? কেন? কেন? কী করেছে লাটিন আমেরিকার ওই একটা ছোট্ট দেশ ভেনেজুয়েলা এবং সে দেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারের রাষ্ট্রপতি?
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিলেন হুঙ্কার — “আমরাই ভেনেজুয়েলা চালাব।” ফ্লরিডায় সাংবাদিক সম্মেলন করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিলেন এই হুঙ্কার। সারা ভেনেজুয়েলার মানুষ-সহ সারা পৃথিবী বিস্মিত, স্তম্ভিত। সারাবিশ্ব আতঙ্কিত। কিন্তু কেন? কেন এই নির্লজ্জ আক্রমণাত্মক আগ্রাসন?
প্রসঙ্গত বলা যায়, সারা পৃথিবী জুড়েই চলছে এই আগ্রাসন নীতি। কিন্তু কেন? তার নীল নকশা অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি করা হয়েছিল।
দেখে নেওয়া যাক সেই প্রস্তুতির ব্লু-প্রিন্ট।
★ আমেরিকান সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সের (Delta Force) সেনারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ‘মাদুরো’র ‘সেফ হাউস’ তৈরি করে তার প্রশিক্ষণ দিয়ে হলিউড মুভির চিত্রায়ণ সমাপ্ত করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অত্যন্ত কাছের মানুষ সহযোগী স্টেফেন মিলার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিয়ো, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, এবং সেই মুভির চিত্রনাট্য পরিচালনা করলেন সিআইএ-র অধিকর্তা (Director in Chief, Central Intelligence of America /CIA) জন ইয়ার্ট ক্লিপ। ।
এই ঘটনার সঙ্গে সংযুক্ত কিছু অগ্রপশ্চাৎ ঘটনা এবার দেখা যাক।
সারাবিশ্বের মানুষের কাছে একটি ঘটনার সমাপতন ছিল অজানা। কী সেই ঘটনা? ২০২৫ সালেই ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক নারী ব্যক্তিত্ব মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে বিশ্ব শান্তির নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। আর ২০২৬-এর একদম গোড়াতেই ভেনেজুয়েলার ওপরে এই আক্রমণের আগ্রাসন।
এই অভিযান সফল করার জন্য গত ২০২৫-এর আগস্ট মাস থেকেই আমেরিকান গোয়েন্দাদের একটা ‘Group of Confidence’-এর দল অবস্থান করছিল ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে। প্রেসিডেন্ট মাদুরোর সমস্ত গতিবিধির ওপরে সব সময়েই নজরদারি করত তারা। গত ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিসল্ভ’ (Operation Absolute Resolve) নামের অভিযানে সবুজ সংকেত দিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্যাস! মহত্ব প্রকাশ হয়ে গেল, আসল মুর্তিতে। টুঁটি টিপে ধরল আগ্রাসী আমেরিকা একটা ছোট্ট দেশ ভেনেজুয়েলার।

এই অভিযানের আগে ভেনেজুয়েলার ক্যারিবীয় অঞ্চলে আমেরিকার ১টি বিমানবাহী রণতরী, ১১টি যুদ্ধজাহাজ, এবং ১৫টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সমেত ১৫ হাজারেরও বেশি সেনা মোতায়েন করে রেখেছিল আমেরিকা। এবং ওই দিন একযোগে পশ্চিম গোলার্ধের ২০টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে এফ-৩৫, এফ-২২, বি-১, পরমাণু বোমারু বিমান-সহ ১৫০টি যুদ্ধবিমান নিয়ে ভেনেজুয়েলার ওপরে স্মরণকালের ভয়াবহ আক্রমণ চালানো হয়।
★ সামরিক শক্তিতে আমেরিকার কাছে ভেনেজুয়েলা কিচ্ছু নয়। তবু এই আক্রমণ কেন? কারণ, ভেনেজুয়েলার মিত্রতা গত শতাব্দীর সেই সাতের দশক থেকে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা এখনকার রাশিয়ার সঙ্গে। এটা আমেরিকার না-পসন্দ। আর ভেনেজুয়েলার আছে প্রচুর তেলের ভান্ডার। ভেনেজুয়েলার যাবতীয় বাণিজ্য রাশিয়ার সঙ্গে। এসব কি মেনে নিতে পারে আমেরিকা? তার নাকের ডগায় রয়েছে ভেনেজুয়েলা। অতএব তাকে যে কোনো ছলছুতোয় আক্রমণ ও আগ্রাসন করতেই হবে। আমেরিকার সামরিক বাহিনীর দক্ষতা ও সক্ষমতার কাছে হার মানতে হল রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভেনেজুয়েলাকে।
ইতিহাস জানে, ইতিপূর্বেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বলি হয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার জনপ্রিয় নেতা উগো চাভেজ, চিলির সালভাদর আলেন্দে, সৌদি আরবের জামাল খাসোগি, বাংলাদেশের জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ।
আমেরিকার এর পরের লক্ষ্য কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ ক্যানেল, ডেনমার্কের স্বশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড এবং সেই দ্বীপের বিরল ও প্রচুর খনিজ সম্পদ। এই খনিজ সম্পদের ওপরে লোভ ডোনাল্ড ট্রাম্পের। লাটিন আমেরিকার কোলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাফো ব্যুত্রোকে ইতিমধ্যেই শাসানি দেওয়া হয়েছে। মেক্সিকো, মধ্য এশিয়ার ইরান প্রভৃতি দেশগুলির প্রাকৃতিক এবং খনিজ সম্পদের ওপর দখলদারি করার জন্য উল্লিখিত দেশগুলোর সরকারকে লাগাতার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যদিও ভেনেজুয়েলার এই ঘটনার পরে সারাবিশ্ব ট্রাম্পের এই জঘন্য কাজের জন্য প্রতিবাদে উত্তাল। এমনকি ট্রাম্পের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রতেও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। প্রতিদিন সেখানে প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নামছেন। কিন্তু এই মুহুর্তে সারাবিশ্বে একমাত্র মার্কিন প্রশাসন নিজেদের স্পর্ধিত,মদমত্ততা দেখাতে চায় কর্তৃত্ব দেখানোর বাসনায়। যদিও ইতিমধ্যেই চিন, রাশিয়া, ব্রিটেন, জার্মানি প্রভৃতি দেশ এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের তরফ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সুস্পষ্ট ভাষায় কড়া হুঁশিয়ারি শুনিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যাই হোক, এই সব রাজনৈতিক অস্থিরতায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাধারণ মানুষজন খুব বিপদে পড়েন। নষ্ট হয় জীবন, ক্ষতি হয় অগ্রগতির। তাই এই পৃথিবীর কোনো মানুষই চায় না যুদ্ধ-লোকক্ষয়, রক্তপাত। তারা চায় শান্তি, পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সহাবস্থান এবং সম্প্রীতির বন্ধুত্ব।
তাই যুদ্ধ নয় শান্তি চাই।
আরও পড়ুন: বিতর্কের কেন্দ্রে ব্রুকলিনের এমডিসি, আইনজীবীরাই যাকে বলেন ‘নরকের মতো’, সেই কারাগারেই মাদুরো


